অন্তরা মাইতি:২০১২–র ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২০১৯–র ৭ ডিসেম্বর। মাঝখানে কেটে গিয়েছে সাত বছর। কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন রাজ্যে বদলে গিয়েছে সরকার। কিন্তু নারী সুরক্ষায় বদলায়নি কিছুই। আজও রাতের পথে গণধর্ষিতা হতে হয় কাউকে। ধর্ষকদের হাতেই পুড়ে মরতে হয় কাউকে। আর ধর্ষিতার জন্য ন্যায়বিচার, ধর্ষকদের শাস্তির দাবি জানাতে গেলে পুলিসের লাঠি আর জলকামানের মুখে পড়তে হয় প্রতিবাদীদের।
উন্নাও–এ ২৩ বছরের গণধর্ষিতা যুবতীর মৃত্যুর প্রতিবাদে এবং তাঁর জন্য ন্যায়বিচারের দাবিতে শনিবার বিকেল থেকে আবারও অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে দিল্লির রাজপথ। ঠিক যেমনটা হয়েছিল ২০১২–র ১৬ ডিসেম্বরের পর। মুখে কালো কাপড় বেঁধে নবীন থেকে প্রবীণ, ছাত্রছাত্রী থেকে সাধারণ ব্যবসায়ী, বিক্ষোভে সামিল হন সবাই। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের বিরুদ্ধে‌ স্লোগান দেন বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন তাঁরা। মৃতার আত্মার প্রতি শান্তি কামনায় হাতে জাতীয় পতাকা আর মশাল নিয়ে রাজঘাট থেকে ইন্ডিয়া গেট পর্যন্ত মোমবাতি মিছিলের আয়োজন করেছিল দিল্লিবাসীর একাংশ।

পথে পুলিস তাদের বাধা দিতেই বিক্ষোভ চরম আকার নেয়। উন্নাও–এর যুবতীর ধর্ষকরা এখনও অধরা থাকলেও, বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড টপকানোর চেষ্টা করায় তাদের হঠাতে লাঠিচার্জ করে এবং জলকামান দাগে দিল্লি পুলিস। পুলিসি তাণ্ডবে জখম হন বেশ কয়েকজন। কিন্তু পুলিসের লাঠির কাছে না দমে মোদি–যোগীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন আন্দোলকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, সরকার বদল হলেও কেন মেয়েদের নিরাপত্তা মিলছে না। ধর্ষকরা কেন শাস্তি পাচ্ছে না। ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। দিল্লি পুলিসের জনসংযোগ অফিসার এম এস রনধাওয়া পুলিসি তাণ্ডবের সাফাইয়ে বলেন, বিক্ষোভকারীরা যেহেতু মশাল জ্বালিয়েছিল তাই অগ্নিকাণ্ড এড়াতেই জলকামান দেগেছিল পুলিস।
শনিবারের অগ্নিগর্ভ রাজধানীর ছবিটা ফিরিয়ে আনল সাত বছর আগে নির্ভয়াকাণ্ডের স্মৃতি। ২০১২–র ১৬ ডিসেম্বর হোয়াইটলাইনারের বাসে গণধর্ষিতা হয় ২৩ বছরের প্যারামেডিক্যাল ছাত্রী নির্ভয়া। তারপর তাঁর প্রতি ন্যায়বিচারের দাবিতে ডিসেম্বর–জানুয়ারিতে দিল্লির কনকনে ঠান্ডায় রাস্তায় বসে বিক্ষোভ দেখিয়েছিল সারা দেশ।

সেই আন্দোলনে টলে গিয়েছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিতের গদি। তারপর এখনও পর্যন্ত দিল্লি বিধানসভা অধরাই রয়েছে কংগ্রেসের। ফাস্ট ট্র‌্যাক কোর্ট তৈরি করে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছিলেন তৎকালীন ইউপিএ সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং।
ইউপিএ জমানা গিয়ে কেন্দ্রে দ্বিতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এনডিএ সরকার। আজও বদলায়নি কিছুই। গত ২৭ নভেম্বর রাত ৯.‌২০–১০.‌২০ মিনিটের মধ্যে তেলঙ্গানার সামশাবাদের টোন্ডুপল্লি টোল প্লাজার কাছে ২৬ বছরের পশু চিকিৎসককে চার মদ্যপ দুষ্কৃতী গণধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে খুন করে। তারপর পেট্রোল ঢেলে তাঁর দেহ পুড়িয়ে দেয় শাদনগরের ছট্টনপল্লি সেতুর কাছে। ওই ঘটনায় ফের দেশে গণধর্ষণের বিরোধিতায় বিক্ষোভ শুরু হয়। ধর্ষকদের প্রতি কড়া আইন পরিবর্তনের দাবি জানাতে থাকেন সকলে। সংসদের শীতকালীন অধিবেশনও এই ঘটনায়  উত্তাল হতে শুরু করে।
এর মধ্যেই চলতি সপ্তাহের শুরুতেই উন্নাও–এর ২৩ বছরের গণধর্ষিতা যুবতীকে আদালতে সাক্ষ্য দিতে যাওয়ার সময় প্রথমে ছুরি চালিয়ে তারপর গায়ে পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয় অভিযুক্ত ধর্ষকরাই।

অভিযুক্তরা সম্প্রতি জামিন পেয়েছিল। গায়ে আগুন নিয়েই আর্তনাদ করতে করতে এক কিলোমিটার রাস্তা ছোটেন যুবতী। শরীরের ৯৪ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল তাঁর। শুক্রবার রাতে মৃত্যু হয় যুবতীর। আর সেই যুবতীর জন্য ন্যায়বিচার সহ দেশের সব মেয়েদের জন্য নিরাপত্তার দাবিতেই আবার উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানীর রাজপথ।
তিনটি ঘটনাতেই কয়েকটা জিনিস লক্ষ্যণীয়। নির্ভয়া বা উন্নাও–এর যুবতীর বয়স ছিল ২৩ বছর। নির্ভয়া ছিল প্যারা–মেডিকের ছাত্রী। সামশাবাদের ধর্ষিতা ছিলেন পেশায় একজন পশু চিকিৎসক। তিনবারই বিক্ষোভ, প্রতিবাদে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিয়েছেন অজানা, অপরিচিত মানুষজন। নির্ভয়ার গণবিপ্লব যেভাবে ১৫ বছরের শীলা দীক্ষিত সরকার এবং ১০ বছরের ইউপিএ সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল, উন্নাও–এর আন্দোলন কি সেভাবে ধাক্কা দিতে পারবে এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট যোগী আদিত্যনাথ সরকার বা দেশকে শক্ত জমিতে দাঁড় করানোর দাবি করা এনডিএ সরকারকে।
ছবি:‌ এএনআই             ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top