আজকাল ওয়েবডেস্ক:‌ বড় ধাক্কা ভারতীয় রাজনীতিতে। মঙ্গলবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হলেন প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। এদিন রাতের দিকে আচমকাই হৃদরোগে আক্রান্ত হন ৬৭ বছরের সুষমা। এদিন সন্ধ্যে ৭.২৩ মিনিটেও একটি টুইট করেছিলেন তিনি। তারপরেই নাকি তাঁর শরীর খারাপ হতে শুরু করে। তড়িঘড়ি তাঁকে দিল্লির এইমস হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধন ও পরে পৌঁছে যান আরেক বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রী নীতীন গডকরি। এরপর চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা করলেও বাঁচাতে পারলেন না সুষমাকে। তাঁর মৃত্যুতে দেশজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ‌সুষমা ছিলেন দুঁদে আইনজীবী। পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ। ভাল মা। সুগৃহিনী। সব ক্ষেত্রেই সেন্ট পার্সেন্ট সফল। ভারিক্কি চেহারা। ঢলঢলে মুখ। বুদ্ধিদীপ্ত চাউনি। দেখে কে বলবে জীবনের ৬৭টা বসন্ত পেরিয়ে এসেছেন। বেশিরভাগটাই কেটেছে রাজনীতির আঙিনায়। প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পর তিনি একমাত্র মহিলা, যিনি বিদেশমন্ত্রক সামলাচ্ছেন দক্ষ হাতে। কিন্তু এবারের লোকসভা নির্বাচনের শুরুতেই তিনি এসেছিলেন খবরের শিরোনামে। কারণ তিনি ঘোষণা করেছিলেন ২০১৯ সালের ভোটে লড়বেন না। আরএসএসের সদস্য হরদেব শর্মা এবং লক্ষ্মীদেবীর বড় মেয়ে সুষমা স্বরাজ স্বাভাবিক কারণেই উঠে এসেছিলেন খবরে। তারপরে আর সংসদ চত্ত্বরে দেখা যায়নি তাঁকে। শুধু একবার, মোদি ২.‌০ এর শপথের সময় লালকৃষ্ণ আদবানির পাশে ছোট্ট চেহারার সুষমা এসে বসেছিলেন। হরিয়ানার আম্বালা ক্যান্টনমেন্টের মেয়ে। সেখানকার সনাতন ধর্ম কলেজ থেকে স্নাতক। তারপর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রের ছাত্রী। পড়াশোনার সঙ্গে এনসিসি, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, আবৃত্তি, নাটক, ফাইন আর্ট, সাহিত্যে চর্চাও। বিতর্ক, আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় সেরা। যিনি পরে চার বছর ‘হরিয়ানা হিন্দি সাহিত্য সম্মেলন’–এর সভাপতি হবেন। 
বোন বন্দনা, ভাই গুলশন— কেউই রাজনীতিতে নেই। কিন্তু সুষমার রাজনীতিতে হাতেখড়ি ছাত্রাবস্থায়। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের সদস্য হিসেবে। সঙ্গে আইনবিদ্যার অধ্যয়ন। 
১৯৭৩ সাল। কালো কোট গায়ে সুপ্রিম কোর্টে ঢুকলেন সুষমা। শুরু হল আইনজীবীর জীবন। কয়েক বছরের মধ্যেই সোশ্যালিস্ট নেতা জর্জ ফার্নান্ডেজের লিগ্যাল ডিফেন্স টিমে যোগদান। সেখানেই পরিচয় স্বরাজ কৌশলের সঙ্গে। জীবনসঙ্গিনী চিনতে ভুল হয়নি স্বরাজের। দেশে তখন জরুরি অবস্থা। পরিবেশ থমথমে। তখনই চারহাত এক হল স্বরাজ–সুষমার। জরুরি অবস্থার পর সুষমা যোগ দিলেন বিজেপি–তে। ততদিনে আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত স্বরাজ। রাজনীতিতেও। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত মিজোরামের রাজ্যপাল ছিলেন স্বরাজ। সাংসদ ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত। 
স্বামীর সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিলেন আম্বালার কন্যা। সংসার সামলানোর সঙ্গেই রাজনৈতিক জগতের একের পর এক সিঁড়ি টপকাতে শুরু করেন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত হরিয়ানা বিধান পরিষদের সদস্য ছিলেন সুষমা। বয়স তখন ২৫ বছর। ১৯৭৭ সালেই ক্যাবিনেট মন্ত্রী। ২৭ বছর বয়সে হরিয়ানা বিজেপি–র সভাপতি। ১৯৮৭–১৯৯০ ‘ঘরের মেয়ে’ সুষমাই ছিলেন হরিয়ানার শিক্ষামন্ত্রী। ১৯৯০ সালে জাতীয় রাজনীতিতে। রাজ্যসভায়। ১৯৯৬ সালের লোকসভায় দক্ষিণ দিল্লি থেকে জয়ী। অটলবিহারী বাজপেয়ীর জমানায় তথ্য–সম্প্রচার মন্ত্রকের দায়িত্ব পান সুষমা। দু’‌বছরের মধ্যেই টেলিকম মন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। সেখানেও সফল সুষমা। ফিল্ম প্রোডাকশনকে ‘ইন্ডাস্ট্রি’র মর্যাদা দেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে চালু করেন ‘কমিউনিটি রেডিও’। চলছিল বেশ। কিন্তু ১৯৯৮ সালে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী করা হয় সুষমাকে। ইস্তফা দিতে হয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী পদে অবশ্য খুব বেশি দিন ছিলেন না সুষমা। বিধানসভা ভোটে পরাজয়ের পর ফিরে আসেন জাতীয় রাজনীতিতে। 
১৯৯৯ সাল। লোকসভা ভোট। কর্ণাটকের বেল্লারি কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী হিসেবে সুষমাকে ময়দানে নামানো হল কংগ্রেসের ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধে। জিততে পারেননি। কিন্তু কংগ্রেসের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সহজে হার মানার পাত্রী তিনি নন।
২০০০ সালের এপ্রিলে উত্তরপ্রদেশ থেকে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হলেন সুষমা। ২০০৩–২০০৪ পাকাহাতে স্বাস্থ্য, পরিবারকল্যাণ এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে মধ্যপ্রদেশ, ওডিশা, রাজস্থান, বিহার, ছত্তিশগড় এবং উত্তরাখণ্ডে এইমস তৈরির কৃতিত্ব তাঁরই। ২০০৬ সালে ফের রাজ্যসভার সদস্য। এবার মধ্যপ্রদেশ থেকে। ২০০৯ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভার বিরোধী দলের ডেপুটি লিডার। সে বছর লোকসভা ভোটে মধ্যপ্রদেশের বিদিশা কেন্দ্র থেকে জিতে এলেন সুষমা। নিজের যোগ্যতায় বিজেপি–র তাবড় তাবড় নেতাদের সারিতে জায়গা করে নিলেন। সাফল্যের সঙ্গে বিতর্কও এল। বিতর্কের নাম ললিত মোদি। অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে পর্তুগাল যাওয়ার জন্য ভারত সরকারের অনুমতি দরকার হয়েছিল ললিতের। তখন ব্রিটিশ হাইকমিশনের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছিলেন সুষমা। কিন্তু সে বিতর্ক থিতিয়ে গেছে কালের নিয়মে। 
২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে সুষমার নাম নিয়ে গুঞ্জন উঠেছিল। ভোটে জেতার পর মোদি সরকারের বিদেশমন্ত্রী হলেন তিনি। বিদেশমন্ত্রকে ছাপ রাখার পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় হলেন জনতার সহায়তায়। প্রতিবেশী দেশের কেউ চিকিৎসার জন্য ভারতে আসতে চাইলে তৎক্ষণাৎ সাড়া। 

জনপ্রিয়

Back To Top