আজকাল ওয়েবডেস্ক: দেশে চলছে ২১ দিনের লকডাউন। সরকারি হিসেবে এখনও পর্যন্ত মোট ২২ জনের প্রাণ গেছে লকডাউন চলাকালীন, যাঁরা কেউই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাননি। এঁরা সকলেই অভিবাসী শ্রমিক বা তাঁদের পরিবার। বেশিরভাগই আতঙ্কে, মাইলের পর মাইল হেঁটে, বা গাদাগাদি ভিড় বাস বা ট্রাকে চেপে বাড়িতে নিজের মানুষের কাছে ফিরতে চেয়ে মাঝরাস্তায় মারা গেছেন। কেউ মারা গেছেন দুর্ঘটনায় আবার কেউ হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার পর রাস্তা হেঁটে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে। লকডাউন ঘোষণা করার আগে কেন ভাবা হয়নি এই মানুষগুলো এমন পরিস্থিতিতে কী করবেন, তা নিয়েও রয়েছে অভিযোগ।

কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক বিশ্বে গত ৩ মাস আগে থেকেই ছড়াতে শুরু করেছিল। তারপরেও কোটি কোটি মানুষের দেশ এই ভারতবর্ষ, সেখানে বেশিরভাগ মানুষই দারিদ্রসীমার নীচে জীবনযাপন করেন। গত মঙ্গলবার রাত আটটায় দেশের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন লকডাউনের কথা। অসংখ্য মানুষ পেটের তাগিদে ভিন রাজ্যে কাজে যান এ দেশে। তাঁদের কাছে করোনা ঠিক কী, তা জানার অবস্থা নেই। শুধু জানতেন বাড়ি ফিরতেই হবে, তাই যখন দেশের প্রতিটি রাজ্যের সীমা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, বন্ধ রয়েছে পরিবহন, সে সময়ে পায়ে হেঁটেই নিজের মানুষের কাছে ফিরতে চেয়েছেন অনেকেই।

গত বৃহস্পতিবার ভোর তিনটেয় দিল্লি থেকে পায়ে হেঁটে নিজের বাড়িতে মধ্যপ্রদেশে পৌঁছনোর জন্য বেরিয়ে পড়েন রণবীর সিং। ২০০ কিলোমিটার হেঁটে ৩৯ বছরের রণবীরের মৃত্যু হয়। চিকিৎসক যদিও ডেথ সার্টিফিকেটে লিখেছেন হার্ট অ্যাটাক। এই অ্যাটাক কেন হল? তাঁর হার্টের উপর অত্যাধিক চাপ পড়েছিল। বাড়িতে তাঁর তিন সন্তান রয়েছে, স্ত্রী রয়েছেন। দিল্লিতে তিনি একটি খাবারের দোকানে গত তিন বছর ধরে ডেলিভারি বয়ের কাজ করতেন। লকডাউনে দোকানের মালিক সবকিছু বন্ধ করে দেন, সিংও বাড়ি ফিরতে চেয়ে হাঁটতে শুরু করেন। শুক্রবার আগ্রার কাছে তাঁর বুকে ব্যথা শুরু হয়। রাস্তার ধারে একটি দোকানে তাঁকে শুইয়ে দেওয়া হয়, বাড়ির লোককে ফোনও করেন তিনি। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে শুক্রবার সন্ধে সাড়ে ছটা নাগাদ সিং মারা গেছেন।

অন্যদিকে শনিবার ৬২ বছরের গঙ্গারাম ইয়েলেঙ্গের মৃত্যু হয়েছে সুরাটে। তিনি সুরাটের নিউ সিভিল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন, ফেরার পথে সঙ্গে ছিলেন ছেলে নরেশ ইয়েলেঙ্গে। মজুরাগেটের হাসপাতাল থেকে তাঁদের বাড়ি পাণ্ডেশরা প্রায় ৮ কিলেমিটার। সেই রাস্তায় কোনও গাড়ি পাননি তাঁরা। সেখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান বৃদ্ধ। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা স্বাভাবিক মৃত্যু লিখে দেন ডেথ সার্টিফিকেটে। তা নিয়ে অভিযোগও করেছেন নরেশ।

আবার মহারাষ্ট্রের মুম্বইতে চায়ের দোকানে কাজ করতেন তিনজন শ্রমিক, ক্যান্টিনে কাজ করতেন চারজন। তাঁরা পায়ে হেঁটেই ফিরতে চেয়েছিলেন রাজস্থানে, নিজের ভিটেয়। মহারাষ্ট্র এবং গুজরাটের বর্ডারে ভিল্লারে তাঁদের পুলিশ ফিরিয়ে দেন। মহারাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার পথে তাঁদের উপর দিয়ে চলে যায় একটি ট্রাক, মারা যান ৪ জন শ্রমিক। অন্যদিকে ১৮ মাসের একটি শিশু সহ ৮ জন মারা গেছেন একটি পথদুর্ঘটনায়। তাঁরাও হায়দ্রাবাদ থেকে পায়ে হেঁটে ফিরছিলেন কর্ণাটকের রায়চূড়ে।

৩১ জন অভিবাসী শ্রমিক তেলেঙ্গানা থেকে নিজেদের ভিটেয় ফিরতে চেপেছিলেন একটি ট্রাকে। মাঝরাস্তায় আরেকটি আম বোঝাই ট্রাক তাঁদের ট্রাকে ধাক্কা মারলে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিন জন পুরুষ, একটি ছেলে এবং একটি ৯ বছরের মেয়ে। অন্যদিকে বাড়ি ফেরার তাগিদে মঙ্গলবার রাতে তামিলনাড়ুতে রেসিঙ্গাপুরে একটি জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে শুরু করেন ১০ জন অভিবাসী শ্রমিকের একটি দল। সেখানে ৬ জন মহিলা, ৩ জন পুরুষ এবং একটি ছোট্ট শিশুও ছিল। তাঁরা জঙ্গলে পড়ে থাকা পাইপের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে থাকেন, কারণ বড় রাস্তা লকডাউনের জন্য বন্ধ। সে সময়েই সেখানে আগুন ধরে যায়, বাচ্চাটি সহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে গোটা ঘটনায়।

হরিয়ানায় প্রাণ গেছে ৩ জন শ্রমিক সহ দুই শিশুর। তাঁরা পায়ে হেঁটে নিজেদের বাড়িতে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় মারা যান।

দিল্লিতে সরকারি বাসে শ্রমিকদের বাড়ি ফেরানো শুরু হয়েছে। তবে সেখানেও সামাজিক দূরত্বের নিয়ম কানুনের কোনও বালাই নেই। তাই প্রশ্ন উঠেছে সেই ব্যবস্থা নিয়েও। আর বারবার অনেকেই বলছেন যে, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ বিদেশে গেলেন, ফিরে এলেন সংক্রমণের ভাইরাস সঙ্গে করে, তাঁদের জন্য দেশের এই ভোগান্তিতে একের পর এক বলি হচ্ছেন গরিব দিন আনা দিন খাওয়া মানুষেরা।

জনপ্রিয়

Back To Top