সংবাদ সংস্থা, মুম্বই, ১০ জুলাই

সত্যিই কি অবাস্তব আর কল্পনার মিশেলে গড়ে ওঠে সিনেমার শরীর?‌ ফের প্রশ্ন তুলে দিল বিকাশ দুবের এনকাউন্টার। বিকাশ–চিত্রনাট্যে যেন রিল আর রিয়েল মিলেমিশে একাকার। যেন টোকা হয়েছে ২০১৪–য় মুক্তি পাওয়া ‘‌সিঙ্ঘম রিটার্নস’‌–এর চিত্রনাট্য। ছবির একেবারে শেষে ডেপুটি কমিশনার বাজিরাও সিঙ্ঘমের গুলিতে এভাবেই ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল অপরাধী সত্যরাজ বাবার বুক।
কিছুদিন আগে মহিলা পশুচিকিৎসককে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত চারজনকে এনকাউন্টারে খতম করে দেন সাইবারাবাদের পুলিশ কমিশনার ভিসি সজ্জনা। এ ঘটনায় মিশে রয়েছে ‘‌সিম্বা’‌র ছায়া। রণবীর সিং ওরফে ইনস্পেক্টর সংগ্রাম ভালেরাও আইন, বিচারব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে  ঠিক এভাবেই হত্যা করেছিলেন হেফাজতে থাকা ধর্ষণে অভিযুক্তকে। সজ্জনাকে তো সামাজিক মাধ্যমে রিয়েল লাইফ ‘‌সিম্বা’‌ বলেও দাগিয়ে দিয়েছিলেন নেটিজেনরা। কেউ কেউ এমনও বলেন, এনকাউন্টারে বেরোনোর আগে নিশ্চয় সজ্জনা এবং তাঁর দলবল ‘‌সিম্বা’‌ দেখেছিলেন!‌ বি টাউন বারেবারেই দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা হিসেবে বিচার বহির্ভূত হত্যাকে সিলমোহর দিয়ে এসেছে চিত্রনাট্যে। সে ১৯৮৪–র ‘‌ইনকিলাব’‌ই হোক, বা ২০০৩–এর ‘‌গঙ্গাজল’‌‌। অথবা ২০০৪–এর ‘‌অবতক ছপ্পন’‌ বা ২০১২–র ‘‌দাবাং ২’‌, ‘‌সিঙ্ঘম’‌। আরও বেশ কয়েক বছর পিছিয়ে গেলে তালিকায় যোগ হবে ‘‌গুনেগার’‌, ‘‌জুরমানা’‌ বা ‘‌রাজা ভাইয়া’র নামও। 
মান সিং দীপের একাধিক ছবিতে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে দুর্ধর্ষ সব এনকাউন্টার। বলেছেন, মুম্বই পুলিশের বেশ কয়েকজন নামী এনকাউন্টার বিশেষজ্ঞর সঙ্গে তাঁর দারুণ সম্পর্ক। সেই সুবাদেই গায়ে কাঁটা দেওয়া অজস্র এনকাউন্টারের গল্প শুনেছেন। সেইসব রোমাঞ্চই ধরা পড়েছে চিত্রনাট্যে। ‘‌ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বই’‌, ‘‌কিক’‌ বা ‘‌ডার্টি পিকচার’‌–এর মতো সফল ছবির চিত্রনাট্যকার রজত অরোরা বলেছেন, ছবিতে যা দেখানো হয় তা আসলে সমাজে যা ঘটে তারই ছায়া। যেমন ‘‌গঙ্গাজল’‌ তৈরিই হয়েছিল ১৯৮০–তে ঘটে যাওয়া ‘‌ভাগলপুর ব্লাইন্ডিং’‌–এর ভিত্তিতে। ছবি রিলিজের পর আর কখনও এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। 
১৯৭১–এর হলিউডি মুভি ক্লিন্ট ইস্টউড অভিনীত ‘‌ডার্টি হ্যারি’‌ যেমন পুলিশের এক অন্য ইমেজ তৈরি করেছিল, ঠিক সেরকমই ১৯৭৩–এর ‘‌জঞ্জির’‌ ভারতীয়দের সামনে পুলিশের ভূমিকাকে অন্যভাবে চেনাল। এই ছবি বিগ বি অমিতাভ বচ্চনকে ‘‌অ্যাংরি হিরো’‌ হিসেবে চিনিয়ে দিল। চিনিয়ে দিল এক সৎ পুলিশকে, যিনি অপরাধীদের সামনে বীরের মতো ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। যাঁকে অপরাধী দমনে ভুয়ো এনকাউন্টারের সুবিধে নিতে হয় না। পরের দুটো দশকে ‘‌এনকাউন্টার’‌, ‘‌রিস্ক’‌, ‘‌ডিপার্টমেন্ট’‌, ‘‌শুট আউট অ্যাট লোখান্ডওয়ালা’‌, ‘‌শুটআউট অ্যাট ওয়াডালা’‌–র মতো ছবিতে ভূরি ভূরি এনকাউন্টার চাক্ষুষ করেছেন দর্শক। এর একটা কারণ অবশ্যই ‘‌জঞ্জির’‌ পরবর্তীকালে দেশ জুড়ে গ্যাংস্টারদের উত্থান। এর মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় অবশ্যই নানা পাটেকর অভিনীত ‘‌অবতক ছপ্পান’‌। যা মুম্বই পুলিশের বিতর্কিত এনকাউন্টার বিশেষজ্ঞ দয়া নাইকের জীবনভিত্তিক। 
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক বিনোদ অনুপমের ধারণা, বলিউডি সিনেমা আসলে গড় দর্শকের পছন্দের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। যদি সেই দর্শকরা মনে করেন, কোনও ব্যক্তিকে গুলি করে মেরে ফেলা উচিত, তবে সিনেমায় তাই দেখানো হয়। সিনেমা কখনওই দর্শকদের বুদ্ধিতে শান দেওয়ার চেষ্টা করে না। আর তাই ‘‌রং দে বসন্তী’‌ ছবিতে দুর্নীতি অবসানের একমাত্র উপায় হয়েছিল দোষীকে গুলি করে হত্যা করা। সেই দোষী প্রতিরক্ষামন্ত্রী হলেও। ১৯৮০–র ‘‌ইনকিলাব’‌–এর নায়ক অমিতাভ বচ্চন তো দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে গুলি চালানোর জন্য বিধানসভাতেও প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন!‌
পুলিশের নানান কীর্তিকাহিনিতে অবিরাম উৎসাহ বলিউডের। ক’‌দিন পরেই মুক্তি পাচ্ছে ‘‌মর্দানি ৩’‌, যেখানে এক সিরিয়াল ধর্ষককে বাগে আনতে রানি মুখার্জি ওরফে শিবানী বাজিরাও জান লড়িয়ে দেবেন। সলমন খানও চুলবুল পান্ডের কৌতুকের মোড়কে প্রতিশোধের ঝাঁপি নিয়ে ফিরছেন ‘‌দাবাং ৩’‌–এর হাত ধরে। অক্ষয়কুমার পুলিশি উর্দি পরে আসবেন ‘‌সৌরবংশী’‌–তে। আর রিলবন্দি হয়ে আজকের বা হায়দরাবাদের ঘটনা?‌ শুধু সময়ের অপেক্ষা। ‌‌‌

‘সিংহম রিটার্নস’ ছবিতে অজয় দেবগণ।

জনপ্রিয়

Back To Top