অরুন্ধতী মুখার্জি ■ ভুবনেশ্বর- দয়া নদীর ধারে যেতে পারিনি। যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু নদীতীরে যাওয়ার কোনও উপায় নেই। নদী আছে, তীর নেই। এই হল সেই তীর, যেখানে কয়েক হাজার বছর আগে কলিঙ্গযুদ্ধ হয়েছিল। সম্রাট অশোক চণ্ডাশোক থেকে ধর্মাশোক হয়েছিলেন। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দয়া নদীর জল লাল হয়ে গিয়েছিল। দয়া আজও বইছে, কিন্তু নদীর বুক তার ইতিহাস ভুলে গেছে। ওডিশার কোনও রাজনীতিবিদ, কোনও সরকারই সেই ইতিহাস মনে করিয়ে দেওয়ার কাজটুকু করেনি। প্রভু জগন্নাথদেবের দৌলতে পুরী রাজনীতিবিদদের ‘কৃপা’ পায়, কিন্তু দয়া তাঁদের ‘দয়া’ পায় না।
ভুবনেশ্বর থেকে ঘণ্টাখানেক গাড়িতে গেলে ধৌলি পাহাড়। এই ধৌলি পাহাড় আর দয়া নদীতীরের বিশাল এলাকা জুড়ে কলিঙ্গযুদ্ধ হয়েছিল। ধৌলি পর্বত আর ধৌলি প্যাগোডা থেকে এই নদী দেখা যায়। কলিঙ্গযুদ্ধের পর সম্রাট অশোকের পরিবর্তনের ইতিহাস মনে রেখে সাতের দশকে কয়েকজন জাপানি বৌদ্ধ প্যাগোডা বা শান্তিস্তূপটি নির্মাণ করেন। আমাদের রাজ্যে যেভাবে আমরা পলাশির প্রান্তরকে অবজ্ঞা করি, এখানে দয়া নদীকেও সমান অবজ্ঞায় ফেলে রাখা হয়েছে। বিজেপি ধর্মকে যেভাবে আঁকড়ে থাকে, ইতিহাসকেও তার ছিটেফোঁটা দিলে দয়া নদী একটু সুখ পেত।
গরমে দয়া নদীর জল শুকিয়ে যায়। সুতোর মতো শীর্ণ নদী চারধারের দূষণ বুকে ধরে বসে থাকে। ইতিহাসের জন্য না হোক, পরিবেশের কারণেও নদীটির যত্নআত্তি পাওয়া উচিত ছিল। বহু বছর আগে দয়া নদীর দূষণ দূর করতে কমিশন–টমিশন হয়েছিল। ব্যস! সরকারের কাজ ওখানেই শেষ। ওডিশা রাজ্য বিজেপি সহ–সভাপতি সমীর মোহান্ত কলিঙ্গযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে ভাবেন। তাই তাঁর ইচ্ছে, রাজ্যে বিজেপি সরকারে এলে দয়া নদীর তীরে কলিঙ্গ সেনাদের স্মরণে একটি ব্রোঞ্জের স্মারক হবে। তবে এ তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছে। এতে তাঁর দলের সিলমোহর পড়েনি। কলিঙ্গযুদ্ধ নিয়ে তাঁর একটু অন্যরকম ভাবনাও আছে। সেকথা জানলে ভাবনাচিন্তায় একটু শান পড়ে বইকি। তিনি বললেন, ‘আমরা কলিঙ্গযুদ্ধ বলতে শুধু মৌর্যযুগ, সম্রাট অশোকের কথা পড়ি। আমরা, মানে সাধারণ মানুষ, ইতিহাসবিদ নন। কিন্তু কেন ভাবি না, ওই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কত বছর ধরে হয়েছিল। কলিঙ্গরাজ রাজা অনন্তের সেনানী শৌর্য–বীর্য দিয়ে সে লড়াই লড়েছিল। সেকথা কি ইতিহাসে লেখা আছে? লেখা আছে শুধু মৌর্য সম্রাটের জয় আর তাঁর যুদ্ধ–পরবর্তী শোকের কাহিনি। কলিঙ্গরা বিনা যুদ্ধে জমি ছাড়েনি। আমরা সেই কয়েক হাজার বছর আগের কলিঙ্গদেরই বংশধর। আমাদের রক্তে বইছে তাঁদেরই রক্ত। আমরা সেই শৌর্য, সেই সাহস বুকে করে চলেছি। কেউ সে–কথা বলে না।’
মন দিয়ে তাঁর কথা শুনছিলাম। স্কুলে যেটুকু ইতিহাস পড়েছি, তাতে কি শুধু ওই ধারণাটুকুই পেয়েছি? প্রশ্নটা উসকে দিয়ে তিনি খুব নীচুগলায় বললেন, ‘ওড়িয়া জাত্যাভিমানের জন্য এই ইতিহাসটাও জানা দরকার।’ আবারও বললেন, এটা তাঁর ভাবনা, দলের নয়। ‘সত্য যে, দয়া নদী ঘিরে ইতিহাস–পর্যটন গড়ে তোলা যায়। কলিঙ্গ যুদ্ধ ইতিহাসের পাতা থেকে ওডিশার পর্যটন মানচিত্রেও জায়গা পাক।’ বিজেপি–র ধর্মগন্ধী রাজনীতি জড়িয়ে নেই বলেই হয়তো এ কথাটি বলতে তাঁর গলা খাদে চলে গেল।
সমীর মোহান্তর সঙ্গে দেখা করার পর্বটিও ভারি অন্যরকম। রামমন্দিরের কাছে বিজেপি অফিস। সেখানে ঢুকতেই দেখলাম, অনেকজন মিলে গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে বেলুন ফোলাচ্ছে। বাচ্চারা ঠোঁটে চেপে ফুঁ দিয়ে বেলুন ফোলায়। এগুলো আকারে–আকৃতিতে তার কয়েকশো গুণ বড়। হাজার ফুঁয়েও কাজ হওয়ার নয়। তাই গ্যাস সিলিন্ডার এসেছে। একটা বেলুন ফোলার পর দেখলাম, তার গায়ে নরেন্দ্র মোদির মুখ এবং বিজেপি–কে ভোট দেওয়ার কথা ভেসে উঠেছে। দলের অন্যতম সম্পাদক লেখশ্রী সামন্তসিঙ্গার জানালেন, এই প্রচার–বেলুনগুলো উড়বে ওডিশার শহরগুলোর আকাশে। বলে দলের এক কর্মীকে বললেন, ‘ওঁকে সমীর মোহান্তির কাছে নিয়ে যাও।’
ওঁর পিছু নিতে দেখলাম, দলীয় অফিসের সামনে একটি বাড়ি। পেছনে প্রায় লাগোয়া আর একটি বাড়ি আছে। যা সামনে থেকে বোঝা যায় না। দুই বাড়ির মাঝে এক বিরাট লোহার গেট। গেটের দু’ধারে দুই প্রহরী। দলীয় কর্মীটি ফিসফিস করে কিছু বলার পর ওয়াকিটকিতে খবর গেল। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল জেনে ভেতরে ঢোকার অনুমতি পেলাম।
গেটে ঝুলছে ভারী তালা। তালা খুলে গেট সামান্য ফাঁক করে আমাকে ঢোকানো হল। আমি ঢোকার পরেই আবার তালা দেওয়া হল। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে কারণ জিজ্ঞাসা করেছিলাম। সমীর বললেন, গুরুত্বপূর্ণ নেতারা আসেন, তাই এমন ব্যবস্থা।
এর আগে কোনও দলীয় অফিসে এমন অটুট নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দেখিনি। কথা না বাড়িয়ে রাজ্য–রাজনীতিতে ঢুকে পড়লাম। দু’একটা কথার পরই তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানালেন, গত পঞ্চায়েত ভোটে বিজেপি–র ফল ভাল হয়েছে। ৩০টি জেলা পরিষদের মধ্যে তাঁদের দখলে এসেছে ৯টি। দুধে ফোটানো ঘন সাদাটে চায়ে চুমুক দিতে দিতে তিনি এরকম আরও কিছু হিসেব, বিজু জনতা দলের অ্যান্টি–ইনকামবেন্সি ফ্যাক্টর ইত্যাদি জানালেন।
বললেন, ‘এবার ওডিশায় ডবল ইঞ্জিন চালাচ্ছি। প্রথম ইঞ্জিন চালিয়ে লোকসভায় বহু আসন জিতব, দ্বিতীয় ইঞ্জিন চালিয়ে ওডিশায় সরকার গড়ব।’
লোহার গেট পেরিয়ে বিজেপি দপ্তর ছেড়ে রাস্তায় এসে মনে পড়ল নবীন পট্নায়েকের ‘আমা ঘর এলইডি’ প্রকল্পের কথা। গরিব পরিবারকে বছরে ৪টি করে এলইডি বাল্‌ব দেওয়া হচ্ছে। গরিবের ঘরের রোশনি কি নবীনের অ্যান্টি–ইনকামবেন্সির আঁধার খানিকটা হলেও দূর করতে পারবে? সম্ভবত সেই রোশনির জোরে নবীন গতবারের মতো বিশালভাবে না জিতুন, টায়ে– টায়ে হলেও ওডিশার কুর্সি দখলে রাখতে পারবেন।‌‌

 

 

প্রচারের ফাঁপা বেলুন।  

জনপ্রিয়

Back To Top