আজকালের প্রতিবেদন‌, দিল্লি: ভারতে এ যাবৎ করোনা–আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়াল। আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা হিসেবে প্রায় ৪২ শতাংশ ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সি। এরপর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সি ব্যক্তিরা। শতকরা হিসেবে মোট আক্রান্তের ৩৩ শতাংশ। ১৭ শতাংশ ষাটোর্ধ্ব নাগরিক। সদ্যোজাত থেকে ২০ বছর বয়সের মধ্যে আক্রান্তের হার সবচেয়ে কম। মোট আক্রান্তের ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, আক্রান্তদের ‌৭৪ শতাংশই হলেন ২০ বছরের বেশি এবং ৬০–এর কমবয়সি মানুষজন। শুধু ভারত নয়, চীন–‌সহ অন্যান্য দেশের সমীক্ষাতেও মোটামুটি একই ধরনের পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। অতএব, কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া এই তথ্য অনুযায়ী ভারতে মারণ ভাইরাস আরও মারাত্মক আকার ধারণ করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হতে পারেন যুবকেরা। ভারতে অবশ্য ২১–‌৪০ বছর বয়সি মানুষের হারও মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। ষাটোর্ধ্ব মানুষ রয়েছেন প্রায় ৯ শতাংশ।
এদিকে, দেশে এখনও পর্যন্ত করোনা–আক্রান্তের সংখ্যা ৩,০৭২। এর মধ্যে ভাল হয়েছেন ২১২ জন। মৃত্যু হয়েছে ৭৫ জনের। মৃতদের বেশিরভাগই কিন্তু ষাটোর্ধ্ব। চিকিৎসা চলছে ২,৭৮৪ জনের। শুক্রবার সকাল থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৭০০–র বেশি মানুষ। একদিনে আক্রান্তের সংখ্যায় এটাই সর্বোচ্চ। শনিবার সকালের হিসেব অনুযায়ী, চিকিৎসাধীন ৫৮ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এঁরা দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ এবং কেরলে চিকিৎসাধীন। শনিবার এ কথা জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব লব আগরওয়াল। তিনি জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে গোটা দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যায় যে বৃদ্ধি দেখা দিয়েছে, তার অন্যতম কারণ দিল্লির নিজামুদ্দিনে তবলিগি জামাত মরকজে যোগ দেওয়া ব্যক্তিরা। শনিবার সকাল ৯‌টার হিসেব অনুযায়ী, তখনও পর্যন্ত দেশে মোট আক্রান্ত ২,৯০২ জনের মধ্যে ১,০২৩ জনই নিজামুদ্দিনের জামাতে গিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, করোনা সঙ্কট নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পাশাপাশি দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে সর্বদল বৈঠক ডেকেছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। ৮ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সব দলের লোকসভা ও রাজ্যসভার নেতাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। এ খবর জানিয়েছেন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশি। তিনিই বিভিন্ন দলের সংসদীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ভারতে প্রথম করোনা ভাইরাস আক্রান্তের সন্ধান মিলেছিল ৩০ জানুয়ারি। উহান থেকে ফিরেছিলেন তিনি। তারপর থেকে একে একে গোটা দেশে বিভিন্ন জায়গায় ‘‌হটস্পট’‌ তৈরি হয়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলি যথাসাধ্য মোকাবিলা করে চলেছে। ২৫ মার্চ থেকে দেশব্যাপী ২১ দিনের লকডাউন চলছে। লকডাউন শেষের পরেই আসবে সবচেয়ে কঠিন সময়। তার জন্য রাজ্যগুলির পরামর্শ নিয়ে কেন্দ্র কৌশল তৈরি করছে। তা চূড়ান্ত করার আগে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও কেন্দ্র একবার কথা বলে নিতে চায়।
রোগ যদি খুব বেশি ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তখন কী করা হবে তা নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক ‘‌কনটেইনমেন্ট প্ল্যান ফর লার্জ আউটব্রেকস’‌ শীর্ষক একটি নথি প্রকাশ করেছে। এর থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, লকডাউন উঠে যাওয়ার পরেও ‘‌হটস্পট’‌গুলিতে কড়া নিয়ন্ত্রণ থাকবে। স্কুল–কলেজও বন্ধ রাখা হতে পারে। যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞাও থাকবে। এইসব নিষেধাজ্ঞা বলবত করতে ২০০৫ সালের বিপর্যয় মোকাবিলা আইন, ১৮৯৭ সালের মহামারী আইন, রাজ্যগুলির জনস্বাস্থ্য আইন ও ভারতীয় দণ্ডবিধি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এদিকে, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক ঘনবসতি অঞ্চলে বসবাসকারীদের এখন থেকে ঘরে তৈরি ‘‌ফেসকভার’‌ ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। মুখ–নাক ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করতে পরিষ্কার কাচা কাপড়কে সেলাই করে নিয়ে এই ‘‌ফেসকভার’‌ তৈরি করা সম্ভব। সেইসঙ্গে বিশ্বে করোনা পরিস্থিতির উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘‌আপাতত গৃহবন্দি থাকাই শ্রেয়।’‌ পাশাপাশি কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ বলেছেন, সোশ্যাল সাইটে আতঙ্ক ছড়ালে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। করোনার জন্য প্রয়োজনীয় সাজসরঞ্জামের অভাব নেই বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এদিকে, তবলিগি জামাতের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের সংস্পর্শে আসায় গোটা দেশে এখনও পর্যন্ত ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে মোট ২২ হাজার মানুষকে ‘‌কোয়ারান্টিন’‌ করা হয়েছে। রাজ্যগুলির মধ্যে রয়েছে রাজস্থান, উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, হরিয়ানা, জম্মু–কাশ্মীর, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, অসম, কর্ণাটক, আন্দামান নিকোবর, ঝাড়খণ্ড। অন্যদিকে, আইসিএমআর জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ৭৫ হাজার মানুষের কোভিড–‌১৯ পরীক্ষা করা হয়েছে। এখন থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রক। লকডাউন উঠে যাওয়ার পর দূরপাল্লার ট্রেন চালানোর তোড়জোড় চলছে বলে রেল ভবন সূত্রের খবর।
এর মধ্যে করোনা–আতঙ্কে পাঞ্জাবে এক দম্পতি আত্মঘাতী হয়েছেন। সুইসাইড নোটে লিখে গেছেন, ‘‌করোনা নিয়ে বড্ড মানসিক চাপে ছিলাম।’‌ লকডাউন উঠে যাওয়ার পর উত্তরপ্রদেশের প্রত্যেককে দুটি করে মাস্ক বিতরণ করবে রাজ্য সরকার। এজন্য ৬৬ কোটি মাস্ক তৈরি শুরু করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top