রাজীব চক্রবর্তী, দিল্লি: নমো–রাজত্বে প্রথম বিজেপি–র বর্ধিত জাতীয় পরিষদের সভা। শুরুতেই বক্তা দলের সভাপতি অমিত শাহ। রামলীলা ময়দানের মঞ্চে তখন উপস্থিত লালকৃষ্ণ আদবানি, মুরলীমনোহর যোশি, রাজনাথ সিং, নীতিন গাডকারি, সুষমা স্বরাজরা। প্রথম চার জনই দলের প্রাক্তন সভাপতি। সভায় নরেন্দ্র মোদির আসা ও যাওয়ার মাঝে ঘণ্টা দুয়েকে এঁদের কারও সঙ্গে তাঁর বার্তালাপ নজরে পড়ল না। ওদিকে, কার্যত এঁদের সবাইকে অগ্রাহ্য করে আগাগোড়া নমো প্রশস্তিতে ব্যস্ত রইলেন শাহ। এমনকী, নরেন্দ্র মোদির সুবিশাল ফুলের মালায় জায়গা হল না তাঁদের কারও। সচরাচর মঞ্চে উপস্থিত গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের এক মালায় দেখা যায়। দলের বর্ধিত জাতীয় পর্ষদের সভায় উঠে এল উল্টো ছবি। একাই মাথা গলালেন মোদি।
লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বিজেপি–র বর্ধিত জাতীয় পরিষদের সভা বিশেষ তাপর্যপূর্ণ। সভায় সব রাজ্য থেকে প্রায় ১২ হাজার প্রতিনিধি যোগ দিয়েছেন। ৫ বছর আগে লোকসভা নির্বাচনের আগে ১৮–১৯ জানুয়ারি জাতীয় পর্ষদের এমন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই রামলীলা ময়দানেই। সেবার মোদি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। এবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয়বার ফিরে আসার লড়াই। তার মধ্যেই তিন রাজ্যের হারে যেন ধাক্কাই লাগেনি, এমন একটা ছবি তুলে ধরতে তিন পরাজিত মুখ্যমন্ত্রীকেই দলের জাতীয় সহ–সভাপতি করে দেওয়া হয়েছে। 
এই সভার উদ্দেশ্য, দলের জেলা স্তরের পদাধিকারী ও জনপ্রতিনিধি থেকে কেন্দ্রীয় নেতা–মন্ত্রীদের সামনে দলের বার্তা তুলে ধরা। সেই সঙ্গে নির্বাচনী রণকৌশল নির্ধারণ করা। কী ছিল সেই বার্তা?‌ শাহ বক্তৃতা শুরুই করলেন ১০ শতাংশ সংরক্ষণ দিয়ে। বোঝা গেল, ওটাকেই তুরুপের তাস করতে চলেছে দল। সেই সঙ্গেই কিন্তু রাফাল থেকে নীরব মোদি–সহ যাবতীয় প্রসঙ্গে ‘‌রাহুল বাবা’‌কে আক্রমমের ভান করে তাঁর তোলা অভিযোগের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে চললেন। দাবি করলেন, মোদি সরকার কলঙ্কমুক্ত। বিজয় মালিয়া, নীরব মোদি, মেহুল চোকসিদের ঋণ দেওয়া হয়েছিল কংগ্রেস আমলে। চৌকিদারকে দেখে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে তারা। অগুস্তা ওয়েস্টল্যান্ড ইস্যুতেও রাহুলকে খোঁচা দিয়ে ‘‌মিশেল মামা’‌র উল্লেখ করেছেন শাহ। রাফাল চুক্তি নিয়ে রাহুলের রোজকার অভিযোগের উল্লেখ করে বললেন, ‘‌শুধু অভিযোগ করলেই কিছু প্রমাণ হয় না। প্রমাণ হাতে থাকলে সুপ্রিম কোর্টে গেলেন না কেন?‌’ রাফাল–বিতর্ক দেশ জুড়ে হইচই ফেলেছে। প্রভাব পড়তে পারে ভোটবাক্সে। এই দিকটা মাথায় রেখে দলের নেতাদের অমিত শাহের পরামর্শ, ‘‌প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের জবাবি ভাষণ ইউটিউবে দেখুন। নির্মলার মতো করেই বিরোধীদের জবাব দিন।’‌
দলীয় নেতাদের মনোবল চাঙ্গা করতে প্রতি দু’মিনিটে একবার শাহ দাবি করলেন, ‘‌এবারও বিজেপি জিতবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার হবে।’‌ জনধন, কালো টাকা, জিএসটি, গ্যাসের সিলিন্ডার, আয়ুষ্মান ভারত–সহ নানা প্রকল্পের উল্লেখ করে শাহের মোদি–স্তুতি চলাকালীন জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকতে দেখা গেল আদবানি, মুরলীমনোহর, গাডকারি, সুষমাদের। শাহ বললেন, ‘‌মাত্র ৫ বছরে কমপক্ষে ৫০টি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মোদি। যার মধ্যে আছে কালোটাকা উদ্ধারে নোটবাতিল থেকে শুরু করে সবর্ণদের চাকরি ও শিক্ষায় ১০ শতাংশ সংরক্ষণ।’‌ অযোধ্যায় বিতর্কিত জমিতেই রামমন্দির গড়তে চায় বিজেপি। এই দাবি করে শাহ বললেন, ‘বিজেপি চাহতি হ্যায় ‌জল্‌দ সে জল্‌দ রামমন্দির নির্মাণ হো।’‌ বক্তব্যের মাঝামাঝি সিঙ্গল লাইন আউড়ে সভা মাত করার চেষ্টা করলেন। তাৎক্ষণিক সাড়াও পেলেন। হইহই করে উঠল সভা। ধ্বনি উঠল ‘‌জয় শ্রীরাম’‌। রামমন্দির ইস্যুতে কংগ্রেসের ঘাড়ে দায় চাপাতেও ছাড়লেন না শাহ। বললেন, ‘‌রামমন্দির আটকাতে মরিয়া কংগ্রেস। সুপ্রিম কোর্টে তারা আর্জি জানিয়েছিল, লোকসভা নির্বাচনের পর শুনানি হোক। আগামী লোকসভা নির্বাচনে মোদিকে আবার ক্ষমতায় আনুন, সব স্বপ্ন পূরণ হবে।’‌
ভাষণে উঠে এল অনুপ্রবেশ ইস্যু। শাহের কথায়, ‘‌অসমে সর্বানন্দ সোনোয়ালের সরকার হতেই আমরা ৪০ লক্ষ অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করেছি। কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম, সপা, বসপা— সব দল চিৎকার শুরু করেছে। যেন নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়া লোকেরা তাদের মাসতুতো ভাই।’‌ পশ্চিমবঙ্গের প্রসঙ্গও তুললেন বিজেপি সভাপতি। বললেন, ‘‌বাংলায় হুহু করে বাড়ছে আমাদের দল। দেশের ১৬টি রাজ্যে আমরা ক্ষমতায় রয়েছি। উত্তরপ্রদেশে সপা–বসপা জোট করুক। তা সত্ত্বেও বিজেপি–র আসনসংখ্যা ৭৪ হতে পারে, ৭২ নয়।’ মোদি দাবি করেন, এর পর বাংলাতেও ক্ষমতায় আসবে বিজেপি।‌
মঞ্চের ডানদিকে বাজপেয়ীর সুবিশাল ছবি। বাঁদিকে সমান মাপের স্বামী বিবেকানন্দের ছবি লাগানো। আজ, ১২ জানুয়ারি বিবেকানন্দের জন্মজয়ন্তী। শাহের ঘোষণা, ‌বিবেকানন্দ যে ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তেমন ভারত গড়তে ‘‌অবকি বার ফির মোদি সরকার’‌–এর সঙ্কল্প নিতে হবে। বললেন, ‘‌১৯৮৭ থেকে মোদির সঙ্গে কাজ করছি। আজ পর্যন্ত কোথাও পরাজিত হননি তিনি।’
দলের প্রস্তাব
তিন রাজ্যে শোচনীয় পরাজয়ের পর আর্থিকভাবে পিছিয়ে–থাকা মানুষের জন্য চাকরি ও শিক্ষায় ১০ শতাংশ সংরক্ষণের সিদ্ধান্তকে সামনে রেখে লোকসভা নির্বাচনে ঝাঁপাতে চলেছে বিজেপি। সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার মুহূর্তে সংসদে আনা এই বিলটিকে সবার ওপরে রেখেছে দল। শুক্রবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিজেপি–র জাতীয় পরিষদের বৈঠকে কৃষি, অর্থনীতি ও গরিব কল্যাণ সংক্রান্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।
অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে সংরক্ষণকে সবার ওপরে রেখেছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। কংগ্রেসকে কটাক্ষ করে জেটলি বলেছেন, ‘‌প্রধান বিরোধী দলকে অসহায় লাগছিল। মোদির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা ছাড়া তাদের হাতে আর কোনও পথ খোলা ছিল না।’‌ তাঁর দাবি, এতদিন দেশে জাতপাতের ভিত্তিতে সংরক্ষণ ছিল। এবার দেশ থেকে গরিবি দূর করার লক্ষ্যে সংবিধানে ১২৪তম সংশোধন করে মোদি সরকারের এই পদক্ষেপ সমাজিক বিপ্লব আনবে।
বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ জনধন যোজনায় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলাকে প্রধানমন্ত্রীর সাফল্যের তালিকায় রেখেছেন। বলেছেন, ‘‌২০১৪ সালে দেশের এক–তৃতীয়াংশ মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল না। মোদি সেটা দেখেছেন। ব্যাঙ্কগুলিকে নির্দেশ দিয়ে গরিব মানুষের অ্যাকাউন্ট খুলিয়েছেন তিনি।’‌ গরিব কল্যাণে দুটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে এদিন। ১০ শতাংশ সংরক্ষণের বিষয়টি তো আছেই। সেই সঙ্গে কৃষি বিষয়ক প্রস্তাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, ‘‌দেশের অগ্রগতিতে কৃষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বেশ কিছু ফসলে কৃষকের ফসলের উৎপাদন মূল্যের থেকে দেড়গুণ করা হয়েছে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য। যেগুলি বাকি আছে, ধীরে ধীরে সেগুলিও আওতায় আসবে। নিম ইউরিয়া প্রধানমন্ত্রীর মস্তিষ্কপ্রসূত উদ্যোগ। লাভবান হয়েছেন কৃষকরা।’‌ দলের মুখপাত্র ভূপেন্দ্র যাদব বলেছেন, ‘‌কৃষি প্রস্তাবে সরকারের কৃষির বাজেট বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। মোদি সরকার ইউপিএ–র তুলনায় ১,২১,০৮২ কোটি টাকা বাজেট বাড়িয়েছে। বন্যায় ৮২ শতাংশ বেশি অর্থ সাহায্য করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, মৎস্যচাষ, সেচ ইত্যাদিতে অনেক বেশি বরাদ্দ করেছে।’

ম্রিয়মাণ। বিজেপি কর্মসমিতির বৈঠকে নরেন্দ্র মোদি।দিল্লিতে, শুক্রবার। ছবি: পিটিআই

জনপ্রিয়

Back To Top