রাজীব চক্রবর্তী, দিল্লি, ১০ জুলাই

পুলিশ হেফাজতে থাকা উত্তরপ্রদেশের কুখ্যাত অপরাধী বিকাশ দুবের ‘‌রহস্যজনক’‌ মৃত্যু নিয়ে ‌নানা প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা। ধেয়ে আসছে কটাক্ষ, ‘বিকাশের গাড়ি না ওল্টালে যোগী সরকারের গদিই উল্টে যেত।’‌
প্রথম থেকেই কানপুরের এক ডিএসপি–‌‌সহ ৮ পুলিশকর্মী খুনে মূল অভিযুক্ত বিকাশ দুবের সঙ্গে শাসক দল বিজেপি–‌র নেতা, পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দিরে তাকে গ্রেপ্তার করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। গ্রেপ্তারি নাকি পরিকল্পিত আত্মসমর্পণ, তা নিয়ে জলঘোলা হয়েছিল। এখন তাকে কানপুর নিয়ে যাওয়ার পথে পুলিশের সঙ্গে সঙ্ঘর্ষে মৃত্যুর যুক্তি খাড়া করেছে পুলিশ, যা নিয়ে তুমুল শোরগোল শুরু হয়েছে। 
প্রশ্ন উঠেছে, আদৌ কি পুলিশের সঙ্গে সঙ্ঘর্ষ বেধেছিল বিকাশের?‌ নাকি পরিকল্পনামাফিক খতম করে দেওয়া হল তাকে? উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সরকারকে একহাত নিয়েছেন প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। এ ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নীরবতা নিয়ে কটাক্ষ করে টুইটারে লিখেছেন, ‘‌অনেক উত্তর দেওয়ার চেয়ে নীরবতা ভাল। জানি না কত এমন প্রশ্ন তাঁর মর্যাদা রক্ষা করেছে।’‌ কানপুর হত্যাকাণ্ড থেকে বিকাশ দুবের গ্রেপ্তারির মধ্যে কী ঘটেছিল এবং গোপনে কারা তাকে সহযোগিতা করছিল, সেই তথ্য খুঁজে বের করতে সিবিআই তদন্তের দাবি তুলেছেন কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। টুইটারে তাঁর প্রশ্ন, ‌অপরাধী খতম হল, কিন্তু অপরাধীকে যাঁরা নিরাপত্তা দিয়ে আসছিলেন, তাঁদের কী হবে? 
উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদব শুক্রবার টুইট করে পুলিশের দাবি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। যোগী আদিত্যনাথ সরকারকে নিশানা করে তিনি লিখেছেন, ‘আসলে গাড়ি ওল্টায়নি। রহস্য ফাঁস হয়ে গেলে সরকার উল্টে যেত। সেটা অন্তত রুখে দেওয়া গেছে।’‌ এমন কোনও অভিযোগ না তুললেও পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে রাজ্যের আর এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বসপা নেত্রী মায়াবতী বলেছেন, ‘কানপুরের পুলিশ হত্যাকাণ্ড, বিকাশ দুবের গাড়ি উল্টে যাওয়া এবং পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তদন্ত হোক সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে।’ আরএলডি নেতা জয়ন্ত চৌধুরী বলেছেন, ‘‌বিকাশ দুবের এনকাউন্টারের পর দেশের সমস্ত বিচারকের ইস্তফা দেওয়া উচিত। বিজেপি–র এনকাউন্টারের শাসনে আদালত অপ্রয়োজনীয়। আট জুনের পুলিশ খুনের ঘটনার আসল অপরাধীদের আড়াল করতে এনকাউন্টারের এই নাটক।’‌‌
মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রবীণ কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিং টুইট করে বলেছেন, ‘যা আশঙ্কা করছিলাম, তাই হল। কোন কোন নেতার সঙ্গে বিকাশ দুবের যোগসাজশ ছিল, পুলিশ এবং আমলাদের সঙ্গে ওর কী সম্পর্ক ছিল, তা আর সামনে আসবে না। গত ৩–‌৪ দিনে বিকাশ দুবের দুই সঙ্গীরও এনকাউন্টার হয়েছে। কিন্তু, প্রত্যেকের এনকাউন্টারের ধরন এক রকমের। কেন?’ এনকাউন্টার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রও। তাঁর কথায়, ‘বিচার করা আদালতের কাজ। পুলিশের কাজ অভিযুক্তকে আদালতে পৌঁছে দেওয়া। দেখে অবাক হতে হচ্ছে, বিজেপি–‌‌শাসিত ভারতে এই দুইয়ের ভূমিকা সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। যোগীজির এনকাউন্টার রাজে ন্যায়বিচারের মৃত্যু হয়েছে।’ 
বিকাশ দুবে যে কানপুর পৌঁছতে পারবে না, আগে থেকেই অনেকে এমন আশঙ্কা করেছিলেন। শেষমেশ তা–‌ই হল। এদিন এই মন্তব্য করেছেন কংগ্রেস মুখপাত্র রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা। কয়েকটি সঙ্গত প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন তিনি। টুইটারে তিনি লিখেছেন, ‘এনকাউন্টারে মৃত্যু বিকাশ দুবের। এমনটা যে হতে চলেছে, আগে থেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন অনেকে। কিন্তু, কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরা থেকে গিয়েছে। যদি পালাতেই হত, তাহলে বিকাশ উজ্জয়িনীতে ধরা দিল কেন? অপরাধী এমন কী তথ্য জানত, যা প্রকাশ্যে এলে শাসকের মুখোশ খুলে পড়ত?‌ অপরাধীর গত ১০ দিনের কল রেকর্ডস প্রকাশ করা হল না কেন?
বহু প্রাক্তন পুলিশ কর্তাও উত্তরপ্রদেশ পুলিশের এনকাউন্টারের তত্ত্ব মানতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য, পুলিশ মিথ্যা বলছে। তবে, গুছিয়ে মিথ্যা বলতেও শেখেনি তারা। কারণ, ঘটনাস্থল থেকে উঠে এসেছে এমন অনেক তথ্য যা প্রমাণ করছে ভুয়ো এনকাউন্টারেই খতম করা হয়েছে বিকাশকে। এই ঘটনার ‘‌প্রকৃত তথ্য’‌ জানতে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে তদন্তের দাবি তুলেছেন বিরোধীরা। যোগী সরকারের ‘‌এনকাউন্টার রাজ’ নিয়ে সমালোচনার ঢেউ বইছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।‌ প্রশ্ন তুলছেন নেটিজেনরাও।

এনকাউন্টারের পর। হায়দ্রাবাদে। ফাইল ছবি

জনপ্রিয়

Back To Top