ভোলানাথ ঘড়ই,আগরতলা: একজন সুনীল দেওধর, অন্য জন হিমন্ত বিশ্বশর্মা। সুনীল ছিলেন প্রচারের দায়িত্বে, আর ‌হিমন্ত বিশ্বশর্মার দায়িত্ব ছিল ত্রিপুরার কংগ্রেস বিধায়ক–‌নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটারদের গেরুয়া শিবিরে নিয়ে আসা। দু’‌জনেই সফল। দু’‌জনকেই ত্রিপুরা–‌বিজয়ের কারিগর বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে মিডিয়ায়। কিন্তু এঁদের আড়ালে যিনি চাণক্যের মতো সবটা নিয়ন্ত্রণ করেছেন, নতুন পথ বাতলে দিয়েছেন রোজ, তিনিই বা কম কিসে!‌ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যিনি হিলারি ক্লিন্টনের হয়ে প্রচারে মুখ্য দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই তরতাজা যুবকটি ছাড়া বাম দুর্গে ফাটল ধরানো বোধ হয় সম্ভব ছিল না বিজেপি–‌আরএসএসের পক্ষে।
তিনি, রজত শেট্টি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই যুবকই মাত্র ৬ জনের দল গড়ে বামেদের সমস্ত প্রচারকে ভেঁাতা করে দিয়ে গেছেন। ‘‌চলো পাল্টাই’‌ স্লোগান তঁারই তৈরি। বুথ কমিটি স্তর থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় স্তর পর্যন্ত সমীক্ষা করেছেন ওঁরা। কোথায় সিপিএমের দুর্বলতা, কোথায় মানুষের ক্ষোভ, কীসের লোভ দেখালে মানুষ বামেদের থেকে চলে আসবে গেরুয়া শিবিরে— সমস্তটাই ঠিক করে দিয়েছেন এই রজতরাই। এর আগে অসম আর মণিপুরেও এই দল সাফল্য এনে দিয়েছে। আর, ত্রিপুরায় গত ৬ মাস দিনে গড়ে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পরিশ্রম করে ফসল তুলে দিয়েছে বিপ্লব দেব–‌দের ঝুলিতে। বামপন্থীরা তা টেরই পাননি!‌
কে এই রজত?‌ জন্ম কানপুরে। সেখানেই আরএসএস পরিচালিত শিশুমন্দির স্কুলে পড়াশোনা। খড়্গপুর আইআইটি–‌‌তে বি টেক। সেখান থেকেই তঁার সঙ্গে পরিচয় বিজেপি–‌র সর্বভারতীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রাম মাধবের। উচ্চশিক্ষার জন্য রজত আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান ২০১২ সালে। ২০১৪–‌তে সেখানেই ভাষণ দিতে যান রাম মাধব। রজতের সঙ্গে তখনই রাম মাধব নির্বাচনে কাজ করার জন্য কথা বলে রাখেন। পড়াশোনার ফঁাকেই হিলারি ক্লিন্টনের প্রচারের দলে কাজ করেন রজত। ত্রিপুরার মতো দীর্ঘ দিনের বাম–‌অধ্যুষিত রাজ্যে মানিক সরকারের মতো হেভিওয়েট কমিউনিস্টকে টলিয়ে দিয়ে গেলেন হিলারির প্রচারক ২৯ বছরের যুবকটি। 
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রজতের বিষয় ছিল ‘‌মাসকমিউনিকেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসি ম্যানেজমেন্ট’‌। গত বছর জুনে দেশে ফিরতেই তঁার কাছে চলে যান রাম মাধব। দায়িত্ব দেন অসম, মণিপুরের ভোটের। দেরি করেননি রজত। অসমে ৩২টি জেলায় সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য টিম গড়ে কাজ শুরু করে দেন তিনি। তিন বারের সফল কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রীর ত্রুটিগুলি খুঁজে তালিকা করে দেন ওঁরা। তা দিয়েই শেষমেশ বাজিমাত বিজেপি–‌র।
ত্রিপুরার ক্ষেত্রে কাজটা একটু কঠিনই। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সৎ মুখ্যমন্ত্রী বলেই পরিচিত মানিক সরকার। তঁার দিকে ব্যক্তিগত ভাবে আঙুল তোলা  শক্ত। এখানে ‘‌ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’‌ পদ্ধতি নেন রজত ও তঁার দল। ২০১৪–‌য় নরেন্দ্র মোদির হয়ে ‌প্রচারের কৌশল তৈরির দায়িত্ব ছিল প্রশান্ত কিশোরের ওপর। পরে তঁাকে টেনে নেন বিহারের নীতীশ কুমার। সেই প্রশান্ত কিশোরের দলেরও দু’‌জন রয়েছেন  রজতের দলে। প্রথম দিকে বিজেপি এ রাজ্যে ব্যক্তি–‌আক্রমণের পথ নেয়। লক্ষ্য মানিক সরকার। তঁাকে নিষ্কর্মা, দামি চশমা পরেন, কপ্টার চড়েন ইত্যাদি বলতে থাকে। সুবিধে না হওয়ায় শুরু হয় গরু–‌রাজনীতি। সেখানেও সাড়া না পেয়ে ফের পথ–‌বদল। একের পর এক হিন্দু মূর্তির মাথা কাটা হল। শুরু হল মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্র দিয়েই। এ কৌশলও বদল। বুথ স্তর থেকে বাম সরকারের বিরুদ্ধে ছোট ছোট ক্ষোভ জড়ো করতে শুরু হল টানা রাস্তা অবরোধ। সেখানেও লাঠি–‌গুলি না চালিয়েই সামাল দিল সরকার। এর পর মুখ্যমন্ত্রী–‌সহ মন্ত্রীদের বাড়ি ঘেরাও। অন্য দিকে উপজাতি এলাকায় ঘরে ঘরে ঢুকে পড়া কলাটা–‌মুলোটা নিয়ে। ভোটের আগে প্রচার, ‘মানিকও যেখানেই ভোট দিন, তা পদ্মতেই পড়বে’‌। সিপিএম এই ভিডিওটি যতই ব্যঙ্গ করে প্রচার করেছে, ততই একটি শ্রেণির কাছে এই বিশ্বাস জন্মেছে, এমনটা হলেও হতে পারে!‌ প্রধানমন্ত্রীর ৫৬ ইঞ্চি ছাতিতে বিপ্লব দেব আর এন সি দেববর্মার আলিঙ্গন–‌‌ছবি এই বিশ্বাসকে আরও নিশ্চিত করে দেয়। শেষে ওয়েব কাস্টিংয়ের নামে প্রচার, যেখানেই ভোট দিন, দিল্লিতে বসে বিজেপি দেখবে কাকে ভোট দিচ্ছেন!‌ রজতের দল সোশ্যাল মিডিয়ায় জেলায় জেলায় নিয়োগ করেছে পেশাদার আইটি কর্মীদের। কোথায় কবে কী পোস্ট দিতে হবে, কী কী শেয়ার করতে হবে— ঠিক করে দিয়েছে।
একটানা ক্ষমতায় থেকে সাংগঠনিক শক্তিতে কিছুটা হলেও শিথিলতা এসেছিল সিপিএমের মধ্যেও। এই ত্রুটিগুলি আড়ালে রেখেও ফের অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার গড়েই ফেলতে পারতেন মানিক সরকার, যদি–‌না এমন কৌশলী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হত!‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top