যাওয়া তো নয় যাওয়া

গৌতম রায়:‌ একটু বয়স বাড়লে বেশিরভাগ মানুষের ভিতরেই মৃত্যু ঘিরে নানা ভাবনা ঘোরাফেরা করে।

নব্বই উত্তীর্ণ বয়সে প্রস্টেট অপারেশনের আগে অন্নদাশঙ্করও বলেছিলেন, ‘‌গুরুদেবও তো এই প্রস্টেট অপারেশন করার পরই চলে গেলেন।’‌ সুচিত্রা মিত্র। তাঁকে বয়স বাড়া আর বয়স বৃদ্ধি মানে মৃত্যুর দরজায় পৌঁছে যাওয়া- এ নিয়ে একটা দিন ও মাথাব্যথা করতে দেখিনি। বয়স বৃদ্ধিকে তিনি এইভাবে ব্যাখ্যা করতেন; ‘‌জানিস তো যখন এতো বুড়োটুড়ো হইনি, রোজই টইটই করে ঘুরে বেড়াচ্ছি। গান গাইছি। তখন আর বাড়িতে থাকি কতো টুকুন? তখন বুঝিনি এই দশ তলায় থাকার জ্বালা। তখন ভালোটাই ছিল বেশি। কিন্তু এখন যখন আর বেশি বের হই না। বাড়িতেই থাকি। বুঝি দশ তলার টপ ফ্লোরের গরমের জ্বালা। আর এখন যে দিনরাত এসি চালিয়ে রাখব, সে টাকাই বা পাই কোথায়, আর এসির ঠান্ডায় সর্দি বসে আর এক বিদিগিচ্ছিরি কাণ্ড।’‌ 
জীবনটাকে এইভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন তিনি। তাই প্রায় শেষ জীবনে যখন কিছুটা আর্থিক সমস্যায়ও তিনি পড়েছিলেন, খুব ঘনিষ্ঠবৃত্তের বাইরে সেকথা কেউ কখনও জানতেও পারেনি। আর তখনই প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী সুচিত্রা মিত্রের কিছুটা অসহায়তার সুযোগ নিয়ে সেই সময়ের এক ডাকাবুকো মন্ত্রীর পত্নী কার্যত তাঁকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে তাঁর ফ্ল্যাটটা প্রায় জলের দরে কিনে নেন। শর্ত ছিল, আমৃত্যু সুচিত্রা সেই ফ্ল্যাটে বাস করতে পারবেন। সেই মন্ত্রীপত্নী সুচিত্রার 'রবিতীর্থে' র সভানেত্রী পর্যন্ত হয়ে বসেছিলেন। কেবল ভাবতাম, সুচিত্রা যদি আজ আর একটু শারীরিক ভাবে শক্ত থাকতেন, একটু যদি নিজের আর্থিক দিকটা নিজে বুঝতেন, তাঁর ওই অতি সাধের ফ্ল্যাট ঘিরে ওইভাবে ছলনার শিকার তাঁকে হতে হত না।
                         সুচিত্রার প্রখর ব্যক্তিত্বের তাপে যাঁরা ওঁর কাছে দাঁড়াতে পারতেন না, তাঁরা ওঁকে ঘিরে বহু অনৃতবাদন করেছেন। আজ ও করেন।' বাগানবিলাসিনী বোগেনভিলা' ও তাঁকে কেউ কেউ বলে থাকেন। সুচিত্রার ব্যক্তিত্বের গহিনে ডুব দেওয়ার সুযোগ এবং সৌভাগ্য যাঁদের হয়েছে, তাঁরাই জানেন শিল্পী সুচিত্রার পাশে মানুষ সুচিত্রা কেমন ছিলেন। স্বামী ধ্রুব মিত্রের কাছ থেকে চরম অপমানিত হয়েও ধ্রুব সম্পর্কে কেবল একটা কথাই সুচিত্রাকে গোটা জীবন ধরে বলতে শুনেছি, ‘‌ধ্রুবের ধর্মে মতি ছিল না, গীতায় আস্থা ছিল।' কথাটি এতই ব্যক্তিগত, যে এর ব্যাখ্যায় আর গেলাম না। সুচিত্রার ঘনিষ্ঠ বৃত্তের যে দু’‌–চারজন এখনও নশ্বর শরীরে আছেন, তাঁরাই বুঝতে পারবেন, কতোটা অন্তরের হাহাকার থেকে এই কথাগুলি উচ্চারণ করেছিলেন তিনি।
                           ধ্রুব মিত্রের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর একা পুত্র কুণালকে নিয়ে সুচিত্রার সেই লড়াই, আরও আরও প্রভুর কাছে, তাঁর রবীন্দ্রনাথের কাছে আত্মসমর্পণ, রবীন্দ্রনাথকে একটা অন্য আঙ্গিকে, তাঁর মন্ত্রের চিরভাস্বর চিত্তে পরিস্ফুটন হয়। এই সুচিত্রাকে যাঁরা জানেন, তাঁরা এটাও জানেন,  সেই ধ্রুব মিত্র যখন শেষ জীবনে ক্যান্সার আক্রান্ত, আর্থিক সঙ্গতি খুব একটা নেই চিকিৎসার, ধ্রুবের ব্যয়বহুল ক্যান্সার চিকিৎসার যাবতীয় আর্থিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন সুচিত্রাই। নিজের বড়াই করে, নিজেকে মহানুভব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবার মানুষ সুচিত্রা কোনওদিনই ছিলেন না। ফলে সুচিত্রাকে নিয়ে আলটপকা লিখে যাঁরা হঠাৎ করে সুচিত্রা–বিশেষজ্ঞ হতে চেয়েছেন, তাঁদের কলমে রাজেন্দ্রনন্দিনী অধরাই থেকে গিয়েছেন চিরকাল।
                      সুচিত্রার প্রথম রেকর্ড ছিল, 'মরণ রে তুহঁ মম শ্যাম সমান' ।কিন্তু ' মৃত্যু' ঘিরে রবীন্দ্রনাথের 'আমি করিব নীরবে ত্বরণ' — এই মন্ত্রের যেন মূর্ত প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছিলেন তিনি। মৃত্যু ঘিরে তাঁকে একটাই কথা বলতে শুনেছি, ‘‌আমার ডেডবডিতে কখনো সাদা ফুল দিবি না তোরা। রঙিন ফুল দিবি।' সুচিত্রার এই মৃত্যুভাবনার তুলনা বোধহয় একজনেরই সঙ্গে চলে, তিনি নবনীতা দেবসেন। সুচিত্রার গুরু শান্তিদেব ঘোষের বাহ্য চেতনা যখন ক্রমে লুপ্ত হয়ে আসছে, তাঁর অস্পষ্ট দুর্বল কন্ঠ থেকে কেবল একটিমাত্র মন্ত্রই উচ্চারিত হয়েছিল, 'কেন রে এই দুয়ারটুকু পার হতে সংশয়।' আর সুচিত্রা যেন মধ্যাহ্ন ভোজ সারতে ছোট্ট ডাইনিংয়ে বসে, সামনের একফালি বারান্দা দিয়ে কল্লোলিনী কলকাতার আকাশ দেখতে দেখতেই আকাশে মিশে গিয়েছিলেন, কিন্তু মিলিয়ে যাননি।মৃত্যুর একদশক পরেও রবীন্দ্রমন্ত্রের সার্থক পূজারি হিসেবে আজও সমানভাবে উপস্থিত সুচিত্রা। একটা ক্যাসেটের প্রাককথনে খালেদ চৌধুরী বলেছিলেন; সুচিত্রাকে কখনও আমাদের অনুপস্থিত শিল্পী বলে মনে হয়নি। খালেদ চৌধুরীর কথার রেশ ধরেই বলতে হয়; সুচিত্রার মৃত্যুর এত কাল পরেও তাঁকে একটি বারের জন্যেও আমাদের অনুপস্থিত শিল্পী বলে মনে হয় না।
সুচিত্রা কখনও প্রচারস্বর্বস্বতাকে মাধ্যম করে নিজেকে 'উপস্থিত' শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেননি। কিন্তু তাঁর নিবেদনের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যই তাঁকে সবার থেকে আলাদা করেছে। এই 'আলাদা' হওয়ার জন্যে তাঁকে তাঁর সময়ের শিল্পী, পূর্ববর্তী শিল্পী বা মৃত্যুর পরেও পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের অহেতুক আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। যেমন আকাশবাণীর সঙ্গীত শিক্ষার আসর থেকে পঙ্কজকুমার মল্লিকের বিদায় ঘিরে একাংশের মানুষ অভিযোগের তীর তুলেছেন সুচিত্রার দিকে, যেহেতু পঙ্কজবাবুর বিদায়ের পরে সঙ্গীত শিক্ষার আসরের দায়িত্ব সুচিত্রার উপরে পড়েছিল।
 কেউ আমৃত্যু কোনও দায়িত্বে থেকে যেতে পারেন কি না- এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু সুচিত্রা বিদূষকেরা দেননি। কোনও প্রাতিষ্ঠানিক পেশাতেই অবসর থাকবে না— এই তত্ত্বে বিশ্বাস করেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর ও সুচিত্রা বিদূষকেরা কখনো দেননি। এমনকী সুচিত্রা মিত্র যখন একদিন কালের নিয়মে আকাশবাণীর সঙ্গীতশিক্ষার আসর থেকে বিদায় নিলেন, অন্যজন এলেন সেই দায়িত্বে, কই তখন তো কেউ বলেননি, পরের যেজন দায়িত্ব নিলেন, তিনি সরিয়ে দিয়েছিলেন সুচিত্রা মিত্র কে? 
দেবব্রত বিশ্বাস ডাকতেন সুচিত্রাকে 'দিদিমণি' বলে। চারের দশকে, আই পি টি এ এর যুগ থেকে দুইজনের ভিতরে ভালো বন্ধুত্ব ছিল। সুচিত্রা কিন্তু দেবব্রতকে ' জর্জ' বলেই ডাকতেন। ওঁদের ভিতরে সুন্দর বন্ধুত্ব থাকলেও দেবব্রতের অনুজপ্রতিম কলিম শরাফির সঙ্গে সুচিত্রার বন্ধুত্ব ছিল অনেক বেশি দীপ্ত। এই বন্ধুত্বের দৃঢ়তা তৈরিতে সুচিত্রা এবং কলিমের অভিন্ন রাজনৈতিক বোধের ভূমিকা ছিল অনেকখানি। দেবব্রতের সঙ্গেও রাজনৈতিক বোধের সাদৃশ্য সুচিত্রার অবশ্যই ছিল। কিন্তু কলিম শরাফি নানা কারণে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাওয়ার আগে এবং পরে যেভাবে রাজনৈতিক আবর্তে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন, দেবব্রত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বাইরে রাজনৈতিক দুনিয়ার সঙ্গে ততোটা একাত্মতা রাখেননি।
                     দেবব্রত বিশ্বাসের গান রেকর্ডিং বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতির মনোভাব ইত্যাদি ঘিরে যে বিতর্ক রয়েছে  সেই বিতর্কের সারবত্তা যাই থাকুক না কেন, একাংশের রাজনীতির কাছাকাছি মানুষ গোটা ব্যাপারটাকে বাজারজাত করেছেন। আর সেই বাজারিকরণের জেরে কেউ কেউ দেবব্রতের হাঁপানি জর্জর অসুস্থ কন্ঠের গানগুলির বাণিজ্যিকীকরণ করে পয়সা লুটেছেন। এই পর্বে দেবব্রতের তাস খেলার সঙ্গীর রবীন্দ্রসঙ্গীত ট্রেনার স্ত্রী নানাভাবে সুচিত্রা সম্পর্কে কান ভাঙান দেবব্রতের। বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতি সম্পর্কে যে ধারণা দেবব্রতের তৈরি হয়েছিল একটা সময়ে, সেই ধারণা তৈরিতেও সেই মহিলা ট্রেনার এবং তাঁর স্বামীর বিশেষ রকমের ভূমিকা ছিল। দেবব্রতের যে গভীর আস্থা ছিল তাঁর বটুকদা, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র সম্পর্কে, সেই ধারণাতেও চিড় ধরাবার চেষ্টা করেছিলেন সেই দম্পতি।
 দেবব্রতের অসুস্থ অবস্থায় গাওয়া, 'আমার শেষের গানের রেল নিয়ে যে' গানটি বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতির পক্ষ থেকে অনুমোদনের জন্যে আসে সুচিত্রার কাছে।গানটি শুনে সুচিত্রার মনে হয়, অসুস্থ অবস্থায় গাওয়া জর্জের এই গানটির অনুমোদন দেওয়া মানে জর্জকেই অসম্মান, অমর্যাদা করা। সুচিত্রা তাঁর জর্জকে সম্মান করতেন।শ্রদ্ধা করতেন। তাই কারও কারও বাণিজ্যিক স্বার্থরক্ষার উদ্দেশে ওই গানে অনুমোদন দেওয়া সুচিত্রার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই ঘটনাটিই সাতকাহন করে ওই দম্পতি দেবব্রতের কানে তুলে সুচিত্রার সঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাসের একটা দূরত্ব তৈরি করেন। কিন্তু জীবনাবসানের আগে সুচিত্রার সঙ্গে শেষ সাক্ষাতে দেবব্রত বলেছিলেন; ' দিদিমণি, আমি বুঝবার নাইছি, এই সবের পিছনে কারা আছে। '
প্রখর, প্রবল ব্যক্তিত্বের সুচিত্রাকে আমি মাত্র একবারই স্নেহান্ধ হতে দেখেছি। আলো কুন্ডু  শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কিছু রেকর্ডিং নিয়ে চৌর্যবৃত্তি করেছিলেন। কবিপত্নী বিষয়টি ঘিরে প্রশাসনের দ্বারস্থ হন। গ্রেপ্তার হন আলো কুন্ডু। সেই সময়ে আলোকে ছেড়ে দিতে বার বার নগরপাল তুষার তালুকদারকে অনুরোধ করেন সুচিত্রা। একমাত্র সুচিত্রার অনুরোধেই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত কিছু জিনিস আত্মসাৎ করবার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা স্বত্ত্বেও পুলিশ আলো কুন্ডুকে ছেড়ে দিয়েছিল।সুচিত্রা সেই সময়ে খুবই আর্থিক সঙ্কটে ছিলেন। আলোর 'সাউন্ড উইং' সুচিত্রার কিছু ক্যাসেট, লাইভ রেকর্ডিংয়ের প্রকাশ করে শিল্পীকে কিছুটা আর্থিক স্বস্তি দিচ্ছিল। তাই হয়তো এই ভুল কাজটি করতে বাধ্য হয়েছিলেন সুচিত্রা মিত্র।

আকর্ষণীয় খবর