‌সংবাদ সংস্থা, কানপুর, ১০ জুলাই

 

ধরে নিন পড়ছেন কোনও বলিউডি ছবির চিত্রনাট্য।
সকাল সাড়ে ছ’‌টা। উত্তরপ্রদেশ এসটিএফের কনভয় তখনও কানপুর ঢুকতে ৩০ কিলোমিটার বাকি। মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী থেকে কড়া নিরাপত্তায় গ্যাংস্টার বিকাশ দুবেকে নিয়ে তিন গাড়ির কনভয় বরা থানার বাউতি এলাকায় পৌঁছেছে। বর্ষায় কর্দমাক্ত রাস্তা। আচমকা উল্টে গেল গাড়ি, বিকাশ যেটিতে ছিল!‌ আর সেই সুযোগ নিয়েই পুলিশের হাত থেকে পিস্তল ছিনিয়ে নাকি পালানোর চেষ্টা করে বিশাশ। পিস্তল তাক করে পুলিশের দিকে। গুলি চালায় পুলিশ। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই সব শেষ। গ্যাংস্টার আর রাজনৈতিক নেতাদের ঘনিষ্ঠতা ধুয়ে যায় বৃষ্টির জলে। বিকাশের আত্মসমর্পণ বা ধরা পড়ার পরই এমন একটা আশঙ্কার সুর শোনা যাচ্ছিল। আর সেটাই হল!‌
উত্তরপ্রদেশ পুলিশের বক্তব্য, আত্মরক্ষার জন্যই এনকাউন্টার করতে হয়েছে। এনকাউন্টারের বিবরণে জানায়, গাড়ি উল্টে পড়লে পুলিশের পিস্তল হাতিয়ে পালানোর চেষ্টা করে বিকাশ। তাকে আটকাতে গুলি চালানো হয়। চারটে গুলি লাগে শরীরে। তিনটি বুলেট বুক চিরে বেরিয়ে যায়। একটা হাতে লাগে। জখম হন তিনজন পুলিশকর্মীও।
বলাই বাহুল্য, এই ব্যাখ্যান নিয়ে ছড়িয়েছে সংশয়। উঠছে নানা প্রশ্ন, জাগছে সংশয়। যেমন—
১.‌ লালা লাজপত রায় হাসপাতালের চিকিৎসকদের কথায়, বুকে গুলি লাগার কারণেই মৃত্যু হয়। গুলি করা হয়েছে একেবারে সামনে থেকে। প্রশ্ন, দৌড়ে পালানোর সময় গুলি করা হলে পিছন দিক থেকে গুলি লাগত। তাহলে?‌
২.‌ পুলিশ গাড়ি ওল্টানো, বিকাশের পালানোর চেষ্টার গল্প বলছে। ঘটনাস্থলের কিছু আগে ভোর চারটে নাগাদ একটি টোলপ্লাজার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে দুর্ঘটনাগ্রস্ত গাড়িতে নয়, বিকাশ ছিল অন্য গাড়িতে। কখন কেন অন্য গাড়িতে তোলা হয়েছিল বিকাশকে?‌ ‌ 
৩.‌ ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ক্লিপিংসে দু’‌জন পুলিশকর্তার কথাবার্তা শোনা গিয়েছে। তাতে একজন অন্যজনের কাছে জানতে চান, বিকাশ দুবে কি কানপুর পৌঁছবে?‌ অন্যজন হেসে বলেন, ‘‌বিকাশ কানপুর পৌঁছবে না।’‌ 
৪.‌ এনকাউন্টারের আগে এসটিএফ কনভয়কে অনুসরণ করছিল সংবাদ মাধ্যমের গাড়ি। ঘটনাস্থল থেকে ২ কিমি আগে মিডিয়ার গাড়ি আটকে দেওয়া হয়। কেন?‌ 
৫. ‌প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তারা গুলির আওয়াজ শুনে দৌড়ে এলে পুলিশ তাদের চলে যেতে বলে। গাড়ি দুর্ঘটনার কোনও আওয়াজও তারা শোনেনি। 
৬.‌ গাড়ি যে জায়গয় উল্টেছিল সেখানে কেউ ছিল না, একদিকে খোলা মাঠ। কোন বুদ্ধিতে বিকাশ এমন জায়গায় পালানোর চেষ্টা করল?‌ 
৭.‌ খুনের আসামি বিকাশ। ৬০টি মামলা ঝুলছে তার বিরুদ্ধে। তাকে হাতকড়া না পরিয়ে আনা হচ্ছিল কেন?‌ 
পুলিশের বিবরণ বা চিত্রনাট্যে ফাঁকফোকর যে যথেষ্ট তা নজর এড়ায়নি এক প্রবীণ পুলিশ অফিসারের। উত্তরপ্রদেশের এসটিএফ বাহিনী গড়ে তোলার নেপথ্যে ছিলেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‌এসটিএফের স্ক্রিপ্ট খুব কাঁচা। বিকাশের ঘটনা তার প্রমাণ। বৃহস্পতিবার যে লোকটা মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে আত্মসমর্পণ করল, শুক্রবার পুলিশের খপ্পর থেকে সে পালাতে যাবে কেন?‌ পুলিশ খুনের পরও লোকটা কানপুরে বসে রইল, অথচ পুলিশ তার নাগালই পেল না, এটা এসটিএফের বিরাট বড় ব্যর্থতা। ১৯৯৭–৯৮ সালে শ্রী প্রকাশ শুক্লার ঘটনায় এনকাউন্টারের আগে প্রতি পদক্ষেপ এসটিএফের নখদর্পণে ছিল।’‌ অনেকেরই অভিযোগ, এটা ভুয়ো এনকাউন্টার। সাজানো সঙ্ঘর্ষ। রাজনৈতিক নেতা–পুলিশের সঙ্গে তার আঁতাত ছিল। তাঁদের ছত্রছায়াতেই বিকাশের এত বাড়বাড়ন্ত। কিন্তু ৮ জন পুলিশ খুনের পর ক্ষমতাসীনরা সরে যান বিকাশের পাশ থেকে। বিকাশের ওঠাবসা কাদের সঙ্গে ছিল পাছে সে সব ফাঁস হয়, তার আগেই এনকাউন্টার করে চিরকালের জন্য তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া হল। এর আগে তার পাঁচ সাকরেদকে নিকেশ করেছে পুলিশ। অবসরপ্রাপ্ত এক ডিজিপি বলেন, ‘‌সবটা স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ। রাজনৈতিক নেতা, সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে বিকাশের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে। বিকাশকে বাঁচিয়ে রাখলে বিপদ। কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকে বাঁচাতেই ওকে এনকাউন্টার করে চুপ করিয়ে দেওয়া হল।’‌ যোগীর রাজ্যে এনকাউন্টারের শাসন আরও একবার প্রকট হল, যা নিয়ে বারবার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার সকালের ঘটনা ফিরিয়ে আনল হায়দরাবাদে পশুচিকিৎসক যুবতীর গণধর্ষণে ধৃত চার অভিযুক্তের এনকাউন্টারে মৃত্যুর স্মৃতি। 
গতকাল বিকাশের বউ–ছেলেকে পাকড়াও করেছিল এসটিএফ। বিকাশ–‌হত্যার পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এসএসপি কানপুর দীনেশ কুমার জানান, দুবের অপরাধের সঙ্গে এঁদের কোনও যোগ নেই। গতকাল পর্যন্ত বিকাশের মা সরলা দেবী বলেছিলেন, সরকারের যা ইচ্ছে হয় তা–‌ই যেন করে। এদিন লখনউয়ের বাড়ির বাইরে পা রাখেননি তিনি। আসতে চাননি কানপুরে। বিকাশের দেহ তার বাবার হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেছে পুলিশ।
যে গাড়িটি উল্টে গেছিল, আদৌ সেই গাড়িতেই ছিল না বিকাশ দুবে, সে ছিল অন্য গাড়িতে।  তাহলে গাড়ি ওল্টানো আর বিকাশ দুবের পালানোর চেষ্টা— পুলিশের এই দুটি বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। 

মধ্যপ্রদেশ থেকে বিকাশ দুবেকে আনার পর পুলিশের গাড়ির পিছন আসছিল সংবাদমাধ্যম। কিন্তু ২ কিলোমিটার আগেই হঠাৎ কেন তাঁদের আটকে দেওয়া হয়? প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, তাঁরা কেবল গুলিরই শব্দ শুনেছেন, গাড়ি দুর্ঘটনার কোনও আওয়াজই পাননি।  গুলির শব্দ শুনে ছুটে আসতেই পুলিশ তাঁদের প্রত্যেককে চলে যেতে বলেছিল। পুলিশ দাবি করছে, বিকাশ দুবে পিস্তল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।  কিন্তু যার বিরুদ্ধে খুন–‌সহ ৬০টি মামলা রয়েছে, তাকে হ্যান্ডকাফ না পরিয়েই কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল?  

উল্টে যাওয়া গাড়ি। কানপুরে, শুক্রবার। ছবি: পিটিআই ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top