তরুণ চক্রবর্তী: অসমের ১৯ লাখ মানুষ রাষ্ট্রহীন। হ্যাঁ, রাষ্ট্রহীন। সরকারি কোনও প্রবচনেই কাজ হবে না। বরং ১৯ সংখ্যাটা বাড়বে। আর এঁরা হারাবেন স্বাধীন দেশের সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার। বলা হচ্ছে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট প্রভৃতি আইনি রক্ষাকবচের কথা। কিন্তু নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই এনআরসি–‌ছুট ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বুঝতে পেরেছেন, এইসব ‘ছেলে–‌ভোলানি’ কথায় কাজ হবে না। তাঁদের ভবিতব্য লেখা শেষ। এনআরসি যন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি সরকারের কর্মীরাই তৈরি করেছেন সর্বনেশে ভাগ্যলিখন। এখন রাজ্যের ১ লাখ ২০ হাজার ‘ডি’ ভোটারের সঙ্গে এঁরাও খোয়াবেন নিজেদের ভোটাধিকার। শুধু সময়ের অপেক্ষা। 
১৯ লাখ মানুষ বুঝে গিয়েছেন, তাঁরা আর পাঁচজন ভারতীয়ের মতো নন। এদেশে তাঁদের বেঁচে থাকার অধিকার প্রশ্নচিহ্নের মুখে। খুব বেশি হলে মিলতে পারে করুণা। শরণার্থীর মর্যাদা। কিন্তু অধিকার নয়। বিশেষ করে অসমে। এনআরসি তালিকা প্রকাশের অনেক আগেই ১ লাখ ২৬ হাজার মানুষ খুইয়েছিলেন নিছক সন্দেহের বশে নিজেদের ভোটাধিকার। তাঁরা এখনও ডি–‌ভোটার। আবার লাখ তিনেক মানুষ নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যস্ত। ট্রাইব্যুনালে চলছে তাঁদের বিচার। সেই লাখ তিনেকের সঙ্গেই যুক্ত হচ্ছে ১৯ লাখ। ট্রাইব্যুনালের বিচারে এনআরসি প্রকাশের আগেই ৬টি বন্দিশালায় প্রায় ১ হাজার মানুষ বন্দি। এঁদের প্রায় সবাই বাঙালি। এবং সেখানেও হিন্দুদের সংখ্যাই বেশি। ঠিক এই ১৯ লাখের মতোই।  
সরকারি অভয়বাণীর অভাব নেই। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। এনআরসি–‌ছুটদের আত্মহত্যা, হৃদরোগে আক্রান্তের ঘটনা বেড়েই চলেছে। কারণ ট্রাইব্যুনাল বা সরকারি প্রতিশ্রুতির প্রতি আর আস্থা নেই। আটের দশক থেকেই বাঙালিরা অসমে রক্ত দিয়ে চলেছেন। বঙ্গাল খেদা–‌র বিভীষিকা এখনও সেখানকার বাঙালিদের মনে গেঁথে রয়েছে। কমার লক্ষণ নেই। বরং অসমের রাজনীতি এখনও ‘বিদেশি’ শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিদেশি মানে এখানে বাঙালি বা বঙালি। অথচ, অসমে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাঙালিদের সংখ্যাই বেশি। বরাক উপত্যকার তিনটি জেলায় প্রায় ৯০ শতাংশই বাঙালি। বাকি ১০ শতাংশ মণিপুরি, বিষ্ণুপ্রিয়া বা অন্যান্য সম্প্রদায়ের। অসমিয়া নেই বললেই চলে। আবার ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতেও বাঙালিদের সংখ্যা বেশ ভাল। বাঙালিদের বাদ দিলে অসমের ৩৩টি জেলার মধ্যে ৯টি জেলায় বোড়োদের দাপট। এছাড়াও আরও অনেক সম্প্রদায় বেশ ভাল সংখ্যায় বহু যুগ ধরে বসবাস করছেন। সেই দিক থেকে বিচার করলে অসমিয়ারাই অসমে সংখ্যালঘু। অসমের খিলঞ্জিয়া বা ভূমিপুত্র বোড়ো, রাভা, কার্বি, ডিমাসা, মণিপুরি বা অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষরা কেউই কোনওকালে নিজেদের অসমিয়া বলে মনে করেন না। দাবি তুলছে অসম ভাগের। অসমিয়াদের মতোই অন্যান্য সম্প্রদায়ও হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। বাঙালিদেরই রক্ত ঝরছে বেশি। রাজনৈতিক দলগুলি ব্যস্ত নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে। 
অসমিয়াদের বড় অংশের আধিপত্যবাদী মনোভাব রাজ্যকে টুকরো টুকরো করার দাবিকেও প্রশ্রয় দিচ্ছে। বোড়োরা বহুদিন ধরে আলাদা রাজ্যের দাবিতে সোচ্চার। কার্বিরা চাইছেন আলাদা কার্বিআংলং। বাঙালিরা অবশ্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাতে তামাক খেতে গিয়ে নিজেদের আলাদা রাজ্যের দাবিটুকুও একজোট হয়ে তুলতে পারেনি। ফলে, বরাক রয়ে গিয়েছে বঞ্চনার শীর্ষে। এনআরসি–‌তে বহু মানুষের নাম বাদ গেলেও টনক নড়েনি বরাকের বাঙালিদের। তাই আন্দোলন নেই। প্রতিবাদ করার চেষ্টাও চোখে পড়ছে না। বাঙালিরাই অসমে সফ্‌ট টার্গেট।
অসমে বহুযুগ ধরে প্রচার ছিল কোটি কোটি ‘বিদেশি’ (মানে বাঙালি। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের) অনুপ্রবেশ করেছে। সেই ‘বিদেশি’দের হাত থেকে মুক্তি পেতে আন্দোলন। রক্ত ঝরল প্রচুর। তারপর অসম চুক্তি। ১৯৭১–‌এর ২৪ মার্চ ভিত্তি বছর স্বীকৃত। শুরু হল এনআরসি। প্রতিটি মানুষকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিয়ে আবেদন করতে হল। শংসাপত্র যাচাই করার পর সেগুলি পাঠানো হল শুদ্ধতা পরীক্ষার জন্য। অর্থাৎ, কেউ ৫০ বছর আগের প্রামাণ্য দলিল জমা দিলে সেগুলি ফের যাচ্ছে শুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য। ৫০ বছর আগের রেকর্ড বহু অফিসেই নেই। ফলে, সমস্যায় নাগরিকত্ব প্রমাণ। পশ্চিমবঙ্গেও এসেছে বহু মানুষের জন্মের শংসাপত্র বা পরীক্ষার ফলাফলের সত্যতা প্রমাণের অনুরোধ।  দেখা গিয়েছে বহু যুগ আগের নথির এখন কোনও অস্তিত্বই নেই। অ–‌অসমিয়া হলেই নাগরিকত্ব প্রমাণে পদে পদে সমস্যা। এত সমস্যা ফেলেও আসু বা বিজেপির ‘কোটি–‌কোটি’ বিদেশি–‌র মধ্যে বার হল মাত্র ১৯ লাখ! বাদ পড়াদের মধ্যে আবার হিন্দু বেশি। রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরাও। আছেন লক্ষাধিক গোর্খাও। পাহাড়ি জনজাতিরাও বাদ যাননি। 
অসমিয়া নেতাদের দাবি মেনে এনআরসি হল। সুপ্রিম কোর্ট নজরদারি করলেও ৫২ হাজার কর্মী ছিলেন অসম সরকারেরই। এই প্রক্রিয়ায় বাদও পড়লেন ১৯ লাখ। তারপরও কেন এত হতাশা ও ক্ষোভ? অসমের প্রতিটি নির্বাচনেই মূল ইস্যু হয়ে ওঠে বিদেশি। বন্যা, অনুন্নয়ন, দুর্নীতি, বেকার সমস্যা থেকে শুরু করে যাবতীয় সমস্যাকে ধামাচাপা দিতে খিলঞ্জিয়া বা ভূমিপুত্রদের আবেগে সুড়সুড়ি দেওয়াটাই দস্তুর। কিন্তু এনআরসি তালিকা প্রকাশ হতেই চুপসে গিয়েছে বিদেশি–‌যন্ত্র। তাই খসড়া তালিকায় ৪০ লাখের বেশি বাদ পড়ার আনন্দে যাঁরা লাড্ডু বিলিয়েছিলেন, তাঁরাই এখন ক্ষোভে ফুঁসছেন। ২০১৪ সালে শিলচরে ভোট প্রচারে এসে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন বিদেশি বন্দিশালা গুঁড়িয়ে দেবেন। কারণ সেখানে হিন্দু বাঙালিরাই ছিলেন বেশি। আর এখন তিনি চুপ। তাঁর দল ও সরকার আরও বেশি করে বিদেশি বন্দিশালা বানাতে ব্যস্ত। ৪০ লাখ নাম বাদ যাওয়ার ‘আনন্দে’ খসড়া তালিকা প্রকাশের পর উৎফুল্ল দেখা গিয়েছিল বিজেপি সভাপতিকে। এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক তাঁর হাতে। কিন্তু কোনও শব্দ নেই তালিকা প্রকাশের ১০০ ঘণ্টা পরেও। 
৪০ লাখ না হোক, ১৯ লাখকে তো থাকতে দিতে হবে! তাই চাই বন্দিশালা। ১ হাজার ট্রাইব্যুনাল হবে। বিচার হবে। অনেকেই সেই বিচারে হাজিরাই দিতে পারবেন না। টাকা নেই। বন্যা তো প্রতি বছরই তাঁদের অনেককেই নিঃস্ব করে। এবার এনআরসি। ভিটে–‌মাটি খুইয়ে নাগরিকত্ব প্রমাণের পরীক্ষা দিতে হয়েছে তাঁদের অনেককেই. যাঁরা তারপরও ফেল করেছেন, তাঁরা এখন কী করবেন? জানেন না। অবিলম্বে ডি–‌ভোটার ঘোষণার দাবি উঠেছে। হবেও। ভোটাধিকারই যদি না থাকে, তবে কে দেবে রেগা! কেইবা দিতে যাবে অন্যান্য সুবিধা! এটা বুঝে গিয়েছেন তাঁরা।
বহু মানুষের সংসার ভাঙছে এনআরসি। একই পরিবারের কারও বাদ পড়েছে বাবার নাম, তো কারও মা। দুই সন্তানের মধ্যে একজন ভারতীয়। অন্যজন বিদেশি। শিশুরাও বাদ যায়নি। নদিয়া জেলারই আপন দুই ভাই ৮–‌এর দশক থেকে অসমের বাসিন্দা। সেখানকার ভোটারও তাঁরা। রয়েছে প্যান থেকে আধার। দুজনেরই সংসার আছে। দেখা গিয়েছে দুই ভাই–‌ই এনআরসি পরীক্ষায় ফেল। কিন্তু তাঁদের স্ত্রী–‌সন্তানরা এনআরসি তালিকাভুক্ত। এমনই হাজারো উদাহরণ রয়েছে অসমে। 
দায় কার? এনআরসি সমন্বয়ক প্রতীক হাজেলাকে এক সময় দেবজ্ঞানে পুজো করাটাই শুধু বাকি রেখেছিলেন শাসক দলের নেতারা। এখন প্রতীকই তাঁদের চোখে মস্তবড় ভিলেন। কারণ এনআরসি–‌র দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটাই তো হয়েছে অসম সরকারের কর্মী ও অফিসারদের হাত দিয়ে। তথ্য যাচাই–‌ও তো হয়েছে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরেই। তাহলে? অসমের মানুষ সব জানেন। এটাই ভাবাচ্ছে রাজনীতির কারবারিদের। বিজেপি নেতাদের কথায়, ১ কোটি বিদেশি রয়েছে অসমে। ধরে নেওয়া যাক ১৯ লাখ বিদেশি প্রমাণিত হয়েছে এনআরসি–‌র ব্যর্থতায়। তাও তো নৈতিক কারণে ইস্তফা দেওয়া উচিত বিজেপি–‌র এমএলএ–‌এমপিদের। কারণ তাঁরা তো এই বিদেশিদের ভোটেই জিতেছেন! কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? রাজনৈতিক দলগুলি ব্যস্ত নিজেদের রাজনীতির অঙ্কে। ওখানে তো নেই কোনও মমতা ব্যানার্জি! বলছেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু রাষ্ট্রখোয়ানো মানুষগুলিও সাহস পাচ্ছেন না প্রশ্ন তোলার, ‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’ নাৎসি বাহিনী, সরি, ভুল হল। কেন্দ্রীয় বাহিনীতে ছয়লাপ গোটা অসম। গুয়াহাটিতে দাঁড়িয়ে অমিত শাহের ঘোষণা, কোনও বিদেশি থাকতে পারবেনা অসমে। যেতে পারবে না অন্য রাজ্যেও। এনআরসি-ছুটদের কী হবে? প্রতিশ্রুতি নেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথায়।  ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top