আজকাল ওয়েবডেস্ক:‌ শুনশান। ফিসফিস করে কথা। পুলিশের ভারি বুটের শব্দ। যেন অযোধ্যা রাম জন্মভূমি নয়, যেন অযোধ্যা বাবরি মসজিদের নয়, যেন উত্তরপ্রদেশের সরযূ নদীর তীরের এক ঐতিহাসিক শহর নয়, যেন এক ভলক্যানো। আগ্নেয়গিরি। যার মুখ লাল হয়ে এসেছে।। আগুনের হলকা উঠছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছিটকে যাবে আগ্নেয়গিরির মাথা। ছিটকে আসবে আগুন। 
ওদিকে, বিচারপতিরদের কালো গাড়ি যখন ঢুকে আসছে শীর্ষ আদালতের দরজা দিয়ে, তখন সব ক্যামেরা ধেয়ে গেল সেই দিকেই। সকাল সকাল সাংবাদিকদের ভিড়। ঠাট্টা ইয়ার্কি নেই, খেলাচ্ছলে গল্প নেই। কিসের উৎকণ্ঠা?‌ কত বাঘাবাঘা মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে দিল্লির এই কোর্টরুম থেকে। তাহলে আজ কিসের চিন্তা?‌ কেউ জানে না। তবু যেন রক্তচাপ বাড়তে থাকে। 
এলেন পাণ্ডব। সাড়ে দশটায় দরজা খুলে দেওয়া হল। কোর্টরুম থমথমে। বিচারপতিরা এলেই শুরু হল ফিসফাস। চুপ করতে বললেন তাঁরা। প্রথমে শিয়া ওয়াকফ বোর্ডের আবেদন বাতিল করে দিল ডিভিশন বেঞ্চ। ঐক্যমতে পৌঁছেই এই সিদ্ধান্ত। মানে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডেই একমাত্র দাবিদার রইল এই মামলায়। প্রধান বিচারপতি জানিয়ে দেন, নির্মোহী আখাড়ার আবেদন বা স্যুট বাতিল করে দেন বিচারপতিরা। তবে জানিয়ে দেন বিশ্বাসের বিষয়ে কোনও মতামত জানাবে না আদালত। তবে এরপরেই গুরুত্বপূর্ণ একটা মতামত দেন রঞ্জন গগৈ। তিনি বলেন, খালি জমিতে বাবরি মসজিদ তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, ওই জমিতে যে কাঠামো ছিল তা ইসলামিক কাঠামো বা স্থাপত্য নয়। তবে রামজন্মভূমি আইনের বিষয় নয় বলেও মনে করেন বিচারপতি। বিচারপতিরা মনে করেন, কোনও বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে জমির মালিকানা নির্ধারিত হতে পারে না। বিশ্বাস আসলে একটি ইঙ্গিত মাত্র। জমির মালিকানা নির্ধারিত হবে আইন অনুসারেই।  তারপরেই জমির মালিকানা  নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের তরফে জানানো হয়, এককভাবে জমির মালিকানা নিয়ে মুসলিমদের কোনও দাবিই প্রমাণিত হচ্ছে না। তবে এরপরে সুপ্রিম কোর্টের তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়, ওখানে মসজিদ ছিল না বলে হিন্দু তরফে যে দাবি করা হচ্ছে, তার ভিত্তি নেই। সেই দাবিকে বাতিল করে দেওয়া হল। তবে বাইরের অংশ (আউটার কোর্ড ইয়ার্ড) হিন্দুদের নিজস্ব মালিকানা বলে রায় দিয়ে জানিয়ে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। বলা হয়, তিন মাসের মধ্যে একটি ট্রাস্ট তৈরি করতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারকে। তারা জমির বিষয়ে দেখভাল করবে, অযোধ্যা আইন নির্ভর করে। এরপর বড় ঘোষণা করে আদালত বলে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে ৫ একর জমি দিতে হবে। সেখানেই সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড মসজিদ তৈরি করতে পারবে বলেও জানিয়ে দেয় শীর্ষ আদালত। মূল জমির বিতর্কিত  ২.৭৭ একর জমি দেওয়া হবে রামজন্মভূমি ন্যাসকে। বাকি ৬৭ একর জমির কী হবে সেটা পরে নির্ধারিত হবে। এছাড়াও, বাবরি মসজিদ ভাঙা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে আদালত। বলে, এভাবে আইনের বাইরে গিয়ে এমন ভাঙচুর চালানো একেবারে অন্যায় হয়েছে। 
শুক্রবার রাত থেকে পুলিশ, সেনা, বোম্ব ডিস্পোসাল স্কোয়াড, সব ছেয়ে গেল অযোধ্যায়। সকাল সাড় দশটায় বসল এজলাস। দীর্ঘদিনে ঝুলে থাকা মামলার রায় নিয়ে উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ ছিল দেশ জুড়ে। রায় ঘোষণার আগে শুক্রবার প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ তলব করেছিলেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যসচিব রাজেন্দ্র কুমার এবং ডিজি ওম প্রকাশ সিংকে। অযোধ্যা–‌সহ গোটা রাজ্যের নিরাপত্তার আগাম কী বন্দোবস্ত করা হয়েছে জেনে নেন তিনি। রায়ের পরে কোনও উত্তেজক পরিস্থিতি তৈরি হলে তার মোকাবিলায় কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাও জানতে চান তিনি। আগামী ১৭ নভেম্বর প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসর নিচ্ছেন গগৈ। তার আগেই ঐতিহাসিক মামলাটির রায় দিয়ে যেতে চান তিনি। পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে টানা ৪০ দিন শুনানি হয়েছে। গগৈয়ের শেষ কাজের দিন ১৫ নভেম্বর।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার রাতে লখনউয়ে রাজ্যের পুলিশ–প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। প্রায় তিন ঘণ্টার ওই বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, অযোধ্যা রায়–‌পরবর্তী পরিস্থিতির মোকাবিলায় লখনউ ও অযোধ্যায় দুটি হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখতে হবে। এ ছাড়া পুলিশ–প্রশাসনের অভিজ্ঞ আধিকারিকদের গ্রামে গিয়ে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলারও নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনে স্পর্শকাতর এলাকায় রাতে ক্যাম্প করে থাকার কথাও বলেছেন তিনি। সোশ্যাল মিডিয়াতেও কড়া নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই অনুসারে শনিবার সকালেই মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের বাড়িতে চলে যান উত্তরপ্রদেশের মুখ্যসচিব ও পুলিশ প্রধান।

জনপ্রিয়

Back To Top