রাজীব চক্রবর্তী, দিল্লি: শান্তি?‌ হ্যাঁ, শ্মশানের শান্তি। সারা জীবনের সঞ্চয়, ঘর–‌‌বাড়ি, রুটি–‌‌রুজি, এমনকী স্বজনকে হারিয়ে ঠিক যেমন শান্তি বিরাজ করা সম্ভব, তাই চোখে পড়ছে বিস্তীর্ণ ভস্মীভূত অংশে। উপদ্রুত এলাকাগুলো প্রত্যেকটাই যেন কাশ্মীরের ভারত–‌‌পাক সীমান্তবর্তী কোনও এক গ্রাম!‌
টানা ৩ দিন ধরে সশস্ত্র হামলার ক্ষত বহন করছে রাজধানীর উত্তর–‌‌পূর্ব অংশ। মৃতের সংখ্যা ৪২। যা বেড়েই চলছে ক্রমশ। বহু মানুষ নিখোঁজ। পুলিশ এখন তৎপর। এলাকা নিয়ন্ত্রণে এসেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। অশান্তির ঘটনায় দায়ের হচ্ছে এফআইআর। গ্রেপ্তার সাড়ে ছ’‌শো। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেদিন রাতে দিল্লি ঢুকলেন, শুরুটা হয়েছিল সেই দিন। সোমবার দুপুরে। প্রথমে গুলি বর্ষণ, পেট্রোল বোমা। তারপর প্রাণে মরার আতঙ্কে মানুষ বাড়িছাড়া। তারপর বেপরোয়া লুঠপাট। আরও পরে ফাঁকা ঘর এবং আসবাবে আগুন ধরানো। পুলিশ সূত্র জানাচ্ছে, এই প্রথম এমন এক দাঙ্গা হল যেখানে যথেচ্ছ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দুষ্কৃতীরা দাপিয়ে বেড়িয়েছে। কী ছিল না তার মধ্যে!‌ দেশি কাট্টা (‌রিভলভার)‌, পাইপগান থেকে আধুনিক অস্ত্র, সবই ছিল। সবই কিন্তু ঘটেছে দিল্লি পুলিশের নাকের ডগায়। পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ সব মহলে। ভাইরাল হওয়া ভিডিয়োতে যে শাহরুখকে গুলি চালাতে দেখা গিয়েছিল, এখন জানা যাচ্ছে সে আদৌ ধরাই পড়েনি। তারপরে পুলিশের উপস্থিতিতে শয়ে শয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে যারা পাল্টা আক্রমণ চালাল, তাদের সবাইকে কি আর কোনওদিন খুঁজে পাওয়া যাবে?‌
রীতিমতো ছক কষে, অস্ত্র নিয়ে দিনের আলোয় উত্তরপ্রদেশ থেকে ঢুকেছিল দুষ্কৃতকারীরা।

এ যাবৎ গুলিবিদ্ধ ৮০ জন। বহিরাগতদের গাড়িতে ছিল ঠান্ডা অ্যাসিড ভরা বোতল। বোতলের মুখ প্লাস্টিক দিয়ে বাঁধা ছিল। বোতল ছুড়ে আক্রমণের পাশাপাশি বাড়ি–‌‌ঘর ও দোকানে আগুন লাগাতে কাজে এসেছে সেগুলি। প্রস্তুতি ছাড়া যা কখনওই সম্ভব ছিল না। একই ভাবে বোতলবন্দি পেট্রোল দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল পেট্রোল বোমা। হামলার আগে সকাল থেকে ইট,‌ পাথর বোঝাই গাড়ি ঢুকছিল এলাকায়। ওদিকে লোনি হয়ে শিব বিহার। তারপর নহর (‌বড় নালা)‌ পার হয়ে চমন পার্ক। অন্যদিকে ওয়াজিরাবাদ–‌‌গাজিয়াবাদ সড়কের ভজনপুরা দিয়ে কারাওয়ল নগর চক। কার্যত সাঁড়াশি আক্রমণ। পালানোর পথ ছিল না স্থানীয় মানুষের।
আচমকা আক্রমণ কেন?‌ শাহিনবাগের কায়দায় সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে জাফরাবাদে শান্তিপূর্ণ ধর্না–‌‌বিক্ষোভে বসেছিলেন একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মহিলারা। তাঁদের ‘‌শিক্ষা’‌ দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতে থাকার সময় কেন?‌ হামলাকারীদের পরিকল্পনা ছিল, ট্রাম্প নিয়ে যখন সংবাদমাধ্যম ও দিল্লি পুলিশের বড় কর্তারা ব্যস্ত থাকবেন, ঠিক তখনই ‘‌অপারেশন’‌ হবে। 
শুক্রবার দুপুরে খাজুরি খাস থানার ভজনপুরা মোড়ে গিয়ে যা দেখা গেল তা লিখে প্রকাশ করা কঠিন।জাতীয় সড়ক থেকে কারাবল নগর যাওয়ার মোড়ে একটি পুলিশ ক্যাম্প। ২৪ ঘণ্টা পুলিশকর্মী অন ডিউটি থাকেন। ক্যাম্পটির দেওয়াল থেকে মেরেকেটে ৭–‌‌৮ ফুট দূরেই চাঁদবাবার মাজার। সেটি পুড়ে ছাই।

মাজারের পীর মিনাজ দৌড়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। ফিরে এসেছেন। শুধুই কাঁদছেন। পুলিশ ক্যাম্প থেকে ১০০ মিটার দূরে ‘‌আদাজ চিকেন সেন্টার’‌ নামে রেস্টুরেন্ট চালাতেন মহম্মদ আজাদ। তার পাশে মেজো ভাই বুরে খানের ছোলা–‌‌বাদাম ভাজার দোকান। তার পাশে বড় ভাই দিন মহম্মদের পাইকারি ফলের দোকান ছিল। দোকানগুলির ওপরে তিন ভাইয়ের পরিবার বাস করত। সদস্য সংখ্যা ২৮। এছাড়াও থাকতেন ৮ জন কর্মচারী। ভস্মীভূত রেস্টুরেন্ট। শখের মারুতি রিৎজ গাড়িটিও। আজাদ বলছিলেন, ‘‌টানা তিন ঘণ্টা ধরে বাইরে থেকে লোক আসছিল। ধমক চলছিল। গাড়ি ভর্তি করে ইট,‌ পাথর জড়ো করা হচ্ছিল। পুলিশ ফাঁড়ির এত কাছে রয়েছি, তাই কিছু হবে না ভেবে পরিবারকে আশ্বাস দিয়ে রেখেছিলাম। সোমবার দুপুর আড়াইটা নাগাদ প্রথম পুলিশের সামনে গুলি বর্ষণ করতে করতে আক্রমণ করে বহিরাগতরা। সঙ্গে ছিল স্থানীয় মাতব্বররা। তাদের কাজ ছিল সংখ্যালঘুদের বাড়ি চিনিয়ে দেওয়া।’‌ তবে, ধীরে ধীরে হলেও স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা করছে কলঙ্কিত রাজধানীর এই পোড়া অংশ। এখন ৭ হাজার আধাসেনা জওয়ান টহল দিচ্ছেন। ইট–পাথর ভরা রাস্তা পরিষ্কার করছে কর্পোরেশন। পুলিশ সতর্ক করে দিচ্ছে, গুজবে কান দেবেন না। বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, দিল্লির ২০৩ থানার মধ্যে ১২টি থানা এলাকায় অশান্তি ছড়িয়েছিল, এবং এখন তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে।

 

মলোটভ ককটেল, অ্যাসিড, ঢাউস গুলতি। দিল্লিতে দাঙ্গার প্রস্তুতি আগে থেকেই ছিল। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top