Ritwik Ghatak : ঋত্বিক ঘটক: বাঙালির চিরবিস্ময়

গৌতম রায়:‌ গত শতকের বাংলা ও বাঙালির আবেগের সব থেকে বড় যে জায়গা, সেই দেশভাগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত বাঙালি প্রজন্ম, প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই এখন প্রায় অস্তাচলে।

তাই দেশভাগকে যে মানুষটা নিজের হৃদয়টাকে বিদীর্ণ হয়ে যাওয়ার মতো যন্ত্রণা হিসেবেই চিরদিন নিয়েছেন, আর সেই নেওয়া থেকেই নিজের সৃষ্টির যাবতীয় ধারাগুলোকে সেই খাতে প্রবাহিত করেছেন, সেই ঋত্বিক ঘটককে ঘিরে বাঙালির আবেগ কি আজও একই রকম আছে? তাঁর জীবনাবসানের পর অতিক্রান্ত হয়েছে কয়েকটি দশক। যে বিভাজিত বাংলা ,যে পাবনা জেলা, যে ভারেঙ্গা গ্রাম, যে নতুন ভারেঙ্গা ,যে রাজশাহীর জন্য ঋত্বিকের বুক ভরা কান্না ছিল, সেই দেশটা এখন আর পাকিস্তানের উপনিবেশ নয় ।স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ ।কাঁটাতারের বেড়াজাল থাকলেও বাঙালিয়ানাকে ধর্মের নিগড় থেকে উন্মুক্ত করে ,সংস্কৃতির ভিত্তিমূলে স্থাপন করে, বাংলাদেশের নাগরিক আজ আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় বাঙালিয়ানার যে বিজয় বৈজন্তী উড়িয়েছে, সেই চিরকালীন বাঙালিয়ানাকেই তো  বুক দিয়ে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন ঋত্বিক।
              আজ তাঁর চলে যাওয়ার এতগুল বছর পর, কেবল দেশ নয়, মানুষের মানুষের প্রতি বিশ্বাসের ভীত যখন ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে যাচ্ছে, তখন বারবার মনে হয় ,অখণ্ড বাঙালি জাতিসত্ত্বার জন্য ঋত্বিকের সমস্ত চেতনা ঘিরে যে অনুরণন ,তাকে আজকের বাঙালি আবার নতুন করে অনুভব করবে না ?একটা রাজনৈতিক তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে ঋত্বিক নিজের শিল্পচেতনার  সমস্ত ঘাত-প্রতিঘাতগুলিকে পরিচালিত করেছিলেন । সেই পরিচালনার মধ্যে অবশ্যই ছিল বামপন্থী মতাদর্শ প্রতি ঋত্বিকের অন্তহীন আস্থার বিষয়টি । দেশভাগ কোনওদিন, কোনও অবস্থায় মেনে নিতে না পারা মানুষটি ,তাঁর মানব প্রেমের প্রাথমিক পাঠ কিন্তু নিয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনার উপর মানবসমাজকে পরিচালিত করার মহামন্ত্রের ভিতর দিয়ে ।
              প্রত্যক্ষভাবে গণনাট্য আন্দোলনের প্রথম দিনগুলিতে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন বামপন্থী ঘরানার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। প্রত্যক্ষ বাম রাজনীতির সঙ্গে সেভাবে যুক্ত না হলে,বামপন্থী ছত্রছায়ায় সাংস্কৃতিক আন্দোলন , তার সঙ্গে জ্ঞান হওয়া ইস্তক ঋত্বিকের ছিল একটা নিবিড় সম্পর্ক । এই নিবিড় সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে সে যুগের বামপন্থীদের ছিন্নমূল মানুষের প্রতি যে ভালোবাসা, যে আবেগ, ছিন্নমূল মাধুষদের  জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে লড়াই, সেগুলি ঋত্বিকের শিল্পীসত্ত্বার সামগ্রিক বোধের বিকাশের ক্ষেত্রে, একটা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল।
                  সমরেশ বসুর শহর নৈহাটিতে আইপিটিএ–র নাটক করতে এসে স্টেজটিকে একেবারে বাস্তবের সঙ্গে মিল করিয়ে দেওয়ার জন্য ,মাঠে চলে গিয়ে ঘাসের চাঙর  এনে মঞ্চসজ্জা করেছিলেন ঋত্বিক। শিল্প সত্তার পারফেকশনের এই যে আন্তরিক প্রয়াস, সেটা যেন কখনও কোথাও এসে তাঁর তৈরি ফিল্মগুলোর মধ্যে একটু এলোমেলো হয়ে যেতে আমরা দেখি। আর তখনই আমরা অগোছালো ঋত্বিক, নন পারফেকশনিস্ট ঋত্বিক— এইসব কথাগুলি নানাভাবে বলতে থাকি । অথচ পারফেকশনিস্ট হওয়ার জন্য ঋত্বিকের যে আন্তরিক প্রয়াস, সেটি ,কেন, কোথায় এসে, একটু যেন থমকে গেল ,তার সুলুক-সন্ধান  আমরা একটি বারের জন্য করেছি ?
           যখন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে চারের দশকের শেষের দিকে একধরনের 'সংস্কৃতিক মৌলবাদ' বামপন্থী নেতা–কর্মীদের উপর পার্টি লাইন হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই লাইনের শিকার হয়ে  ঋত্বিক ঘটকের মতো মানুষ, শিল্পচেতনা সূক্ষ্ম দিকগুলি সম্পর্কে খানিকটা বিরক্তিতে, নিজেকে কিছুটা আলাদা করে নিয়েছিলেন। সেই বিরক্তির জায়গা থেকে ঋত্বিকের মধ্যে একটা এলোমেলোভাব, একটা বোহেমিয়ানিজম  একটু বেশি করে দানা বেঁধে ছিল। আর তখনই কি তাঁকে আরও আরও বেশি করে পানাশক্ত করে তোলার দিকে সেই বামপন্থী পরিমণ্ডলে থাকা অন্য কোনও ফিল্ম মেকার বিশেষ কোনও ভূমিকা পালন করেছিলেন? 
            এইসব প্রশ্নগুলি যাঁরা ঋত্বিকের চেনা বৃত্তের ভেতরে বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে ঘোরাফেরা করলেও ,রহস্যের সদর দরজার তালা খুলে দেওয়ার দায়ে  তাঁরা কখনও মুখ খোলেননি । সেই কারণে আমরা ঋত্বিক আর সত্যজিতের দ্বন্দ্ব-বিরোধ নিয়ে অনেক চায়ের পেয়ালায় তুফান তুলেছি, দিস্তে  দিস্তে  কাগজ-কলম, নিউজপ্রিন্ট খরচ করেছি । কিন্তু মজাদার খুঁনসুটির বাইরেও এই দুই মহান স্রষ্টার ভেতরে কি অসম্ভব প্রীতিপূর্ণ শ্রদ্ধাপূর্ণ একটা সম্পর্ক ছিল ,সেটা যাঁরা এই দু’‌জন মানুষকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন, তাঁরাই জানেন।
              ঋত্বিক হয়তো অতিরিক্ত গেলাস সেবনের পর কখনও কখনও সত্যজিৎকে 'ঢেঙামানিক'  বলে কটূক্তি করে থাকতে পারেন। কিন্তু সেই কটূক্তি ঘিরে ব্যক্তি  সত্যজিতের সঙ্গে সম্পর্ক কিন্তু কোনওদিনও এতটুকু নষ্ট হয়নি তাঁর।অথচ এই দুজনের ভক্তকূল কিন্তু সেই সম্পর্কের রসায়নের  ভেতরে প্রবেশ না করে, নিজেদের  খুশিমতো বিভিন্ন রকমের ব্যাখ্যা তৈরি করে, উভয়ের কাল্পনিক বিরোধের নানারকম রোমহর্ষক ঘটনা শুনিয়েছেন ।আজও শুনিয়ে চলেছেন। কিন্তু শেকড় ছেঁড়া মানুষের আর্তনাদ ঘিরে ঋত্ত্বিক এবং সত্যজিৎ ,উভয়ের যে মর্মস্পর্শী একটা বেদনা ছিল ,সেই বেদনার গহিনে ডুব দেওয়ার চেষ্টা  সেভাবে কখনও হয়নি ।
             নানা প্রতিবন্ধকতা , বিশেষ করে রাজনৈতিক বিশ্বাসের জায়গা থেকে সেই সময়ের অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান ঘিরে নিজের মধ্যেই হওয়া নানা সংশয় ,আর তা থেকে নিজের সঙ্গে নিজের যে বিরোধ ,সেই বিরোধের জায়গায় হয়তো ঋত্বিক আবেগের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রকাশ, সত্যজিতের মতো করতে পারেননি। কখনও কখনও মনে হয়, সেই সব আবেগগুলিকে আরও শৈল্পিক আর ধ্রুপদীয়ানায় সত্যজিতের মতোই উপস্থাপিত করবার দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও,  কেন তাকে সেই ভাবে উপস্থাপিত করলেন না ঋত্বিক ? তার কারণ হিসেবে কিন্তু বারবার বলতে হয়, অগোছালো ,বাউন্ডুলে ঋত্বিক কিন্তু কখনও কারও সঙ্গে আপোস করে তাঁর শৈল্পিক সত্ত্বাকে প্রসারিত করেননি । শাসকের সঙ্গে তো নয়ই । যে মতাদর্শে বিশ্বাস করতেন, সেই মতাদর্শের যারা দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, তাঁদের সঙ্গে তো নয় ফলে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে মতাদর্শের নিরিখে একটা দূরত্ব তৈরি হলেও, কমিউনিস্ট ভাবাদর্শ থেকে কিন্তু ঋত্বিক একটি দিনের জন্য সরে আসেননি। অথচ কমিউনিস্ট পার্টিকে যারা আমলাতান্ত্রিক মানসিকতায়,' সব জানি','  সব বুঝি আমরা'-  এই ভাবনা থেকে পরিচালিত করতে চেষ্টা করেছিলেন ,তাদের সেই মূর্খের স্বর্গে ,ঋত্বিক বারবার আঘাত করতে চেয়েছেন । ভেঙে তছনছ করে দিতে চেয়েছেন ।বিনিময় পেয়েছেন সীমাহীন লাঞ্ছনা । অপমান। অসম্মান। এমনকি চরিত্রহনন পর্যন্ত।
              তবু কিন্তু ঋত্বিক তাঁর ভাবনার জায়গা থেকে একটিবারের জন্য সরে আসেননি ।দেশভাগ ছিল তাঁর কাছে হৃদয়ের অন্তঃস্থলের  একটি ক্ষরণ ।তাই দেশভাগকে কখনওই ঋত্বিক ঘটক ভোট রাজনীতির একটি উপাদান বলে মনে করতেন না । আর সেটা মনে করতেন না বলেই রাজনীতিতে  যাঁরা ক্ষমতা দখলকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে ধরেন ,নিজেদের সমস্ত অভিঘাতকে ভুল পথে পরিচালিত করছিলেন, রাজনীতিতে একটা বিকৃত ভাবে উপস্থাপনের জন্য, তাঁদের কাছে ঋত্বিক কুমার ঘটক কোনওদিনই গ্রহণযোগ্য মানুষ হয়ে ওঠেনি ।
             কারণ ,সত্যিটাকে সত্যি বলতে জানতেন ঋত্বিক ঘটক ।সত্যিকে অসত্য ,অর্ধসত্য - এমন কোনও আবরণ দিয়ে তিনি কখনও প্রকাশ করেননি ।আর মিথ্যাকেও, 'বোধহয় সত্য নয় ' - একথাটাও ঋত্বিক ঘটক কখনও বলতে জানতেন না।  এটা বলতে জানতেন না বলেই তাঁর ব্যক্তি জীবন  নানা সময়ে নানাভাবে তছনছ হয়েছে । সেই ব্যক্তি জীবনের নানা ঘাত অভিঘাত তাঁর জীবনের শেষ পর্বের ছবিগুলোতে আমরা দেখতে পেয়েছি। এমনকি' তিতাস একটি নদীর নাম ' এর ছবিটির ভেতর দিয়ে একটা একাকিত্বের যন্ত্রণা আছে, যেটিকে রোজি সামাদ এক অনবদ্য মূর্ছনায় ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন, তার ভেতরেও যেন আমরা ব্যক্তি ঋত্বিকের শূন্যতা ,আর সেই শূন্যতার মাঝে  শোকসভা বসানোর মর্মস্পর্শী আওয়াজ শুনতে পাই ।
            তিতাস একটি নদীর নাম যখন নন্দনে প্রদর্শিত হচ্ছে ,খবরটা শুনে অন্নদাশংকর গেলেন সেই ছবিটি দেখতে। অন্নদাশংকর কে দেখেই তিতাস এবং সেইসঙ্গে প্রদর্শিত হওয়া ঋত্বিকের একটি অসমাপ্ত ছবি 'বগলার বঙ্গদর্শন ' ঘিরে একটি প্রদর্শনীর উদ্বোধন করতে তাঁকে নিয়ে গেলেন সুরমা ঘটক ।অন্নদাশঙ্কর তিতাস এবং বগলার বঙ্গদর্শন, সমাপ্ত আর অসমাপ্ত দুটি ছবি দেখলেন ।খানিকটা নিজের মনেই আক্ষেপ করলেন;  এমন মানুষের সঠিক মূল্যায়ন আজও ঠিক ঠিক মত হল না ।
           অন্নদাশঙ্করের সেই আক্ষেপ , আজ কুড়ি–পঁচিশ বছর পরেও আমাদের মনে হয়, একেবারে বর্ণে বর্ণে সত্যি। ঋত্ত্বিক ঘটকের যথোচিত মূল্যায়ন  আজও কি হয়েছে? ঋত্বিক ঘটককে আমরা কেবল মাত্র দেশভাগের একজন সার্থক ফিল্ম মেকার,  এই ভাবনার বাইরে তাঁর  শিল্প সত্ত্বার শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি গিরে আমরা অনুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ ,গবেষণা ইত্যাদি করতে সক্ষম হয়েছি ?তিতাসে ঋত্বিক ব্যবহৃত সিলেট অঞ্চলের বিয়ের গান ,'লিলাবালি লিলাবালি ভর যুবতী কইন্যা কি দিয়া সাজাইব তরে' -  এখন একটা জনপ্রিয় লোকসংগীত ।এই গানটির ভেতর সিলেট, কুমিল্লা অঞ্চলের মানুষদের হৃদয় নিংড়ানো যে ব্যথা লুকিয়ে আছে, আর সেই ব্যথার আড়ালে আনন্দের সত্ত্বা  যে কীভাবে রয়েছে, আর জগঝম্প যন্ত্রানুষঙ্গের সঙ্গে যখন এই গানটি আজকালকার শিল্পীরা গান, তখন কেউ আর আমরা সেটা ধরতে পারি? আর ধরতে পারি না বলেই সিলেট শ্রীমঙ্গলের মাটি খুঁড়ে ঋত্বিকের এই গানটি সংগ্রহ করে আনা, এসবও আজকের প্রজন্মের কাছে অজানাই থেকে যায় ঋত্বিককে অজানা থেকে যাওয়ার মতোই।
 

আকর্ষণীয় খবর