বাজেট: বিজেপির হাতে অমৃত কলস, রাজ্য, গরিব, কৃষকের জন্য চরণামৃত 

দেবারুণ রায়: বছর চারেক আগেকার কথা।

উত্তর ভারতের কোনও একটি জনসভায় বক্তৃতা করছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। যতদূর মনে পড়ে যোধপুরি সাফা বা হরিয়ানভি পাগড়ির গ্ল্যামারে  ঝকঝকে মাননীয় নরেন্দ্রভাইকে দুর্দান্ত দানসাগর দেখানো শোনানোর ব্যবস্থা করেছে ভাজপা। উনিশের চুনাও দুয়ারে দস্তক রেখেছে। তাবৎ বিরোধী দলের হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে দিনরাত। অচ্ছে দিনের কী হল? ৪৫ শতাংশ বেকারি বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। ভারত কি তবে বিজেপির হাতে বেকারিতেই বিশ্বগুরু হবে? স্বপনোঁ কা সওদাগর কী বলেন? বলছে কংগ্রেস থেকে শুরু করে এনডিএর দলছুট শরিকরাও। এদিকে বাংলার মমতার হুঙ্কার, ‘উনিশে ফিনিশ।’ বিজেপি সরকারের যেন দিন কাটে না, রাত কাটে না, স্মৃতিগুলো কিছুতেই পিছু হঠে না...। এই অবস্থায় মোদি ফের সঞ্জীবনি বুটি দিলেন। বিজেপির সরকার ফেরানোর উদ্যোগ নিলেন কার্যত চতুর্মুখী। তাঁর বিশেষত্ব এটাই। খারাপ পিচেই মারমুখী ব্যাটিং করেন। তাতে ম্যাচ তো বাঁচেই। উল্টে রান হয় অনেক বেশি। সেজন্য তিনি আজও রক্ষণাত্মক খেলায় নেই বললেই চলে। 
বিজেপির পদ্ম পেডেস্টাল থেকে তিনি বললেন, স্বাধীনতার ৭৫তম জয়ন্তী ২০২২এ। ‘হাতে সময় আছে আরও চার বছর। আপনাদের আমি কথা দিচ্ছি। স্বাধীনতার ৭৫ বছরের মধ্যে ভারতে এমন একজন লোকও থাকবে না যার নিজের ‘ঘর’ অর্থাৎ নিজস্ব মালিকানার বাড়ি হয়নি। মানে, আসমুদ্রহিমাচল সমস্ত লোকের নিজের বাড়ি হবে চার বছরের মধ্যেই। একথা আমি মনে মনে সংকল্প করে নিয়েছি। চার বছরের মধ্যেই সব নাগরিকের বাড়ি হবে।’ অন্য পরিস্থিতির নির্মাণে  উনিশের নির্বাচনে মোদি অপরাজেয় থাকেন এবং তাঁরই রকমারি সোনালি স্বপ্নকে ফিরি ও  বৈতরণী পারের কড়ি করে বিজেপি একটানা দ্বিতীয় দফায় কেন্দ্রে সরকার গড়ে। এবং রাজ্যগুলির সিংহভাগই দখল করে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি আজও পূর্ণতা থেকে অনেক দূরে। উত্তরপ্রদেশ সহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটের মুখে চার বছর আগের সেই বক্তৃতার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এবং প্রতিশ্রুতিতে বিজেপির নেতা হিসেবে তাঁর স্বপ্নবিক্রির ফিরিস্তি মনে রেখে এবার প্রচণ্ড সতর্ক তিনি। বিশেষ করে উত্তর ভারতের কিছু প্রভাবশালী রাজ্যে বিধানসভার আসন্ন নির্বাচনের কথা ভেবে প্রতিশ্রুতির পুরনো উজানে তিনি নেই। আছেন ধর্মের নামে, প্রাচীন সংস্কৃতির পুনরুত্থানের নামে এক অলীক উড়ানের স্বপ্ন নিয়ে খেলায়। তাই আম ভারতের গরিবগুর্বোকে তাঁর অর্থমন্ত্রী নির্মলা শুনিয়েছেন ‘অমৃত কাল’-এর কল্পলোকের গল্প। কিন্তু মোটেও কল্পতরু হননি তিনি। সাবধানি শকটে তাঁর দেড় ঘণ্টার বাজেট বয়ানের সফর সুরহীন তালহীন শূন্য দিনের টার্মিনাসে গিয়ে শেষ হয়েছে। কারণ, এই পাঁচ রাজ্যের মধ্যে চার রাজ্যের ফলাফল থেকেই চব্বিশের লোকসভা ভোটের হাওয়া উঠবে। বিধানসভার ভোটে দেওয়া অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ভূত চব্বিশের ভোটে নাজেহাল করুক তা কে চায়। তাই, নির্মলাভাষ হল আগামী পঁচিশ বছরের প্ল্যান প্রোগ্রাম নিয়ে। যা পুরোটাই আরএসএসের অব্যক্ত অ্যাজেন্ডা। এহেন ‘অমৃত কাল’-এর কর্ণধাররা, অর্থাৎ ‘অমৃতের পুত্ররা’ সবেতেই অমৃতবর্ষণ করছেন। আজাদির অমৃত মহোৎসব থেকে বাংলার নেতাজি ট্যাবলো বাদ দিয়ে, ইন্ডিয়া গেটে ইন্দিরার আমলে গড়া ভারতের শৌর্য আর পরাক্রমের প্রতীক শহিদ অমর জওয়ান জ্যোতি নিভিয়ে তাকে ওয়ার মেমোরিয়ালের জ্যোতিতে মিশিয়ে ইতিহাসে পাতিহাঁস মানে হিন্দুত্বের জল মিশিয়ে  দিয়ে, পঞ্চম জর্জের ক্যানোপিতে নেতাজিকে হলোগ্রামে এনে, ঝড়ে সেই হলোগ্রাম হেলে দুলে ফেলে ফের ফিরিয়ে, গান্ধীজির পছন্দের ক্রিশ্চান সুরধুনি বিটিং রিট্রিটের কুচকাওয়াজ থেকে সরিয়ে দিয়ে এক সমান্তরাল মতধারার ধারাপাতে কঠিন শীতে ভিজল দেশ। প্রশ্ন তো উঠলই সারাদেশে।  হীরক রাজার দেশের মতো শোনালেও কেউ তা মনের কোণে ঠাঁই দিতে চায় না। যদিও তাতে কী? 

আরও পড়ুন: নেতাজির হলোগ্রাম মূর্তি 'উড়ে' গেল হাওয়ায়! ইন্ডিয়া গেটে ধর্নায় তৃণমূল সাংসদরা 


হিরের দাম তো সস্তা হল সীতারামনের বাজেটে। কারুকাজ করা, কাটা আর পালিশ করা হীরকখণ্ড। দেশবাসীকে গণ্ডমূর্খ ভাবলে ভীষণ ভুল হবে। বললেন বিরোধী নেতারা। আরও কিছুটা এগিয়ে কেউ বললেন, বাজেট তো গোটা দেশের। তাহলে বাজেটে কেন গুঞ্জে শুধুই গুজরাত? বাংলার তো তাহলে সত্যিই বিমাতা কেন্দ্র! নাকি বাংলার মসনদ হাসিল না হওয়ার শাস্তি? একটাও রেলের পুরনো প্রকল্পে বরাদ্দ নেই! মমতা তো রেলমন্ত্রী ছিলেন অতীতের দুই জমানাতেই। তাহলে বাংলা দখল হয়নি বলে এনডিএ সরকারের প্রকল্পকেও উপযুক্ত বরাদ্দ না দিয়ে বরবাদ করার আসল কারণ কী? এখনও তো বাংলার আঠারো আসনে সংসদে সরগরম বিজেপি। তাতেই তো তাদের অহংকারের সংখ্যা ৩০০ পার করা সম্ভব হয়েছে। গতবারের বাজেটেও যে রেল প্রকল্পগুলোকে কোটির অঙ্কে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেগুলোর জন্যে এবার জুটেছে ভিক্ষের চাল। মাত্র, মাত্রই শুধুমাত্রই হাজার টাকা। এটাই কি যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিকতা? এটাই কি মোদি-শাহ কথিত কোঅপারেটিভ ফেডারেলিজম? আসলে বাজেটে আরেকবার বেড়ালটা বেড়িয়ে পড়েছে ঝুলি থেকে। কোভিডের ফলে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত রাজ্যগুলোর দিকে বাঁকা দৃষ্টিপাত কেন কেন্দ্রের? রাজ্যগুলোই তো দেশের বুকের পাঁজর, হৃদয়, মেরুদণ্ড আরও নানা অঙ্গ। এসব শুকিয়ে গেলে কি মাথা বাঁচে? তাহলে দেশের মাথা কেন্দ্র কোন যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের শরীরের শিরায় শিরায় কোষে কোষে রক্ত সঞ্চালনে কার্পণ্য করে? গত অর্থবছরের তুলনায় এবার রাজ্যগুলির জন্য বাজেটে বরাদ্দ বেড়েছে এক শতাংশেরও কম। কিন্তু মূল্যস্ফীতি? এই মূল্যস্ফীতির হার বাদ দিলে আগের চেয়ে এবারের বরাদ্দ কম। আরও চাতুর্যের অঙ্ক হল, এই বরাদ্দের মধ্যেই কেন্দ্রের প্রস্তাবিত রাজ্যগুলোর জন্য বিশেষ ঋণের এক লক্ষ কোটি টাকা। তাহলে মোট বরাদ্দ ১৬ লক্ষ ১১ হাজার কোটির গল্প কোথায় গিয়ে দাঁড়াল ? বলা দরকার, গতবারের বরাদ্দ ছিল ১৬ লক্ষ কোটি। এ তো গণতন্ত্রে মহাজনি হিসেবনিকেশের যন্তর মন্তর! অঙ্কের ইন্দ্রজালে গুলিয়ে দেওয়া হয়েছে অতিমারীর মূল শিকার শিক্ষা-স্বাস্থ্যের বাড়তি বরাদ্দ। খেরোর খাতায় তা খানিকটা বেশি দেখা যাচ্ছে গতবারের তুলনায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কত খরচ হয়েছে সেটা দেখলেই মালুম হবে এই অঙ্কের ভেলকি। সেই সঙ্গে এবার বাজারের মূল্যস্ফীতির দিকে তাকালে তো সোনায় সোহাগা। কিন্তু প্রকৃত তথ্য তো কাচকাটা হিরে। সেই মতো স্বাস্থ্যের বরাদ্দ রীতিমতো অস্বাস্থ্যকর। আসলে গতবারের চেয়ে কার্যত বেশ কম।
দেশের এই দুর্গতির সময় দুর্গতি দূর করার নিদান পিএম গতিশক্তি নামক প্রকল্প। রাজ্যগুলোর জন্য যে ঋণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সেই ঋণ কিন্তু রাজ্যগুলো নিজে শোধ করবে। অথচ নিজেদের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী তা নেওয়া যাবে না। ঋণের টাকা খরচ করতে হবে প্রধানমন্ত্রী গতিশক্তি ও সুনির্দিষ্ট খাতে। এটিও যুক্তরাষ্ট্রের বিধানে এক নতুন পালক। গ্রামীণ অর্থনীতিকে, কৃষক সমাজকে চাঙ্গা করার জন্য এ সরকারের রাতে ঘুম নেই। প্রধানমন্ত্রী বুধবারও দলকে বোঝালেন, এটা গ্রাম ও কৃষকমুখী বাজেট। একথা মানুষকে বোঝাতে হবে। কারণ, বিজেপি যাকে সবচেয়ে বেশি দুয়ো দেয়, পাপ্পু বলে মজাক ওড়ায় সেই  রাহুল গান্ধী সংসদে এমন হুল ফুটিয়েছেন যে কত্তা বেশ উদ্বেগের সঙ্গে মন্ত্রীসান্ত্রীদের বলেছেন পাল্টা প্রচারে নামতে। নাহলে পাঁচ রাজ্যের ভোটে চোট খেতে হবে। অর্থাৎ এবার বিরোধী যুক্তিতে স্পিন ধরেছে শাসনের পিচে। কৃষক একেই বেঁকে বসেছেন। তাদের সাফ প্রতিবাদ বাজেটের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। ‘প্রতিশোধমূলক এইসব প্রস্তাব।’ এই যুক্তি খণ্ডন করতে হলে একশো দিনের কাজের খাতে বরাদ্দ অনেকটা বাড়াতে হয়। কিন্তু তা অসম্ভব। মোদি সরকারের গোড়াতেই আপত্তি ছিল এই ‘গত্ত খোঁড়াখুঁড়ির’ প্রকল্প নিয়ে। পরে নিজের কথা গিলে নিয়ে বরাদ্দ বাড়াতে বাধ্য হন। এটাই ছিল চলতি সরকারের প্রথম পিছু হঠা। এবার ফের ছেঁটে দেওয়া বরাদ্দেই ফিরে গিয়েছেন নির্মলা সীতারামন। বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর সরকারের দিকনির্দেশ গ্রামের নিরন্ন বে-রোজগার মানুষের জীবনের সুরক্ষা নয়। সরকারের অগতির গতি কর্পোরেট। বিরোধীরা যাকে নির্দিষ্টভাবে বলে, ক্রোনি ক্যাপিটাল। দু’ একজন পুঁজিপতির মন রাখতে কর্পোরেট করে ছাড় না দিলে গোদি মিডিয়াও সঙ্গ ছাড়বে। তাই অতি সাধারণ মধ্যবিত্তদের পকেটে মিছরির ছুরি চালাও। ঈশ্বর সঙ্গে থাকলে ভক্তের ভক্তির অভাব হবে না। তাই বিজেপির আজন্ম বিরোধী অবতারের কালে আয়করে ছাড় নিয়ে প্রতি বাজেটে সরকারের শ্রাদ্ধ করলেও আয়করে এবারেও হাত দেয়নি। বিশেষ কারণেই বেপরোয়া বিজেপির এই যোজনা। বিরোধীদের মতে যা বিনাশের লক্ষণ। কিন্তু সংঘ ও সরকারের চালকরা জানেন, মধ্যবিত্ত, গরিব আর কৃষকের কৃপায় তাদের ভোটে জেতার জটিল অঙ্ক না কষলেও চলবে। এসব অঙ্ক অন্যরা করুক। দেশভক্ত আর হিন্দুত্বের অ্যাজেন্ডায় রামবাণ আছে। সংঘের মেরুকরণের মন্থনে তাই উঠে এসেছে ‘অমৃত কাল’-এর কলস। বাকি সবটাই অর্থনীতির খোলস।
 

আকর্ষণীয় খবর