Boris Pasternak: বরিস পাস্তেরনায়েক: এক বিপন্ন বিস্ময়

গৌতম রায়
বরিস পাস্তেরনায়েক–কে ঘিরে আজকের প্রজন্মের আগ্রহ কি আগের প্রজন্মের মতই আছে? নাকি, আজকের প্রজন্ম  পাস্তেরনায়েকের গায়ে, ‘‌বিতর্কিত লেখক’‌ এই তকমাটা দিয়ে, তাঁকে এবং তাঁর সৃষ্টি থেকে একটু মুখ ঘুরিয়ে থাকতে চায়? সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে, গোটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নতুন প্রজন্ম কি পাস্তেরনায়েককে নিয়ে আবার নতুন করে ভাবতে চায়? পড়তে চায়?‌ তাঁকে নিয়ে, তাঁকে ঘিরে যা ঘটেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে, সেই ঘটনাক্রম নিয়ে তারা কি মুক্তবুদ্ধির প্রশ্নে নতুন করে কিছু ভাবছে? নাকি যা ঘটেছিল ঠিক ঘটেছিল, এমনটাই ধরে নিতে চাইছে? যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে পাস্তেরনায়েকের জন্ম, সেই পরিমণ্ডলের সঙ্গে লিও তলস্তয়, রাখমানিনোভ, স্ক্রিয়াবিন, রিলকের মতো মানুষজনের ঘনিষ্ঠ সংযোগ ছিল।

পাস্তেরনায়েকের বাবা ছিলেন সমকালীন রাশিয়ার একজন বিশিষ্ট শিল্পী। তাঁর মা ছিলেন একজন অত্যন্ত বিখ্যাত পিয়ানো বাদক। 
            বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র যখন পাস্তেরনায়েক, তখন থেকেই তাঁর ইচ্ছে ছিল কবি হয়ে ওঠার। পাস্তেরনায়েকের গদ্য ঘিরে আমাদের সামান্য কিছু ধারনা থাকলেও, তাঁর কবিতা ঘিরে ভাবনা–চিন্তার পরিসর সেভাবে প্রসারিত হয়নি। ১৮৯০ সালের ১০ ই ফেব্রুয়ারি পাস্তেরনায়েকের জন্ম। বিপ্লব পূর্ব রাশিয়ার নানা টালমাটালের ভেতর দিয়ে পাস্তেরনায়েকের শৈশব–কৈশোর কেটেছিল। ইউরোপ জুড়ে যে সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে তখন, সেই সঙ্কটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জার সাম্রাজ্য, নিজেদের ক্ষমতা অটুট রাখার জন্য এক ধরনের চেষ্টা করছে। যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাবাহিনী ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে রাশিয়ান সেনাবাহিনী, কিন্তু শাসকের আছে কোণঠাসা হয়ে পড়ার নিরিখে তাদের দেশের সামাজিক জীবনের কোনো পরিবর্তন আনতে তখন রাজি নন সেনা বা জার। গোটা দেশজুড়ে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অসন্তোষ। সেই অসন্তোষের জেরে ১৯১৭ সালের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রাশিয়া। ১৭ র ফেব্রুয়ারির  বিপ্লব, যার জেরে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে জার সাম্রাজ্য, আজকের দিনে বহু মানুষ সেই প্রথম পর্বের বিপ্লবকে ঘিরেও নতুন করে ভাবনা চিন্তা করছেন। এমন কথাও শোনা যাচ্ছে যে ,প্রকৃতপক্ষে শ্রমিক মেহনতি জনতার হাতে ক্ষমতা যাতে না চলে যায়, সেই কারণেই সেই বিপ্লবকে সংগঠিত করা হয়েছিল।
                    এই ধরনের তত্ত্বের বাস্তবতা আছে কিনা, তা রাজনৈতিক এবং দলগত আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে, ইতিহাসের ছাত্র, গবেষক, শিক্ষকেরা নতুন করে ভাবছেন। সে ভাবনাগুলো অচিরেই আগামী প্রজন্মের সামনে উঠে আসবে। প্রথম পর্বের বিপ্লব শেষ হওয়ার পর, ১৯১৭ র অক্টোবরে যে সফল বিপ্লব, তা রাশিয়ার আর্থ–সামাজিক– রাজনৈতিক–সংস্কৃতিক জীবনে সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করে গোটা দুনিয়ার কাছে এক নতুন বার্তা নিয়ে আসে। এই সময়কালে কিন্তু বহু কবিতা লিখেছিলেন পাস্তেরনায়েক। 
              এই কবিতাগুলি পরবর্তীকালে সংকলিত হয়, ‘‌জীবন আমার বোন’‌ এই নামে শিরোনামে, সেই নামেই পাস্তেরনায়েকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সেই কাব্যগ্রন্থে আমরা যেভাবে রূপকের ব্যবহার দেখি, সেই রূপকের ব্যবহারের ভেতর দিয়ে পাস্তেরনায়েকের শৈল্পিক চেতনার একটা অন্য দিক উঠে আসে। সেই সময়ের কবিতার মধ্যে সেই চমকগুলোকে পাস্তেরনায়েকের জীবনের প্রেম, বিপ্লবের চোখ ধাঁধানো অভিজ্ঞতার প্রকাশ, সেই হিসেবে অনেকে দেখে থাকবেন। 
          যে সময় কালে এই প্রথম কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো পাস্তেরনায়েক রচনা করেন, সেই সময় তার জীবনে নানা ধরনের সংকট ঘনীভূত হয়েছিল। একটা দুর্যোগপূর্ণ কাল রাশিয়ার জীবনেও সেই সময় কালে নেমে এসেছিল–একথা বললে মনে হয় না অত্যুক্তি হবে। পছন্দ–অপছন্দের দ্বন্দ্বটা কেমন যেন একটা মোটাদাগে বিভক্ত হয়ে, রাশিয়ার গোটা সামাজিক ব্যবস্থাটাকে দুটি শিবিরে অদ্ভুতভাবে বিভক্ত করে দিয়েছিল। সেই বিভাজনটা আজকের যেভাবে সাম্প্রদায়িকতা নিরিখে, জাতপাতের নিরিখে সামাজিক বিভাজন, তেমনি হয়েছিল। আর সেই পছন্দ–অপছন্দের জেরে তখন কিন্তু গোটা রাশিয়াজুড়ে কবি–শিল্পী–সাহিত্যিকদের একটা বড় অংশ বাধ্য হয়েছিল দেশত্যাগ করতে ।
          পাস্তেরনায়েক পালিয়ে বাঁচতে শেখেননি। তাই রাশিয়াতে থেকেই, সেই পরিমণ্ডলের মধ্যেই তিনি তাঁর নিজের সাধনাকে প্রসারিত করতে চাইছিলেন। এই সময়কার একটা বড় অংশজুড়ে তিনি থেকেছেন মস্কোতে। আবার শহরতলীর পেরেদেলকিনো নামক একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও তাঁর জীবনের অনেকটা সময় তখন কেটেছিল। এই সময়কালের যে ছবি, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সেই টানাপোড়েনের ভিতরে তিনি রাজনীতির পরিমণ্ডলের প্রত্যক্ষ আবহাওয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজেকে সরিয়ে রাখতে চাইলেও, রাজনীতির পরিমণ্ডল, রাজনীতির আবহাওয়া তাঁকে কিন্তু দূরে সরে থাকতে দেয়নি। রাজনীতি কেমন যেন একটা তাঁকে তাড়া করে বেরিয়েছিল। 
                রাজনীতির যেন একটা উদগ্র বাসনা কবি পাস্তেরনায়েককে তাঁর বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলতে চেয়েছিল। সেই সময়ে কিন্তু রাজনীতি তাঁর সম্পর্কে যতই চেষ্টা করুক না কেন, পাস্তেরনায়েক নিজে কিন্তু ছিলেন নির্লিপ্ত। ১৯৩৪ সালে ওসিপ মান্দেলেশ্তাম কিছু কবিতা লেখেন। কবিতাগুলি ছিল স্তালিনের প্রতি ব্যঙ্গার্তক। সেই কবিতাগুলি তিনি তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ একদল মানুষকে শুনিয়েছিলেন। সেই ঘনিষ্ঠ বৃত্তের ভিতর পাস্তেরনায়েকও ছিলেন। কবিতা শোনার পর কবিতাটি সম্পর্কে নান্দনিক গুণাবলী আলোচনার পর, কবি মান্দেলেশ্তামকে সতর্ক করে দিয়ে পাস্তেরনায়েক বলেছিলেন, দেওয়ালেরও কান আছে। এইসব কবিতা পড়ার সময় দেয়াল তার কান দিয়ে শুনে, দেয়ালের বাইরে সেগুলিকে বের করে দিতে পারে। তাই ওসিপ মান্দেলেশ্তামের উচিত এই ধরনের কবিতাগুলি বন্ধুমহলে পরবার সময় আরো অনেক ,অনেক বেশি সতর্ক হওয়া।
             এই ঘটনাক্রমের অল্প কিছুদিন পরেই সেকা নামক এক পরিচিত গোয়েন্দা পুলিশ তুলে নিয়ে যায় মান্দেলেশ্তামকে। পরিচিত বৃত্তের মধ্যে বহু পাস্তেরনায়েক বহু চেষ্টা চরিত্র করেন মান্দেলেশ্তামকে পুলিশের বৃত্ত থেকে ছাড়িয়ে আনবার। তিনি যে মান্দেলেশ্তামকে গ্রেপ্তার করার বিরুদ্ধে তাঁর মুক্তির জন্য সচেষ্ট–এই খবরটি পৌঁছে যায় স্তালিনের কাছে।
              স্তালিন সরাসরি ফোন করেন পাস্তেরনায়েকের কাছে। মান্দেশেশ্তামের কবি হিসেবে গুণগতমান কতখানি, উচ্চ মানের কবি নাকি তিনি, পাস্তেরনায়েকের কাছে জানতে চান স্তালিন। সরাসরি স্তালিনের প্রশ্নের উত্তর দেন না পাস্তেরনায়েক। চেষ্টা করেন মান্দেলেশ্তামকে ঘিরে কি ধরনের ভাবনা ভাবছেন স্তালিন, তা বোঝবার চেষ্টা করেন পাস্তেরনায়েক। স্তালিন তাঁর পরিচিত মহলে এমনই মন্তব্য করেছিলেন যে, একজন কমরেডকে সমর্থন করে যাওয়ার মতো সৎ সাহস পাস্তেরনায়েকের নেই। 
               এই সময়কালে পাস্তেরনায়েককে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রিক কর্তৃপক্ষের কার্যত আদেশে বেশ কিছু রাজনৈতিক বিবৃতিতে সই করতে হয়েছিল। কিন্তু গত শতাব্দীর তিনের দশকের মাঝামাঝি সময়ে, মার্শাল তুখাচেভস্কি সহ সামরিক বাহিনীর কয়েকজন উচ্চপদস্থ জেনারেলকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে অভিযুক্ত করেছিল স্তালিন প্রশাসন। সেই কারণে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড চেয়ে বুদ্ধিজীবিদের কাছ থেকে একটি আবেদন পত্র তৈরি কার্যক্রম করেছিল সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ। সেই আবেদনপত্রটি পাস্তেরনায়েকের কাছে নিয়ে আসা হয়েছিল সেটি তে স্বাক্ষর করার জন্য। পাস্তেরনায়েক সরাসরি অস্বীকার করেছিলেন সেই মৃত্যুর দাবিকে সমর্থন করে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে।
             কিন্তু সেই বিবৃতিতি যখন সোভিয়েট কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করলেন তখন দেখা গেল যে পাস্তেরনায়েক নিষেধ করা সত্ত্বেও, সেই বিবৃতিতে তাঁর নামটি থেকে গেছে। এই ঘটনা অসম্ভব ক্ষুব্ধ করে তোলে পাস্তেরনায়েককে। তিনি সরাসরি স্তালিনকে একটি চিঠি লিখে বলেন, আমার শৈশবটা তৈরি হয়েছে লিও টলস্তয়ের বৃহত্তর শিক্ষার প্রভাবে। তাঁর প্রভাবই আমার জীবনে অত্যন্ত বেশি। সেই কারণেই জীবন আর মৃত্যুর বিচারক হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। 
          এখানে মনে রাখা দরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডের কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি বিরোধিতা করা সত্ত্বেও তখনও কিন্তু পাস্তেরনায়েক, স্ট্যালিনের প্রত্যক্ষ বিরাগভাজন হয়ে ওঠেননি। কেন হয়ে ওঠেন এ নিয়ে অনেক ধরনের তর্ক আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবীদের মহলে আছে।    
                কিন্তু সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ যখন পাস্তেরনায়েককে নিয়ে কি করা উচিত, সেই প্রশ্ন উপস্থাপিত করে সরাসরি স্তালিনের কাছে, স্তালিন নাকি উত্তর দিয়েছিলেন, এই মেঘে বসবাসকারীদের আমরা স্পর্শ করি না। আদৌ এই কথা স্তালিন বলেছিলেন কিনা, এ সম্পর্কে পরস্পর বিরোধী কিছু মতবাদ রয়েছে। তবে একথা খুব পরিষ্কারভাবে বলতে হয় যে, পরবর্তীকালে ডাক্তার জিভাগো ঘিরে যে ধরনের বিতর্ক, তা থেকে এটা পরিষ্কার যে, স্তালিন কখনো কোনো অবস্থাতেই পাস্তেরনায়েককে পছন্দ করতেন না ।
               অনেকেরই হয়তো জানা নেই রবীন্দ্রনাথের একান্ত সচিব কবি অমিয় চক্রবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নের সেই বজ্র আঁটুনি ভেতর থেকে অত্যন্ত কৌশলে পাস্তেরনায়েকের কাছ থেকে ডক্টর পাণ্ডুলিপিটি বহির্বিশ্বে না নিয়ে এলে জিভাগো হয়তো দিনের আলোর মুখ দেখতে পেত না। গদ্য এবং কবিতার পাশাপাশি কিন্তু অনবদ্য একজন  অনুবাদক ছিলেন তিনি। শেক্সপিয়ারের রচনাবলীর যে রাশিয়ান ভাষায় অনুবাদ তিনি করেছিলেন, তা আজও রাশিয়ানদের কাছে এক পরম সম্পদ। শেক্সপিয়ার ছাড়াও পড়লেন মারিয়া রিলকে, শিলার প্রমূখ কবিদের কবিতায় তিনি রাশিয়ান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। 
              ১৯৫৮ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন পাস্তেরনায়েক। নোবেল কমিটি পাস্তেরনায়কের নাম পুরস্কার প্রাপক হিসেবে ঘোষণা করার পর, সোভিয়েত ইউনিয়নে আরো বেশি চাপের মধ্যে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি পাস্তেরনায়েকের জীবনে হয়ে উঠেছিল এক ভয়ঙ্কর বিব্রতকর ঘটনা। তিনি ছিলেন বুদ্ধির মুক্তিতে বিশ্বাসী মানুষ। তাই এই সাহিত্যিককে কখনো কোনো অবস্থাতে পছন্দ করতেন না সোভিয়েট কর্তৃপক্ষ। আবার সোভিয়েট কর্তৃপক্ষের সাথে ভিন্নমত পোষণ করতেন, এমন অনেক মানুষ ও কিন্তু  পাস্তেরনায়েকের মত মানুষকে পছন্দ করতেন না।
               এখানে আমাদের মনে রাখা দরকার যে, আটের দশকের শেষ দিকে সোভিয়েট ইউনিয়নের পতনের আগেই, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরে সেখানকার বজ্র আঁটুনির সরকারি নিয়ম কানুনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, চিন্তা–চেতনার উন্মুক্ত ভাবধারা প্রকাশের জন্য কি ধরনের বাসনা জাগ্রত হয়েছিল, তা বুঝতে পারা যায় পাস্তেরনায়েককে ঘিরে তৈরি হওয়া আবেগকে কেন্দ্র করে। ১৯৬০ সালে পাস্তেরনায়েকের জীবনাবসান ঘটে।


 

আকর্ষণীয় খবর