কর্ম অন্তে নিভৃত পান্থশালাতে

গৌতম রায়:‌ মেজদা খুব বলতেন ঘটনাটার কথা।

উনি শিশুকন্যা শাঁওলিকে নিয়ে কলকাতা শহরে বাসে করে কোথাও একটা চলেছেন। সঙ্গে আছেন বহুরূপীর মহম্মদ জ্যাকারিয়া। সেকালে যেমন হতো, ভিড় বাসে বসে থাকা একজন শিশুটিকে কোলে বসিয়েছে। হঠাৎ ব্রেক কষেছে বাস। সেকালে বলতো, ‘‌হাওয়া ব্রেক’‌। বাসের ভিতরে ড্রাইভারের পিছনে লেডিস সিটের ঠিক ওপরে লেখাও থাকতো, ‘‌হাওয়া ব্রেক হইতে সাবধান।’‌ তা বাসটা সেই হাওয়া ব্রেক কষার সঙ্গে সঙ্গে শিশুটি প্রায় চিৎকার করে উঠলো, ‘‌আরে রোক্কে রোক্কে কনডাটার, মানুষ খুন করবেন নাকি মওশাই’‌, তাঁর বাবার নাটকের দলের একটা নাটকের সংলাপ। এরপরেই বলে উঠতেন মেয়েটার বাবা, বাসশুদ্দু লোকে বলে উঠলো, কোন বাড়ির প্রোডাক্ট রে বাবা! 
বাবা মায়ের সঙ্গে সেই শিশুটি দার্জিলিং যাচ্ছে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেছে। ট্রেনের জানলার পাশে বসে তারস্বরে মেয়ে বলে চলেছে, ‘‌আজি এ প্রভাতে রবির কর, কেমনে পশিল প্রাণের পর...’‌ । মাঝরাতে মেয়ের রবিবন্দনায় মেয়েটির বাবা মা যারপরনাই বিব্রত।
 এই গল্পগুলো মেয়েটির বাবা খুব পরিচিত বৃত্তে বার বার করতে বেশ ভালবাসতেন। সর্বঅর্থে বাবার মেয়ে শাঁওলি মিত্রের চলে যাওয়ার পর মেয়েকে ঘিরে বাবার সেইসব ভালোলাগা গুলো স্মৃতিকে ঝাপসা করে দিচ্ছে।
 কলিম শরাফি যে শম্ভু মিত্রের রক্তের সম্পর্কের ভাই ছিলেন না, ওই দু’‌জন মানুষকে যাঁরা চিনতেন, জানতেন–তাঁরা এটা বিশ্বাস করেন না। মনের সম্পর্ক কিভাবে রক্তের সম্পর্ককে ছাপিয়ে উঠতে পারে, ওই দুটি পরিবারের ভিতর সম্পর্কের রসায়ন জানেন, তাঁরা সেটা অন্তর থেকে বিশ্বাস করেন। তাই ১১এ নাসিরুদ্দিন রোডের সেই ঐতিহাসিক বাড়িটা ভাড়া নেওয়া হয়েছিল কলিম শরাফির নামে। আর সেই বাড়িতে থাকতেন কলিমের মেজদা শম্ভু মিত্র আর বৌদি তৃপ্তি এবং তাঁদের কন্যা শাঁওলি। শম্ভু বাবু ছিলেন তাঁদের পরিবারে ‘‌মেজো’‌, তাই বাড়ির সকলের ‘‌মেজদা’‌, কলিমেরও, কলিমের আত্মীয় প্রতিম মানুষদেরও। তাই আমি চিরকাল শাঁওলিদির কাছে থেকে গিয়েছি,  ‘‌কলিমকাকার গৌতম’‌। সম্পর্কের এই ধারাবাহিকতা কলিম এবং শাঁওলি দু’‌জনেই বজায় রেখেছিলেন চিরদিন। শম্ভুবাবুর শেষ জীবন, যখন রোগক্লিষ্ট শরীরে তাঁর কিছুই তেমন ভাল লাগে না, তখন বাবাকে ক্যাসেট প্লেয়ারে কলিম শরাফীর গান বাজিয়ে বাজিয়ে শোনাতেন শাঁওলি। শরীরের অস্বস্তিতে আর কারও গলা তখন শুনতে ইচ্ছে না করলেও কলিমের কন্ঠ অসম্ভব তৃপ্তি দিতো শম্ভুবাবুকে। কলিম তাঁর নতুন কিছু ক্যাসেট বেরোলেই সবার আগে পাঠিয়ে দিতেন তাঁর ‘‌মেজদা’‌কে।
 তাঁর মেজদার মৃত্যুর পরে শাঁওলি যখন সুপ্রীতি মুখোপাধ্যায়ের পানিগ্রহণ করেন, তখন কলকাতায় আসার সময় স্নেহের শাঁওলির জন্যে ভারি সুন্দর একটা লাল রঙের ঢাকাই জামদানি এনেছিলেন কলিম–নওশেবা। আর কলিমকাকা কলকাতায় এসেছেন, শাঁওলি দেখা করতে আসেননি, শম্ভুবাবুর মৃত্যুর পরে এমনটা কখনো ঘটেনি। শম্ভুবাবু যতদিন জীবিত ছিলেন, কলিম–নওশেবা কলকাতায় এসেছেন, অথচ জ্যোতিষ রায় রোডে তাঁর ‘‌মেজদা’‌র সঙ্গে দেখা করতে যাননি, এমনটাও কখনো ঘটেনি।
 শাঁওলি নিজে বলতেন, আমি কলিমকাকার কোলে মানুষ। কবি অরুণ মিত্রের পত্নী, গায়ক সবিতাব্রত দত্তের পত্নী শাঁওলির আপন মাসী হলেও কলিম শরাফীর পত্নী নওশেবা খাতুনের সঙ্গেও গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল তাঁর। শাঁওলির বিদায় নওশেবাকে এই নব্বই উত্তীর্ণ বয়সে ক্ষতবিক্ষত করবে। তাই গোপনই রাখা হয়েছে এই ভয়াবহ খবরটি তাঁর কাছ থেকে।
                     ‘‌নাথবতী অনাথবৎ’‌, ‘‌কথা অমৃতসামান’‌ এর পরবর্তী সময়ে শাঁওলি যে নাটকগুলি করেছিলেন, সেগুলির ভিতর, ‘‌বিতত বিতংস’,‌ ‘‌অগ্নিমন্থ’‌ সুপ্রীতি মুখোপাধ্যায়ের নাটক দুটি নিজে বিশেষ আগ্রহ নিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন অন্নদাশঙ্কর। অন্নদাশঙ্কর দেখতে আসবেন, শাঁওলি একদম প্রথম সারির টিকিট রেখে দিয়েছেন। কাউন্টারের ছেলেটি দাম নেবে না। আর টিকিটের দাম না নিলে গ্রুপ থিয়েটার দেখতে ঢুকবেন না অন্নদাশঙ্কর। সে এক মজার অবস্থা। খবর পেয়ে মহলা ঘর থেকে মেক আপ নেওয়া অবস্থাতেই ছুটে এসেছেন শাঁওলি। তিনিও টিকিটের দাম নেবেন না, অন্নদাশঙ্করও টিকিটের দাম না দিয়ে নাটক দেখবেন না। ভারি মজার খুনসুটি। শেষপর্যন্ত অন্নদাশঙ্করের জেদের কাছে হার মানলেন শাঁওলি। 
নাটক দেখে শাঁওলির অনুরোধে মহলা ঘরে ঢুকেই অন্নদাশঙ্করের প্রথম কথা, নাটক দেখার সময়ে তোমার বাবা সব সময়ে শেষ সারিতে বসতে পছন্দ করতেন। নাটক, অভিনয়, বুঝতে তাঁর সুবিধা হতো। তুমি আমাকে প্রথম সারিতে বসিয়েছ!
 অপ্রস্তুত শাঁওলির জবাব, আপনার বয়স আর চোখের কথা ভেবেই–
তোমার বাবার কি চোখের অবস্থা খুব ভাল ছিল? তবে তাঁর ছিল কান। অমন কানে দেখে, চোখের অসুখের ভিতর সব ধরতে পারা, সহজ কথা নয়–নিজের ট্রেড মার্ক, ‘‌হা হা’‌ করে হেসে উঠলেন অন্নদাশঙ্কর।
                   
‘‌ছড়ানো ফাঁদ’‌ ব্যাখ্যা করলেন শাঁওলি। পঞ্চম বৈদিকের সব সদস্যদের সাথে গ্রুপ ছবি তোলা হল। জানি না, সেই ছবি কার কাছে আছে। কারণ, পরে কখনো আর সেই ছবিটা দেখিনি।
                    
জরুরি অবস্থার কালে শিল্পীর স্বাধীনতা ঘিরে কিছু প্রশ্ন অন্নদাশঙ্করের কাছে রেখেছিলেন তৃপ্তি মিত্র। একটি দীর্ঘ চিঠিতে তার জবাব দিয়েছিলেন অন্নদাশঙ্কর। জরুরি অবস্থা ঘিরে শম্ভু–তৃপ্তির মূল্যায়ণের ফারাক ঘিরেও অন্নদাশঙ্করের নিজের অভিমত ছিল সেই চিঠিতে। শিল্পীর স্বাধীনতা ঘিরে আজীবন সোচ্চার অন্নদাশঙ্কর সেই চিঠিতে দ্বর্থহীন ভাষাতেই জরুরি অবস্থার সমালোচনা করেছিলেন। 
চিঠিটার প্রতিলিপি (‌‌অন্নদাশঙ্কর সেই সময়ে টাইপে লিখতেন। ফলে কার্বণকপি থেকে গিয়েছিল) পরবর্তী সময়ে কল্যাণী নাট্যচর্চাকে তাঁদের অনুরোধে দেওয়া হয়েছিল। ওঁরা ওঁদের নাট্যোৎসবের সময়ে প্রতিদিন একটি করে বুলেটিন ছাপতেন। সেই বুলেটিনে ছাপবেন বলে চিঠিটা নিয়েছিলেন। সেটি ছাপা হয়েছিল কি না জানা নেই। মূল চিঠিটিও আর ফেরত পাওয়া যায়নি। ইতিহাসের একটি মূল্যবান দলিল হয়তো হারিয়েই গেছে।
 ‘‌নাথবতী’‌ পর্বে ছত্তিশগড়ের তিজনবাঈ একটা বড় প্রভাব ফেলেছিলেন শাঁওলির উপরে। শম্ভু মিত্রের অনুরোধে তিজন একদম নাড়া বেঁধে শিখিয়েছিলেন শাঁওলিকে। ছত্তিশগড়ের আঙ্গিক আর বাংলার কথকথার আঙ্গিকের যে অপূর্ব সম্মীলন শাঁওলি মিত্র ঘটিয়েছিলেন, বাংলার প্রসেনিয়াম থিয়েটারে, তেমনটা ওঁর আগে কেউ করেননি। বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় পরবর্তী কালে ‘‌শকুনির পাশা’‌তে শাঁওলিকে অন্ধ অনুকরণের একটা ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন মাত্র। ‘‌নাথবতী অনাথবৎ’‌ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বুদ্ধদেব বসু নন, ইরাবতী কার্বে শাঁওলিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। ওই নাটকের সংলাপেও বারবার, ‘‌তাই তো ইরাবতীদিদি’‌ বলেন রয়েছে। ভারতকথার গ্রন্থিমোচনে প্রাচীন বাংলা ও ছত্তিশগড়ের মিশ্রণে বহুত্ববাদী সংস্কৃতির জয়গানের ভিতর দিয়ে, এমন এক একটা উচ্চারণ শাঁওলি করেছিলেন, যে উচ্চারণকে ‘‌রক্তকরবী’‌–র মতো কালোত্তীর্ণ সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা চলে। অন্ধকার যুগে সকলের নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া ঘিরে ‘‌নাথবতী অনাথবৎ’‌ এ শাঁওলি মিত্রের উচ্চারণ, দেশ–কাল–সময়–সমাজ নির্বিশেষে মানুষ যতদিন থাকবে এই পৃথিবীতে, ততদিন সমান সত্য হয়ে থাকবে। আর এখানেই চরম সার্থকতা শিল্পী শাঁওলি মিত্রের।

আকর্ষণীয় খবর