Somendranath: সোমেন্দ্রপ্রয়াণ এক যুগাবসান

কুন্তল রুদ্র 

সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনাবসানে শান্তিনিকেতনে একটি যুগের অবসান বুঝি ঘনিয়ে এল।

সে–‌যুগ সাধনার যুগ। মানুষের আত্মবিকাশের সাধনা, সকল মানবের ঐক্যের সূত্রে নিজের বিচ্ছিন্নতাকে পেরিয়ে যাওয়ার সাধনা। একদা শান্তিনিকেতনে জীবিকার সঙ্কীর্ণ গণ্ডি অতিক্রম করে জীবনের পরিপূর্ণতার লক্ষ্যে চালিত সেই সাধনারই সূচনা করেছিলেন সোমেন্দ্রনাথের গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ। ১৯৫৭ সালে বিশ্বভারতীর বাংলা বিভাগে অধ্যাপক পদে যোগদান থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, প্রায় সাত দশক নিরন্তর সেই সাধনপথেই ধীরনিশ্চিত পদক্ষেপে এগিয়েছিলেন সোমেন্দ্রনাথ। পারিবারিক আলাপ–আলোচনার সূত্রে সেই যে একটি আবছা অবয়ব তাঁর শিশুমনে জেগেছিল, উত্তরকালে বিশ্বভারতীর শিক্ষাভবনে স্নাতকস্তরে শিক্ষালাভ করতে এসে তাঁর মনে স্পষ্ট ছবিটি ধরা দেয়। ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের অগ্নিক্ষরা দিনে ইংরেজ বিতাড়নের লক্ষ্যে উৎপাটিত রেললাইন তাঁকে শান্তিনিকেতনের পথ থেকে ফিরিয়ে দিতে পারেনি। তার ঠিক আগের বছরের বাইশে শ্রাবণ কলকাতার রাজপথে জনসমুদ্রের চূড়ায় ভাসতে দেখা আলোকবিন্দুটিকে ছুঁতে চাওয়ার তীব্র আকুতি তাঁকে ঠেলে এনেছিল শান্তিনিকেতনে। পিতার কর্মসূত্রে করাচি, গোরখপুর, দিল্লির পর কলকাতায় বিদ্যালয় শিক্ষার পর্ব শেষ করে এই মানুষটি শান্তিনিকেতনে স্নাতকস্তরে শিক্ষা নিতে এসে অধ্যাপক হিসাবে পেয়েছিলেন আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়,‌ বিধুশেখর শাস্ত্রী, নন্দলাল বসু,  নিত্যানন্দবিনোদ গোস্বামী, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, রামকিঙ্কর বেজ, শৈলজারঞ্জন মজুমদারের মতো ব্যক্তিত্বকে। সেই সংঘট্টই জ্ঞানপিপাসু মানুষটিকে রসের ধারায় অভিষিক্ত করে তোলে। তাঁর মনের মাটিতে চারিয়ে যেতে থাকে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সঙ্গীত নাটক চিত্রকলা ও দর্শনের সঙ্গে তাঁর জীবনবোধ ও নন্দনচেতনার ঘ্রাণ। 
সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়— গবেষক, অধ্যাপক, লেখক, সমালোচক, বাগ্মী, শিল্পরসবেত্তা। এতগুলি শব্দ দিয়েও তাঁর কতটুকুই বা ধরা যায়! রূপ–‌রস–‌গন্ধ–‌বর্ণে জীবনের যে বিচিত্র প্রকাশ তাকে স্পর্শ করতে চাওয়া এক পিয়াসী মানুষ ছিলেন তিনি, আজীবন। তাঁর সেই চাওয়ারও আশ্চর্য রকমের এক শিল্পিত সুপরিমিত প্রকাশরূপ ছিল। প্রকাশের সেই রূপটিও ছিল ক্রমজায়মান, সে পথ ধরে জীবন তাঁর কাছে ক্রমান্বয়ে শতদলে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছিল। বাংলার বাউল থেকে রবীন্দ্র–‌চিত্রকলা, শিল্পী রামকিঙ্করের জীবন ও তাঁর শিল্পকর্ম, অনুবাদের সূত্রে আচার্য ক্ষিতিমোহন সেনশাস্ত্রীর Hinduism–‌এর ঐতিহাসিক ও দার্শনিক পরিচয়ের বস্তুনিষ্ঠ প্রাঞ্জল উপস্থাপনা, কিংবা জীবনসায়াহ্নে টলটলে স্মৃতিচিত্রে রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজি নেতাজি অবনীন্দ্রনাথ এলমহার্স্ট ক্ষিতিমোহন নজরুল সত্যজিৎ তারাশঙ্কর–‌সহ আরও বেশ কয়েকজন উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের সূত্রে এক বৃহৎ সময়ের সঙ্গে তাঁর লগ্নতার কথা।  
 ‘রবীন্দ্র–‌চিত্রকলা’ বিষয়ক কাজটি তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিলেও ঠিক সেই লক্ষ্যে তিনি সে–কাজে আত্মনিয়োগ করেননি। রবীন্দ্রপ্রতিভার সমগ্রতাকে উপলব্ধি করতে চেয়েই তাঁর চিত্রকলার অনুপুঙ্খ উদ্ঘাটন প্রয়াস। সোমেন্দ্রনাথ নিজে সাহিত্য জগতের অধিবাসী, তাঁদের পরিবারে চিত্রকলা–চর্চার পরিমণ্ডল এবং  শান্তিনিকেতনে তাঁর ছাত্রজীবনে নন্দলাল, বিনোদবিহারী, রামকিঙ্করের সান্নিধ্য এবং সেখানে নিজের সীমিত চিত্রচর্চার অভিজ্ঞতা দিয়েই রবীন্দ্র–‌চিত্রকলার বিষয় ও রূপের চর্চা এবং বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ হত না। রবীন্দ্রনাথের মতো প্রথাভাঙা একজন শিল্পীর কাজের বৈশিষ্ট্য এবং অনন্যতা অনুধাবনের জন্য তাঁকে যেমন কবির আঁকা দুই হাজার ছবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বার বার বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত থেকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়েছে, তেমনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন ধারার শিল্পীদের প্রতিতুলনায় সেই ছবিগুলিকে বিচার করতে হয়েছে, আর তার জন্য তন্নিষ্ঠ সাধনার পথে নিজেকে আপডেট করতে হয়েছে। এইভাবে তাঁর নিজের সামনে উন্মোচিত রবীন্দ্রসৃষ্টির এই রূপ–রেখা–বর্ণের জগৎটিকে তিনি কেবল শিল্পরসিক নয়, সম্পূর্ণ আনাড়ি দর্শকের চোখের সামনেও মেলে ধরেছেন। যে–দেশে জনসমাজে ছবি দেখার চোখ এখনও অর্ধস্ফুট সেখানে চোখ খোলানোর কাজটিও তাঁকে নিরলস নিষ্ঠা ও একাগ্রতায় করে চলতে হয়েছে। সম্পূর্ণ একক প্রয়াসে নিজস্ব একটি স্লাইড প্রোজেক্টর নিয়ে স্কুলে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা কোথাও কোনও সাংস্কৃতিক সংস্থায় সাদা দেওয়ালে প্রতিচিত্র দেখিয়ে এই মানুষটি রবীন্দ্র–চিত্রকলার অনন্যতা সম্পর্কে অদীক্ষিত কৌতূহলী দর্শকমণ্ডলীকে শিক্ষিত করে চলেছিলেন বছরের পর বছর। আর তাঁর সেই প্রয়াসের সূত্রে নতুন করে আলো ছড়াচ্ছিল রবীন্দ্রসৃজনের আঙিনায়, নতুন মাত্রায় ধরা দিচ্ছিলেন রোম্যান্টিক–লিরিক কবিতার স্রষ্টা, তাঁর সৃজনের গহনে আধুনিক জীবনের দহন, বিকার, ক্রূরতা, বিভীষিকা, রিরংসার মূর্তিগুলি ধরা দিয়ে যেন গুহাহিত ভিন্নতর, জটিলতর, বহুস্তরীয় আলো–অন্ধকার–আগুনের উদ্ভাসনে অচেনা এক রবীন্দ্রনাথকে এনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিল চোখের সামনে। 
বিশ্বভারতীর বিদেশি ছাত্র–‌ছাত্রীদের কাছে তিনি ছিলেন শান্তিনিকেতন এবং রবীন্দ্রনাথের দূত। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে কত দেশেই না তাঁর গুণগ্রাহী ছাত্র–‌ছাত্রীদের মনের মণিকোঠায় তাঁর আসনটি অমলিন থাকবে দীর্ঘকাল। রবীন্দ্রনাথকে দেখার সুযোগ তাঁদের হয়নি, সোমেন্দ্রনাথ তাঁদের কাছে বাংলা ভাষা শিক্ষার পাঠক্রমের দিগন্ত ছাড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতনের নির্যাসটি স্থায়ীভাবে পৌঁছে দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সময়ে তাঁর উৎসাহে বিশ্বভারতীতে ভারত–জাপান সাংস্কৃতিক আদান–‌প্রদানের যে ধারাটি সূচিত হয়েছিল বিশ শতকের শেষ পাদে পৌঁছে সোমেন্দ্রনাথের উৎসাহে এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় ‘নিপ্পন ভবন’ প্রতিষ্ঠার সূত্রে (জাপানি ভাষা শিক্ষা বিভাগ) সেটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে এবং তাঁর উদ্যোগের ফলেই জাপানে বিভিন্ন ব্যক্তির সংগ্রহে রক্ষিত রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু চিত্রকলা এবং তাঁর ব্যবহৃত নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী বিশ্বভারতীর সংগ্রহশালায় স্থান করে নেয়।   
 যথাযথ অর্থেই সোমেন্দ্রনাথ ছিলেন রবীন্দ্রশিষ্য। বিশ্বভারতীর সাম্প্রতিক স্খলন ও বিকার তাঁকে গভীরভাবে বেদনাহত করত। কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠার পর বিশ্বভারতীকে আকারে বাড়িয়ে তোলা বা অন্যান্য  বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করা হয় এমন বিভিন্ন গতানুগতিক বিষয়ের পঠনপাঠন বিশ্বভারতীতে চালু না করে প্রথম থেকে সূচিত ভাষা, সাহিত্য, দর্শন, চিত্রকলা, সঙ্গীত এবং গ্রামবিকাশের মৌল ক্ষেত্রে বিশ্বভারতীর শিক্ষা ও গবেষণার অভিমুখ অপরিবর্তিত রাখার প্রাসঙ্গিকতাকে তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন। শান্তিনিকেতনে যে শিক্ষা ও যৌথ আশ্রমিক জীবনধারা রবীন্দ্রনাথ গড়ে তুলেছিলেন, অসীম শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় সোমেন্দ্রনাথ সেই ধারাকে তাঁর জীবনের অঙ্গীভূত করে তুলেছিলেন। ছাত্র–‌ছাত্রীদের প্রতি তাঁর দরদভরা অভিভাবকের দৃষ্টি এবং শিক্ষার সহজ আদান–প্রদানের সঙ্গে এক নান্দনিক সাংস্কৃতিক জীবনচর্যায়, সুভদ্র আন্তরিক ব্যবহার ও রুচিশীলতায় যথার্থেই তিনি নিজেকে আচার্যের উচ্চতায় মহনীয় করে তুলেছিলেন। মিতবাক, শোভনসুন্দর, ঋজু ব্যক্তিত্বের অধিকারী সোমেন্দ্রনাথ সৃষ্টি ও কর্মের যে উজ্জ্বল ও শ্লাঘনীয় ধারাটি দূরদৃষ্টিহীন, ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের বোধহীন স্বার্থপরের পৃথিবীতে রেখে গেলেন, আমরা জানি না কে তাকে বহন করবে!           

লেখক অধ্যাপক। সোমেন্দ্রনাথের ছাত্র।‌‌

আকর্ষণীয় খবর