আজকালের প্রতিবেদন: গত বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে সিপিএম কেন্দ্রীয় কমিটির সমালোচনা অনুমোদন পেল না রাজ্য সম্মেলনের খসড়া প্রস্তাবে। ২০১৬–‌র ভোটে রাজ্য সিপিএমের সঙ্গে কংগ্রেসের আসন সমঝোতা হয়েছিল। পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচনী পর্যালোচনা করে এই আসন সমঝোতার সমালোচনা করে। তখন কেন্দ্রীয় কমিটি বলে, ২১তম পার্টি কংগ্রেসে দল যে রাজনৈতিক কৌশলগত লাইন নিয়েছিল, তার সঙ্গে রাজ্য পার্টির লাইন সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। কিন্তু এখন দলের রাজনৈতিক–‌সাংগঠনিক খসড়া প্রস্তাবে রাজ্য পার্টির লাইনকেই সমর্থন করা হয়েছে। বলা হয়, কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করার জন্যে ‘‌শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতার’‌ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ফলে, দলের কর্মী–‌সমর্থকেরা উৎসাহ পান। তাঁদের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি হয়। ওই সমঝোতার কারণে তৃণমূল সঙ্গী পায়নি। পরে ভোটের ফল বেরোলে দেখা যায়, ২০১৪–র লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় বিজেপি–‌র প্রায় ৭ শতাংশ ভোট হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে ২০১৪–‌র তুলনায় ২১টি জয়ী বিধানসভা আসনে বিজেপি–‌র পরাজয় হয়। রাজ্যে দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে বিজেপি দাঁড়াতে পারেনি। সেজন্য কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতার লাইনকে এই খসড়ায় সমর্থন জানানো হয়েছে। 
এদিকে, বুধবার সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম বলেন, এখন যা পরিস্থিতি তাতে বিজেপি–‌র বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করা প্রয়োজন। বিজেপি ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে একজোট হতে হবে। তৃতীয় ফ্রন্ট করলে ভোট ভাগাভাগি হবে। তাতে বিজেপি–‌র সুবিধা। তিনি বলেন, বামেরা যেসময় তৃতীয় ফ্রন্টের কথা বলেছিল, সেসময় অ–‌কংগ্রেসি সরকার গঠন জরুরি ছিল। সেটা ছিল চন্দ্রশেখর, ভি পি সিংয়ের আমল। এখন রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে। বিজেপি অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এই সময় তৃতীয় ফ্রন্ট গঠনের অর্থ বিজেপি–বিরোধী ভোট ভাগাভাগি করে দেওয়া। তাতে বিজেপি–‌র হাতই শক্ত হবে। তাই সরাসরি লড়াইয়ের কথা বলছি। 
কিন্তু এদিন একটি আলোচনাচক্রে পলিটব্যুরোর নেতা প্রকাশ কারাত বলেন, আমরা যখন বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যের কথা বলি, তখন লোকে ভাবে ভোটের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু শুধু ভোট নয়, বিকল্প খোঁজাই আমাদের আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত। সম্মেলনে একজন প্রতিনিধি বলেছেন, রাজ্যে আরএসএস ৮২৫টি স্কুল চালাচ্ছে। সারা দেশে ৪০ হাজার। এই সব স্কুলে যারা পড়ছে, তাদের মনের মধ্যে হিন্দুত্ববাদী আদর্শ গেঁথে দেওয়া হচ্ছে। এই দিকটায় লক্ষ্য রেখে জমি তৈরি করতে হবে। আরএসএসের সংগঠনের ওপর দাঁড়িয়ে বিজেপি ভোট জিতছে। আরএসএস সামাজিকভাবে কাজ করে বিজেপি–‌কে রাজনৈতিক লাভ এনে দিচ্ছে। অ–‌বিজেপি ঐক্যের জন্য রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হবে। তা হলে বাতাবরণ তৈরি হবে। ত্রিপুরায় কংগ্রেসের ভোট পেয়েছে বিজেপি। ওই রাজ্যে আদিবাসী এলাকায় বাম সরকার উন্নয়ন করা সত্ত্বেও আমরা ফল পাইনি। কারণ আরএসএস ওখানে দীর্ঘদিন পড়ে থেকে কাজ করেছে। এদিন প্রকাশ কারাতের গলায় মূলত বিজেপি বিরোধী সুর ছিল। কিন্তু তিনি উদার অর্থনীতির ব্যাপারে কংগ্রেসের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, কংগ্রেসই নতুন উদার অর্থনীতি দেশে এনেছিল। বিজেপি তা আরও বাড়িয়েছে।এদিকে, প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় বেশিরভাগ জেলার প্রতিনিধি কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার লাইনটিকে সমর্থন করেছেন। ২১তম পার্টি কংগ্রেসের লাইনের সঙ্গে সম্মেলনের বেশিরভাগ প্রতিনিধিই একমত নন। অধিকাংশ প্রতিনিধি কংগ্রেসের নাম না করে আসন সমঝোতার লাইনের উল্লেখ করেছেন। যেমন তন্ময় ভট্টাচার্য, গৌতম ঘোষ। তবে কলকাতা জেলার সুদীপ সেনগুপ্ত, বিপ্লব মজুমদারের মতো কেউ কেউ জোটের লাইন সমর্থন করেননি। 
এই খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, গত বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সিপিএম ও বামফ্রন্টের কাছে আসন সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেই ভিত্তিতেই পার্টি ও বামফ্রন্ট কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়া করে। সন্ত্রাসের বাধা পেরিয়ে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জীবন–‌জীবিকার লড়াইয়ে মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মানুষের মধ্যে আস্থা অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এদিন রাজ্য সম্মেলনে ৫টি প্রস্তাব পেশ হয়। গণতন্ত্রের জন্য লড়াই, দার্জিলিং ও উত্তরবঙ্গের সমস্যা, নারী ও শিশুদের অধিকার, বেকারি, মূল্যবৃদ্ধি রোধ, খাদ্য সুরক্ষা— এইসব বিষয়ে খসড়া প্রস্তাব পেশ হয়েছে। রাজনৈতিক–‌সাংগঠনিক প্রস্তাবটির ওপর বুধবারও প্রতিনিধিরা আলোচনা করেছেন। ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top