আজকাল ওয়েবডেস্ক: নাৎসি জার্মানির কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে করা হতো এমন। ইতিহাস সাক্ষী সেই অমানবিকতার। বর্ণ–শ্রেষ্ঠত্বের ধারণায় বিশ্বাসী হিটলারের জার্মানির চোখে ইহুদিরা যেহেতু ‘‌নোংরা’‌ এবং অস্বাস্থ্যকর, তথাকথিত শ্রম শিবিরে ঢোকানোর আগে পরিষ্কার করে নেওয়া হতো তাদের। জীবাণুনাশক ছড়িয়ে। সেই ভয়ঙ্কর অমানবিক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে গেল যোগী আদিত্যনাথের রাজ্য উত্তরপ্রদেশে। ভিন রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের বসিয়ে, হোস পাইপ থেকে তাদের গায়ে ব্লিচিং পাউডার গোলা জল ছড়িয়ে শুদ্ধ করে নেওয়া হল তাদের। যে ব্লিচিং পাউডার অবশ্যই মানুষগুলোর চর্ম রোগের কারণ হবে, আরও বড় ক্ষতি হয়ে যাওয়া, যেমন অন্ধত্বও অস্বাভাবিক নয়। ঘটনার পর উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ নাকি ক্রুদ্ধ। শাস্তির নির্দেশ দিয়েছেন বেরিলির ওই পুলিশ অফিসারদের, যারা ওই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। কিন্তু ওই ব্লিচিং–জলে কি সেই পাপ ধুয়ে গেল?‌ নাকি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল অমানবিক ভারতের দগদগে চেহারাটা!‌  
গোটা ভারত, গোটা বিশ্ব দেখে নিয়েছে গভীর লজ্জার সেই দৃশ্য। কোনওমতে নিজের রাজ্যে ফিরেছেন ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকরা। ভিড় বাসে গাদাগাদি করে দিল্লি, নয়ডা, হরিয়ানা থেকে তাঁরা এসেছেন। বাস থামল বেরিলিতে। সবাইকে বাস থেকে নামতে বলা হল। হুকুম করা হল, জন্তু–জানোয়ারের মতো এক জায়গায় জড়ো হয়ে উবু হয়ে বসতে। বলা হল, নিজেদের ও বাচ্চাদের চোখ চাপা দিতে। তার পর সংক্রমণ–প্রতিরোধক পোশাক পরে থাকা সরকারি কর্মীরা তিন দিক থেকে তাঁদের উপর হোস পাইপ দিয়ে জীবাণুনাশক স্প্রে করতে শুরু করলেন।
তীব্র প্রতিবাদ হচ্ছে দেশ জুড়ে। তবে ব্লিচিং পাউডার ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেছেন বেরিলিতে কোভিড ১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধের দায়িত্বে থাকা নোডাল অফিসার অশোক গৌতম। তিনি বলছেন, স্যানিটাইজার এবং জলের সঙ্গে ক্লোরিন মিশিয়ে স্নান করানো হয় ওই শ্রমিকদের। কোনও রাসায়নিক দেওয়া হয়নি।
কিন্তু ইতিহাস ভুলতে দিচ্ছে না। নাৎসি জার্মানি ইহুদিদের জড়ো করে, তাড়িয়ে নিয়ে যেত কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। সেখানে ঢোকার আগে তাঁদের মাথা কামিয়ে দেওয়া হতো। নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে। কারণ, মাথায় যদি উকুন থাকে। আর কোনও চর্মরোগ থাকলে?‌ সবাইকে উলঙ্গ করে হোস পাইপ দিয়ে জলের তোড়ে ধুইয়ে দেওয়া হত শরীর। তার পর স্প্রে করা হত রাসায়নিক। মিল পাওয়া গেল না ২০২০ সালের উত্তরপ্রদেশের সঙ্গে?‌
মনোবিদ অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘‌এর আগে বহু ভিনরাজ্যের শ্রমিককেই দেখা গেছে একসঙ্গে জড়ো হয়ে আতঙ্কিত চোখ মুখ নিয়ে বাড়ি ফেরার অপেক্ষা করতে। সে ছবি টিভিতে দেখেই যথেষ্ট মর্মান্তিক লেগেছিল। আর কাল যা দেখা গেল, তাতে আরও একটা প্রশ্ন উঠছে মনে। আমরা নিজেদের বাঁচানোর তাগিদে অপরের ক্ষতি ও অসম্মান করছি কী অনায়াসে!‌ করোনার কারণে বিশ্ব জুড়েই মানুষ আপ্রাণভাবে চেষ্টা করছেন কী ভাবে সুরক্ষিত থাকা যায়। তবে সে সময় অপরের প্রতি যদি সংবেদনশীলতা কমে যায়, সেটা দুর্ভাগ্যজনক। নিজেদের বাঁচাতে চেয়ে অন্যের প্রতি এই আচরণ অমানবিক।’‌
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইমন কল্যাণ লাহিড়ি বলছেন, ‘ভারতের জনসংখ্যা প্রচুর, তার অর্ধেকের বেশি দারিদ্রসীমার নীচের মানুষ। তাঁদের কথা সরকার না ভাবলে চলবে কী করে? মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে সারা দেশে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। সে সময় এই অভিবাসী শ্রমিকদের কথা মাথায় রাখা দরকার ছিল। তাঁদের গন্তব্য, খাবার, ওষুধের দায়িত্ব তো সরকারেরই। কিন্তু ভিনরাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের উপর কীটনাশক স্প্রে করা আসলে অবৈজ্ঞানিক, অমানবিক। যাঁরা মাইলের পর মাইল হেঁটে শুধু বাড়িতে পৌঁছতে চাইছেন, তাঁদের পরিবারের যে মানসিক অবস্থা তৈরি হল তার দায়িত্ব কে নেবে? পরিযায়ী শ্রমিকদের কি কোনওভাবেই সম্মানের সঙ্গে পরিশোধনের ব্যবস্থা করা যেত না? স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও ভারতে এ অবস্থা চললে তার দায়ও বর্তায় সরকারের উপরেই।’

জনপ্রিয়

Back To Top