সংবাদ সংস্থা, দিল্লি, ২৭ মে- গত সপ্তাহেই কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, অন্য রাজ্যে আটকে থাকা শ্রমিকদের ফেরাতে আর সংশ্লিষ্ট রাজ্যের অনুমতি নেওয়া হবে না। রেল মন্ত্রকই ঠিক করবে কোন ট্রেন কোথা থেকে কোন রাজ্যে যাবে। এ নিয়ে মহারাষ্ট্র সরকারের পর কেন্দ্রের সমালোচনায় মুখর হল বাম শাসিত কেরল। রাজ্যকে কিছু না জানিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেন পাঠানোর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দু’দিন আগেই চিঠি লিখেছিলেন কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। মঙ্গলবার রাতে বিজয়ন ছাড়াও মহারাষ্ট্রের সংখ্যালঘু উন্নয়নমন্ত্রী নবাব মালিক রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের বিরুদ্ধে শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেনের সংখ্যা নিয়ে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ আনলেন। মহারাষ্ট্রের জোট সরকারের এনসিপি মন্ত্রী মালিক বলেন, ‘গত দু’দিন ধরে রেলমন্ত্রী রাজনীতি করছেন। তিনি বলেছিলেন, মুম্বইয়ের লোকমান্য তিলক টার্মিনাস থেকে ৪৯টি ট্রেন ছাড়বে। কিন্তু ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার জানিয়েছেন, ১৬টি ট্রেন ছাড়ার কথা। ৪৯টি ট্রেনের যাত্রীরা স্টেশনে পৌঁছন। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ তত সংখ্যক ট্রেন চালানোর জন্য তৈরি ছিল না। রেলমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে রাজনীতি করছেন।’ ওই ডিআরএম অবশ্য টুইট করে জানিয়েছেন, এমন তথ্য তিনি কাউকে দেননি। তঁার বক্তব্য, ‘ভারতীয় রেলওয়ে ট্রেন চালাতে দায়বদ্ধ। দুর্ভোগে পড়া পরিযায়ী শ্রমিকদের সাহায্য করতেও দায়বদ্ধ।’
আসলে রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেনের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেওয়ায় রাজ্যগুলির ওপর দায় চাপাচ্ছিলেন। নবাব মালিক তারই সমালোচনা করেছেন। গোয়েল বলেছিলেন, ১৪৫টির মধ্যে মহারাষ্ট্র থেকে ৮৫টি ট্রেন চলার কথা ছিল। রাজ্য সরকারের ব্যর্থতায় চলেছে মাত্র ২৭টি। তিনি গরিব পরিযায়ী শ্রমিকদের নিজেদের রাজ্যে ফেরাতে মহারাষ্ট্র সরকারকে নতুন করে অনুরোধও জানিয়ে বসেন। এর আগেও ওই রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে রেলমন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছিলেন। রাজ্যগুলির বিরুদ্ধে বারবার দায় চাপানোর প্রবণতারই সমালোচনা করেছেন মালিক। তার আগে মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে রেল মন্ত্রকের বিরুদ্ধে কম সংখ্যক শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেন চালানোর অভিযোগ এনেছিলেন। সব মিলিয়ে শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেনের চলাচল নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যগুলির সঙ্ঘাত বেড়েই চলেছে। এদিকে, কেরলের অর্থমন্ত্রী টমাস আইজ্যাক কেন্দ্রকে ‘সুপার স্প্রেডার’ বলে কটাক্ষ করেছেন। তঁার বক্তব্য, ট্রেন চালাতে রাজ্যগুলির অনুমতি না নেওয়ার কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের কারণেই করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। এই মুহূর্তে কেরলে করোনা সংক্রমিতের সংখ্যা ৮৯৬। গত কয়েকদিনে মহারাষ্ট্র থেকে ৭২ জন, কর্ণাটক থেকে ৩৫ জন এবং তামিলনাড়ু থেকে ফেরা ৭১ জনের শরীরে করোনা পজিটিভ মিলেছে। মঙ্গলবার কেরলে ৬৭ জনের শরীরে কোভিড সংক্রমণ মেলে। তার মধ্যে ২৭ জন বন্দে ভারত মিশনে বিদেশ থেকে ফেরা ভারতীয়। মঙ্গলবার রাতে কেরলের মুখ্যমন্ত্রী তোপ দাগেন রেলমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। রাজ্যকে না জানিয়ে ট্রেন চালানোর কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে করোনা সংক্রমণ রুখতে তঁার রাজ্যের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বলেই অভিযোগ ছিল বিজয়নের।
এ ব্যাপারে কেরল সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, বাইরের রাজ্য বা বিদেশে আটকে থাকা মানুষ ঘরে ফিরবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজ্যকে তো জানতে হবে কত জন, কোথা থেকে ফিরছেন! না হলে তঁাদের যথাযথ স্ক্রিনিং, হোম কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা কী ভাবে করা যাবে? রাজ্য সরকারকে তো সব কিছুর ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। সম্প্রতি মুম্বই এবং তামিলনাড়ু থেকে দুটি শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেন তিরুবনন্তপুরম এবং কোঝিকোড়ে পৌঁছয়। কেরল সরকারের দাবি, এই ট্রেনের ব্যাপারে রাজ্য সরকার কিছুই জানত না। হঠাৎ দেখা গেল ট্রেন চলে এসেছে। ফলে শ্রমিকদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়া ও স্ক্রিনিং নিয়ে অব্যবস্থা তৈরি হয়। কেরল সরকারের দাবি, রাজ্যকে অন্ধকারে রেখে ট্রেন পাঠিয়ে কেন্দ্র সংক্রমণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এমনিতে করোনা সংক্রমণ রোধে কেরল সরকারের ভূমিকা সর্বত্র প্রশংসিত। এমনকী, বিদেশের সংবাদ মাধ্যমেও ফলাও করে ছাপা হয়েছে বিজয়ন সরকারের ভূমিকা। অথচ জানুয়ারি মাসে দেশে প্রথম কোভিড আক্রান্তের হদিশ মিলেছিল দক্ষিণের এই রাজ্যেই। অনেকের মতে, নিপা ভাইরাস ঠেকানোর অভিজ্ঞতা দিয়েই করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করছে ‘ঈশ্বরের আপন দেশ’। মৃত্যুর হারও অন্য রাজ্যের সঙ্গে কোনও তুলনায় আসে না। সেই কেরল এবার সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য সরাসরি কাঠগড়ায় তুলল কেন্দ্রকে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top