আজকাল ওয়েবডেস্ক: আপনি দধীচির কথা জানেন? পুরাণের সেই ঋষি, যিনি বৃত্তাসুরকে পরাস্ত করতে স্বর্গের দেবতাদের কাছে আত্মত্যাগ করেন। তাঁর দেহের হাড় দিয়েই বৃত্তাসুরকে হত্যার অস্ত্র তৈরি করা হয়। এই যে নিজের অঙ্গদান করে অপরের ভালো করা যায়, এইসব পুরাণে পড়েছিলেন দিল্লির মিত্তল পরিবারের লোকজন। তাঁরা তাই মরণোত্তর দেহ দান করার সমস্ত ব্যবস্থা আগে থেকেই করে রাখেন। হ্যাঁ, পরিবারের লোকজন তো তেমনই বলছেন। ৬১ বছরের অনিল মিত্তল আগেই কাগজ পত্র সাজিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর অঙ্গদান করাই ছিল দিল্লির দধীচি দেহদান সমিতিতে। সোমবার দিল্লির ‘এইমস’–এ তাঁর ‘ব্রেন ডেথ’–র পর, পরিবারের লোকজন কিডনি, কর্নিয়া, হার্ট, লিভার, হাড় সবই দান করার প্রক্রিয়া শুরু করতে বলেন ডাক্তারদের। 
দিল্লির ‘এইমস’–এ গত দু’‌দিনে দু’‌জনের মরণোত্তর অঙ্গদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন হল। মিত্তল ছাড়াও ২৬ বছরের শচীনেরও মরোণত্তর অঙ্গদান করা হয়েছে। যদিও এক্ষেত্রে বিষয়টা এতটা স্বতস্ফূর্ত ছিল না। শচীনের বাড়ি উত্তরপ্রদেশে, তিনি দিল্লিতে নির্মানকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি তিনতলা একটি বিল্ডিং থেকে তিনি পড়ে যান। তাঁর চিকিৎসা চলছিল ‘এইমস’–এ। ১৫ই ফেব্রুয়ারি তাঁর ‘ব্রেনডেথ’ হয়। তাঁর পরিবার সহজে বিষয়টা না মানলেও, ডাক্তাররা বিষয়টির গুরুত্ব বোঝাতে সক্ষম হওয়ার পরেই তাঁরও অঙ্গদান করা হয়। 
‘এইমস’–এর অঙ্গ পুনরুদ্ধার এবং সংরক্ষণ সংস্থার প্রধান আরতি বিজ বলছেন, পাঁচ বছর আগেও এমন অঙ্গদানের নজির ছিল এই হাসপাতালে, তবে সে ক্ষেত্রে দুটোই ‘ব্রেনডেথ’ ছিল তা নয়। 
তবে সমীক্ষা বলছে ভারতে এই মরণোত্তর অঙ্গদানের বিষয়টি খুব একটা সুস্থ অবস্থায় নেই। চাহিদা এবং যোগানের মধ্যে অনেকটাই তফাৎ। ভারতে প্রতিবছর কেবলমাত্র ৫ শতাংশ অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয় যা মরণোত্তর দেহদান থেকে আসে। এখানে প্রতিবছর প্রায় আড়াই লক্ষ কিডনি, লিভার এবং হৃৎপিণ্ডের প্রয়োজন। পর্যাপ্ত অঙ্গগুলির অভাবে ৬ থেকে ৭ হাজারের এর বেশি প্রতিস্থাপনই করা হয় না। এ দেশে যে কোনও দিনই দেখা যায় প্রায় ১০ হাজার রোগী থাকেন, যাঁদের অঙ্গের প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তাঁদের পরিবারের লোকেদের সঙ্গে সঠিক রক্তের গ্রুপ বা অনেক কিছুই না মেলায়, বাইরের অঙ্গদাতাদের উপর নির্ভর করতে হয়। সেখানে ‘ব্রেনডেথ’–র পর কেউ অঙ্গদান না করলে সেটা বেশ সমস্যার বিষয়ই হয়। 
দেশের অঙ্গদানের বিপুল চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান দূর করতেই কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৫ সালে জাতীয় অঙ্গ ও টিস্যু ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন রেজিস্ট্রিও চালু করেছে। তবে অনুদানের হার এখনও সেখানে যথেষ্ট কম। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন ইতিমধ্যেই ব্যক্তি,পরিবার এবং সংস্থাগুলিকে কোনও মানুষের মৃত্যুর পরে অঙ্গদানের অঙ্গীকার করার জন্য এবং অঙ্গদানের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি অঙ্গ দান দিবসে (১৪ ফেব্রুয়ারি) বলেছিলেন, ‘‌একজন দাতা ৭–৮ জন রোগীর জীবন বাঁচাতে পারেন এবং ৪০–৫০ রোগীর জীবনমান বাড়াতে পারেন।’‌ এক্ষেত্রেও কিন্তু দু’‌জনের ব্রেনডেথের পর মোট সাত জনের কাছে তাঁদের অঙ্গগুলি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

জনপ্রিয়

Back To Top