বাহারউদ্দিন: বৃষ্টিভেজা রাস্তা আর অলিগলি। যানহীন, জনহীন। সকালেই ভেসে উঠল মধ্যরাতের গোরস্থান অথবা শ্মশানের স্তব্ধতা। শ্রীনগর–‌সহ উপত্যকার প্রতিটি ছোট বড় শহরে। বন্ধ দোকানপাট, ঘরবাড়ির দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন অস্ত্রধারী রক্ষীরা। সতর্ক চোখ। গম্ভীর মুখ। খাকি পোশাকে বৃষ্টির ছাঁট। ডাউনটাউনে একজন সশস্ত্র রক্ষী রাস্তার জমা জলের সঙ্গে পা দিয়ে খেলছিলেন। কী খেলা, নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে ওঠার? 
পাশেই মসজিদ। গগনচুম্বী মিনার। খানিকটা ইন্দোসারাসিন আর আবহমান কাশ্মীরি স্থাপত্যের সাক্ষী। পর্যটনের মরশুমে এই এলাকায় ভোর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ভিড় জমে থাকত। প্রতিকূল পরিস্থিতি এখন। জুম্মা আর ইদ উপলক্ষে দিন দুয়েক কার্ফু অংশত শিথিল ছিল। আজও কোনও কোনও এলাকায় দুপুর পর্যন্ত বাজার–‌হাট খুলে দেওয়া হয়। তবে পাকিস্তান ও ভারতের স্বাধীনতা দিবসের দিকে নজর রেখে, বিকেলের দিকে নিরাপত্তার পাথুরে চাপ ফিরিয়ে এনেছে প্রশাসন। এ পর্যন্ত কোথাও কোনও শোরগোল শোনা যায়নি। নারা ধ্বনি ওঠেনি। পাক–‌পতাকা উত্তোলনের একরত্তি কসরত নজরে আসছে না। মিরা কদল, সেবা কদল এরকম সব এলাকায় দমবন্ধ পরিবেশ। 
১৪–‌১৫ আগস্ট ভালয় ভালয় যদি উতরে যায়, তাহলে প্রশাসন জেলাভিত্তিক কার্ফু ‌প্রত্যাহারের কথা ভাববে। মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্দিদশা থেকে মুক্ত হতে পারে। সবকিছুই পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। ভারতের সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াতের প্রত্যাশা, কাশ্মীর শিগগিরই তার অভ্যস্ত ছন্দে ফিরবে। সেনারা খালি হাতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলবেন। এ ছবি হয়তো কষ্টকল্পিত নয়। অভিজ্ঞ সেনাপ্রধানের হৃদয়প্রেরিত স্বপ্ন।
কিন্তু সবকিছুই নির্ভর করছে পাকিস্তান, ও পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিদের তৎপরতা কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপর। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পাকিস্তান কোণঠাসা। রাষ্ট্রপুঞ্জ তাদের অভিপ্রায়কে আমল দিচ্ছে না। এ পর্যন্ত পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার এমন কোনও মুসলিম অধ্যুষিত দেশ নেই, যারা কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়েছে। নীরব ইয়োরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়াও। আমেরিকাও 
মধ্যস্থতার উপযাচিত ইচ্ছা ছেড়ে পিছু হটল। বলেই দিয়েছে, ৩৭০–‌এর বিলোপ কিংবা লাদাখ ও জম্মু–‌কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় শাসনের স্থাপনা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা নাক গলাব না। 
ভারতের বড় বাজার আমেরিকার লক্ষ্য। শক্তিমান ভারত, উদীয়মান ভারত, কূটনীতিতে খানিকটা–‌সফল ভারতকে ওয়াশিংটন বিলকুল চটাবে না। চটালে মার্কিন অর্থনীতি, বাণিজ্য সঙ্কটে পড়বে। চীন পশ্চিমি দেশগুলোর সাম্প্রতিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর সতর্ক নজর রেখেছে। দ্বিতীয়ত, তিব্বত ঘেঁষা লাদাখে তার সহজ প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখতে বেইজিং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। গোড়াতে ৩৭০–‌এর অবলুপ্তি নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেনি। আবার, লাদাখে কেন্দ্রীয় শাসনের সূচনাকেও ভাল চোখে দেখেনি। সরাসরি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। লাদাখ নিয়ে চীনের অস্বস্তি লক্ষ্য করেই পাক বিদেশমন্ত্রী বেইজিং ছুটে যান। বহুদিনের স্বাভাবিক বন্ধু পাকিস্তানকে আশ্বস্ত করে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও চীনে গেলেন। অজুহাত, প্রস্তাবিত দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তুতি নিয়ে চীনের সঙ্গে কথা বলা। তিন দিনের সফরে জয়শঙ্কর বেইজিংয়ের নানাস্তরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। চীনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই তাঁকে বলেই দিলেন, লাদাখকে ভারতের কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের আওতায় নিয়ে আসায় তাঁরা অসন্তুষ্ট। কেন না, এতে চীনের সীমান্ত–‌স্বার্থে ঘা পড়বে। দ্বিতীয়ত, তাঁদের সার্বভৌমত্বে ভারতের এখনকার অবস্থান চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। তৃতীয়ত, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতি রক্ষার্থে দুই দেশের ঘোষিত চুক্তি লঙ্ঘন করল ভারত।
চীনের এসব যুক্তি ভারত মানছে না। এস জয়শঙ্কর ওয়াংকে বলেছেন, লাদাখে কেন্দ্রীয় শাসনের সূচনা চীন–‌ভারতের চুক্তির শর্তকে বিলকুল হেয় করছে না। কাশ্মীর ইস্যু দুদেশের সীমান্ত অথবা লাইন অফ অ্যাকচুয়্যাল কন্ট্রোলের ওপর কোনও প্রভাব ফেলবে না। ওয়াং বলেছেন, কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে চীন উদ্বিগ্ন। জম্মু–‌কাশ্মীরের সাংবিধানিক মর্যাদার অবলুপ্তিতে বিতর্কিত এলাকার স্থিতিতে ভাঙন তৈরি করবে। বাড়িয়ে তুলবে আঞ্চলিক উত্তেজনা। চীন বিশ্বাস করে, ভারতের একতরফা পদক্ষেপ কাশ্মীর পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলবে।
চীনের দৈনিক গ্লোবাল টাইমস বলেছে, জয়শঙ্করের চীন সফর পূর্বপরিকল্পিত। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কোনও কোনও বিশেষজ্ঞের ধারণা, পাকিস্তানি বিদেশমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশি চীনের বিদেশমন্ত্রীকে তাঁদের উদ্বেগ জানিয়ে এসেছেন বলেই জয়শঙ্করের তড়িঘড়ি চীনসফর। চীনা বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য উল্লেখ করে চীনের সরকারি সংবাদপত্রটি বলেছে, ভারত দায়িত্বহীন পদক্ষেপ নিয়ে বসেছে। একতরফা সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ভারতকে সমস্যায় ফেলবে। সেন্টার ফর এশিয়া–‌প্যাসিফিক স্টাডিজের অধিকর্তা ঝাও গানচেং–‌এর বিবৃতি উল্লেখ করে গ্লোবাল টাইমসে বলা হয়, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার অবলুপ্তি জাতীয়তাবাদেরই আরেক কার্নিভাল। এরকম জাতীয়তাবাদী ভারতকে এশিয়া আলিঙ্গন করবে না। উদীয়মান ভারতের শান্তিপূর্ণ প্রতিবেশী দরকার। পাকিস্তানকে প্ররোচিত করা ভুল রাস্তা।
চীনের সরকারি সংবাদপত্র, বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য আর চীনা বিদেশমন্ত্রী ওয়াং–‌এর সঙ্গে জয়শঙ্করের বৈঠক থেকে পরিষ্কার, কাশ্মীর নিয়ে চীন পুরনো অবস্থান বদলাচ্ছে না। বদলাবে না। নিঃসঙ্গ পাকিস্তানের পাশে থাকবে এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়টিতে নাক গলাবে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিসর তৈরিতে যা অনাকাঙ্ক্ষিত। অক্টোবরে প্ৰধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রস্তাবিত চীন সফর আর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর শীর্ষস্তরের বৈঠক কোনদিকে মোড় নেবে, তা পুরোপুরি অনিশ্চিত। সংশয়াচ্ছন্ন। আকাশ অংশত মেঘলা। শীতে বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি আছড়ে পড়বে না, কে বলতে পারে? চাপ বাড়াচ্ছে অশনির পূর্বাভাস।‌‌‌

শ্রীনগর। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top