Wasim Kapoor: ওয়াসিম এক অপ্রকাশিত কবিতা 

দেবারুণ রায়:‌ তির ফেলে তুলি তুলে ভালবেসে 
মাথায় আকাশ নিয়ে চলে গেলে অন্য ক্যানভাসে!‌’‌ ওয়াসিম নেই এটা জানার পর সান্ত্বনার শেষ পয়গাম উৎসারিত হল এভাবেই।

বন্ধু বিয়োগের ব্যথা বোঝানোর নয়। এবং কবিতার ভাষা সহজবাচ্য বা সহজপাচ্য নয়। কিন্তু দুঃখ যখন নির্বাক তখন কবিতা তার বায়োস্কোপ। 
কলকাতার দিবারাত্রির কাব্য পড়ার সুযোগ যখন হল সেই সময়ের সরণিতে রেখে যাওয়া পর পর পদচিহ্ন শিলালেখ হয়ে আছে। সেই  সময়ের সব পদচিহ্ন স্মৃতিকে মন্থন করে। মন্থনের অমৃত–বিষেই চলমান দিন আর আগামিকালের পথচলা। সেটা সত্তর দশকের শেষ আর আশির শুরু। আশিতে আসিওনা নিয়ে গুলজার হয়ে গিয়েছে ততদিনে। সত্তর দশক রাষ্ট্রজীবনে মুক্তির বদলে বন্ধনের দিন এনেছে। কিন্তু কলকাতার দিবারাত্রির কাব্যকে দিয়েছে হিরণ্ময় অক্ষর। দেখার চোখ, শোনার কান আর সৃষ্টির সম্বল। ছবি, কবিতা, সাহিত্য, সিনেমার সেই সাগরসঙ্গমে আমরা স্নান করে অমরত্ব পেয়েছি। যে অমরত্ব শরীরের নয়। মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের। শব্দ ও বর্ণের। বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তং। আদিত্যবর্ণং তমসো পরাস্তাৎ। এই শব্দগুলোকে চোখে দেখা যায়। ছুঁয়ে দেখা যায় সেই অক্ষরপ্রতিম মানুষকে, যিনি সত্যিই অন্ধকারে আলোর দিশারি। হারায়ে সেই মানুষে, কোথায় পাব তারে। সে কোনও একজন দেব–দ্বিজ–মহানায়ক নয়। সে একটা আলোর সময়। তার আলো, তার সব মন্দ ভাল নিয়ে আমাদের আবাহন বিসর্জন অহংকার অলংকার আবেদন সংবেদনের সংলাপ। এবং সেই সময়ের অবসৃত অপসৃত অধঃপতিতদের দশায় পড়তে হয়নি ওয়াসিম রিয়াজ কাপুরকে। লখনউতে জন্ম, বাবার নাম সালিখ লখনৌয়ি, বাংলা বলতে তেমন পটু নন কিন্তু মনের পটে বাংলামায়ের মুখ। ২নং সুতারকিন স্ট্রিটের দোতলার জানলার ধারঘেঁষা ডিভানে অমলের মত তাঁর জীবনের প্রায় সবটুকু যাপন। 
সম্ভবত কলকাতা তথ্যকেন্দ্রে ক্যালকাটা পেইন্টার্সের একটা বড় প্রদর্শনীতেই ওয়াসিমের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল। নীরদ মজুমদার বা পরিতোষ সেনদের পর তখন বিজন চৌধুরি, প্রকাশ কর্মকার, গণেশ হালুই, সুনীল দাস এবং শুভাপ্রসন্নর মত শিল্পীরা কলকাতার শিল্পজগতের নানা পথের প্রতিনিধি। গণেশ পাইন খুবই অন্তর্মুখী মানুষ। ধরণীর এককোণে রহিব আপনমনে, সেই রকম। কিন্তু তাঁর আলোর ছটায় যখন আমরা উদ্ভাসিত তখন আর কি লুকিয়ে থাকা যায়?‌ মকবুল ফিদা হুসেনকে ভারতের পিকাসো বললে নিশ্চিত কেউ রেগে যাবেন না। দিনকাল ভাল না। ভারতের অহংকার এই খালিপায়ে পথচলা শিল্পী। জীবনের শুরুতে মই বেয়ে লাইটপোস্টে উঠে সিনেমার পোস্টার আঁকা ফিদার জন্যে সারা দুনিয়া যখন ফিদা, তখন উগ্রপন্থী হুমকিতে তিনি আরবেই থাকতে চেয়েছেন। সেই শিল্পী সেবার কলকাতায় এলেন টেনিস তারকা নরেশ কুমারের আমন্ত্রণে। প্রদর্শনী হল টাটা সেন্টারে। ‘‌গীতাঞ্জলি থেকে পথের পাঁচালী’‌ প্রদর্শনীর নাম। সেখানে ওয়াসিমের খুব খাতিরদারি করলেন হুসেন। হুসেনের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন নরেশ কুমার। প্রদর্শনীর ছবি দেখা সেরে বেরতে বেরতে হুসেন সাবকে অনুরোধ করলাম বিশেষ সাক্ষাৎকারের জন্যে। এত সহজিয়া ভাব ছিল হুসেনের যা অকল্পনীয় ওই মাপের পাঁচতারা শিল্পীর ক্ষেত্রে।  মুহূর্তে দাদুর বয়সী মানুষটি ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠলেন। সেছবি অন্য ক্যানভাসে আঁকা। নরেশ কুমারের টাটা সেন্টারের চেম্বারে সাক্ষাৎকারে কত কথা বললেন। জানতে চাইলাম কলকাতার শিল্পীদের সম্পর্কে ওঁর মূল্যায়ন। হুসেন বড়দের মধ্যে একজন আর উঠতিদের মধ্যে একজনের নাম করলেন। প্রথম জন গণেশ পাইন আর দ্বিতীয় ওয়াসিম রিয়াজ কাপুর। বললেন একটি প্রথম সারির ইংরেজি পত্রিকায় সদ্য বেরনো তাঁর মূল্যায়নের কথা। ওই পত্রিকা তাঁর বিচারে ভারতের প্রথম দশজন চিত্রকর কে কে তা জানতে চায়। তিনি সারা ভারতের সেই দশজনের মধ্যেও কলকাতার এই দু’‌জনকে রেখেছেন। কিন্তু মজা হল, পত্রিকায় ওই বিষয়টি ফলাও করে বেরনোর পর কলকাতায় ব্যাপক আলোড়ন উঠলেও গণেশ পাইন আর ওয়াসিম কিন্তু নির্বিকার। বন্ধু হিসেবে আমাকে ওর খুশির কথা জানালেও বলেছিল, হুসেন যদি বলেন তবেই তুমি লিখো। নাহলে না। তার পরই হুসেন দুই পছন্দের চিত্রকরের বাড়িতে গিয়ে দু’‌দিন আড্ডা দিয়ে আসেন। কোনও সংবাদ মাধ্যমের উপস্থিতি ছাড়াই। 

ওই সময়েই ওয়াসিমের বাড়িতে গিয়েছিলাম ওঁর সাক্ষাৎকার ভিত্তিক লেখার জন্য। সেটাই ছিল মিডিয়ায় ওয়াসিমের প্রথম পরিচয়। ওঁর সাক্ষাৎকারের সঙ্গে ছাপা হয়েছিল যতদূর মনে পড়ে ওঁর রিকশা, বোরখা, আলোকস্তম্ভ আর যিশু সিরিজের চারটি ছবি। সালভাদোর দালিকে দেখিনি। কিন্তু ওয়াসিমকে দেখেছি। ওর ছবিতে মানুষ ও মনুষ্যত্বের ঘ্রাণ পেয়েছি। জেনেছি চোখের জলের ভাষা। আর দেখেছি স্বপ্নঘোরে সত্যি পৃথিবীকে কেমন দেখায়। সেই পরাবাস্তবতা বা সুররিয়্যালিজমের তপস্যায় মগ্ন ওয়াসিমের ছবি আঁকার সময় ছিল সারা রাত। সঙ্গী ছিল ফ্লাস্কে রাখা ব্ল্যাক টি। না শিল্পকলা আর মাদকতার মাখামাখিতে অনুপস্থিত ছিলেন ওয়াসিম। ওঁর মাদকের দরকার হত না। রক্তের সেই রঙের মাদকে মুগ্ধ হয়ে অসংখ্য নারীর প্রেমের টান এলেও সেই প্রেম তাঁর বাস্তবতার ফ্রেমে আসেনি। পরাবাস্তব রঙ তুলির টানে মিশেছে। 
বাবার সঙ্গে প্রথম দিনেই পরিচয় করিয়ে দিলেন ওয়াসিম। সালিখ লখনৌয়ি হিন্দি দুনিয়ায় পরিচিত উর্দু কবি। এবং ফয়েজ থেকে শুরু করে স্বদেশী কায়ফি আজমির ঘরানার অনুসারী ছিলেন। কমল বসু যখন কলকাতার মেয়র তখন সালিখ সাব ছিলেন কলকাতা কর্পোরেশনের অল্ডারম্যান। সিপিএমের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল ষাটের দশক থেকেই। জীবনদর্শনে কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রভাব ছিল। বাবার প্রতি ভালবাসায় নিষিক্ত ছিল তাঁর শিল্পীসত্ত্বা। কিন্তু দলীয় রাজনীতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিরাসক্ত ওয়াসিম কিন্তু মোটেই অরাজনৈতিক ছিলেন না। অন্যদিকে বাবা সালিখ সাব সবকিছুতেই ছিলেন পরিমিত। কবিতায় শুধু নয়, জীবনেও সুর আর সুরাকে একসুরে মেলাতেন। ছুতমার্গ ছিল না বলেই ভাবের ঘরে চুরি করাকে ঘৃণ্য মনে করতেন। ওয়াসিমের কথা বলতে বলতে উদ্বেলিত হয়ে উঠতেন। লাগসই একটা লাইন তুলে নিতেন ফয়েজের। এমনই আড্ডার আসরে একদিন ফয়েজের একটি কবিতার অনুবাদে আমাকে সাহায্য করবেন কথা দিলেন। এবং যেই কথা সেই কাজ। উর্দু পড়ে হিন্দিতে তার তর্জমা করছেন সালিখ সাব। আর আমি সেই কথা, ভাব ও ভাষার অনুবাদে কবিতা লিখছি শোনাচ্ছি তাঁকে। পাশে বসে ব্যাপারটা দারুণ উপভোগ করছিলেন ওয়াসিম। কারণ সবটাই ছিল তাঁর উদ্যোগ। এমনই অসংখ্য সান্ধ্য আড্ডার স্মৃতিতে কিন্তু আজও সন্ধ্যা নামেনি। অথচ সেই সময়টা ফেলে এসেছি অন্তত চল্লিশ বছর আগে। একদিন ওয়াসিমকে জিজ্ঞেস করছি, তোমার সব ছবিতেই একটা ভাঙনের চিহ্ন থাকে। এতো পরাবাস্তব ছবির মতো নয়। কোথাও যিশুর মাথায় কাঁটার মুকুটে একটু ফাটল। রিকশার হাতল ভাঙা। বোরখার একটু ছেঁড়া। অথবা বিয়ের জুলুসে হ্যাজাক মাথায় নিয়ে যাচ্ছে যে শিশু তার হ্যাজাক একটু ভাঙা, গায়ের গেঞ্জির একটু ছেঁড়া। এটা শুধু দারিদ্রই নয়। আরও কিছু। আরও কোনও বাড়তি ফোকাস। শুনতে চাই শিল্পীর কাছেই। মলিন মুখে হাসি ফোটাতে চান ওয়াসিম। হাতে হাত রেখে বলেন, তুমি যেটা মনে করবে সেটাই। এতক্ষণ সবটা শুনছেন সালিখ সাব। এবার তাঁর চোখ সজল। সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ওই ভাঙা ছেঁড়া ফাটাই তো আমার ওয়াসিমের আসল চিহ্ন। ওটাই ওর যুদ্ধ। এক চিলতে অসম্পূর্ণতার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মানুষের অবয়বে। যতটা নেই ওর ততটাই ওর তপস্যা। শিল্পীর স্বপ্নের এবং নবজন্মের। কৃতজ্ঞ ওয়াসিম বাবার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল আমার দিকে। ‘‌এবার তুমি পেলে তো তোমার রসদ, যা খুঁজছিলে?‌’‌ 
সেদিন থেকেই ওয়াসিম আমার কাছে এক অপ্রকাশিত কবিতা। যা এই চল্লিশ বছর ধরে হয়ে উঠেছে তিলে তিলে।  ওয়াসিমের চলে যাওয়ার খবরে আর্তনাদের মতোই তাঁর আত্মপ্রকাশ :‌

বুকের ইজেলে রং
( বন্ধু ওয়াসিম কাপুরকে)‌)

প্যারাডাইস পাড়ার বৃত্তে বসে বসে 

রিকশাগুলো উল্কা হয়ে খসে

গেছে জানুয়ারির কলকাতায় এই চব্বিশে!‌

বোরখার দোকান বন্ধ রাস্তার দুপাশে!‌
মাথায় হ্যাজাক নিয়ে সব শিশু

নিরুদ্দেশ মিছিলের শেষে!‌ 
আজকে কি অমাবস্যা?‌ নাকি অনাবাসী পূর্ণিমার শেষে

ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের চার পাশে

রং ছড়াতেই এত তাড়া, অনন্ত আলোর স্বপ্নশেষে?‌ বুকের ইজেলে এত রং শুষে

পছন্দ ধূসর ওই ব্রাশে

যেই হাত ছোঁয়া, ওমনি অনন্ত অঙ্গুলে মিশে

পরবরদিগার হল সে।

অজনবি পায়ের আশে পাশে

ঝরা ফুল ফাটা ফ্রেমে মিশে

গেল দমকা বাতাসে ভেসে এসে।

এমন মানুষ অজানা আবাসে

কোথা যাবে সবশেষে 

এদিকে স্বর্গ আর ওদিকে জন্নতের

জ্বলন্ত বিশ্বাসে!‌ তির ফেলে তুলি তুলে ভালবেসে

মাথায় আকাশ নিয়ে চলে গেলে অন্য ক্যানভাসে?‌

আকর্ষণীয় খবর