Lata Mangeshkar: যা রে যা রে উড়ে যারে পাখি

দেবারুণ রায়:‌

বসন্ত পঞ্চমীর নিশি ভোরে কোয়েলিয়া আর ডাকেনি।

কুলায় তার সবকিছু ফেলে রেখে সে কখন অন্য আকাশে উড়ে গেল কেউ তা জানে না। একটা সময় এল, জীবনের সব রঙ মুছে যাওয়া মুখ দেখে শিউরে উঠল সবাই। সাড়া পড়ে গেল ক’‌দিনের এই প্রবাসের প্রান্তে, প্রাণ আর সাড়া দিল না। ভারতের রত্নমালা, সরস্বতীর প্রাণপ্রতিমা কোকিলকণ্ঠী লতা মঙ্গেশকরের বিদায়-বেহাগ বেজেছে বসন্তের প্রথম দিনেই। প্রিয়জন স্বজনেরা সেদিনই শেষবারের মত তাঁর বিদায়ের সেই ধুন শুনেছেন মনে মনে। ভেন্টিলেশনে থাকলেও বেলাশেষে, জীবনের খেলা শেষে শোনা তো যাবেই।  শোনা গেছে : "আকাশে আকাশে ফিরে/ যা ফিরে আপন নীড়ে/নয়ন পিঞ্জরে বাঁধি আয়।"
অথবা, "ফুরালো রঙের মেলা/ শেষ হয়ে এল বেলা/ আর কেন মিছে তোরে বেঁধে রাখি/ যা রে যারে উড়ে যারে পাখি...।"

বিরানব্বই বছরে বিদায়। গান তো থেমেছে ক'বছর আগেই। তবু গানের মধ্যেই ছিলেন। জীবনে 
ছিলেন, মরণে আছেন এবং মরণের পরেও যে আছেন ও থাকবেন অনন্তকাল আজ আসমুদ্র হিমাচল তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। প্রবাদের মতো একটা ঘটনার কথা চারদিকে সবসময় শোনা যায়। সেটা হল : দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তিক গ্রামেও দু’‌টো জিনিস অন্তত পাওয়া যাবে।  গান্ধীজির হাতের তেরঙ্গা আর লতাজির গাওয়া গান। এই দু’‌টোই ভারতকে একসূত্রে গেঁথে রেখেছে। এর চেয়ে বেশি ঐকতান কোনও ধর্ম, সংস্কার বা নীতি নিয়ে হয়নি এদেশে। সমস্ত বিভাজনের ভেতর লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠ  অবশ্যই এক মঙ্গলকাব্য। যা নিয়ে কোনও মেরুকরণের অস্তিত্ব নেই এই মেরুর মহোৎসবে।
তাঁকে প্রথম দেখেছিলাম তিরিশ বছর আগে। বিরানব্বই সালে। বেয়াল্লিশের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সুবর্ণ জয়ন্তীতে। মুম্বইয়ের অগস্ট ক্রান্তি ময়দানে। ভারত সরকারের উদ্যোগে ওই অনুষ্ঠান থেকেই সূচনা হয়েছিল দেশব্যাপী বেয়াল্লিশের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন।  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিংহ রাও ছিলেন উদ্বোধক। তাঁরই সফরসঙ্গী দিল্লির গুটিকয়েক সাংবাদিকের মধ্যে আমিও ছিলাম। সেই সুবর্ণজয়ন্তী সমারোহ স্মৃতিতে এক সুবর্ণরেখা। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে উচ্চগ্রামে মুখর এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বিপুল প্রচার চলেছিল দীর্ঘদিন ধরে সারা দেশে। ইতিহাসের বয়স অনুযায়ী কিছুই নয়। মাত্র তিরিশ বছর আগে।  তার মধ্যেই কত বদলে গেছে আমাদের দেশ কাল সমাজ সংস্কৃতি।  বিশেষ করে স্বাভিমান। যা এই ভারতভূমির আত্মা।  আত্মানং বিদ্ধি। মর্যাদার সংজ্ঞায় সংজ্ঞাহীন যেন আগাগোড়া বিশ্ব। স্বদেশে পূজ্যতে রাজা। বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে। দেশের নেতা জওহরলাল গিয়ে নিম্নাসনে কবির পায়ের কাছে সসম্ভ্রমে বসতেন। সেই প্রথম প্রধানমন্ত্রীই অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগোঁ শুনে কেঁদে ফেলেছিলেন, একথা  রূপকথার গল্প হয়ে গেছে কয়েক দশক আগেই।  লতা আর গীতিকার প্রদীপের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের প্রতি দেশের কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন।  জীবনের শেষবেলাতেও লতা সেই দিন আর সেই মানুষের কথা বলতে বলতে মুগ্ধ আবেগে মথিত সুরে ভরিয়ে দিতেন স্রোতা দর্শকদের। সেই আগস্ট ক্রান্তির মহোৎসবেও প্রধানমন্ত্রী পিভি অত্যন্ত সীমিত সংযতি রেখেছিলেন তাঁর পূর্বসূরিদের মতোই। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি তিনি হলেও প্রধানমন্ত্রী বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি সেখানে গৌণ। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ও মুখ্য প্রতিমা যথাক্রমে বেয়াল্লিশের স্বাধীনতা সেনানী ও মেরে ওয়াতনের স্বর্ণকণ্ঠী লতা।যতদূর মনে পড়ে, আগস্ট ক্রান্তির অন্যতমা নায়িকা অরুণা আসফ আলি ছিলেন সেদিনের উৎসবে। দূরদর্শন ওই অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচার করেছিল।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমরা বসে আছি মঞ্চের সাইড স্ক্রিনের পাশে। লতা মঙ্গেশকর উঠলেন মঞ্চে। সম্ভবত তার আগে হৃদয়নাথ ও লতাজির সাথ সঙ্গতের লিড মিউজিশিয়ান ছিলেন মঞ্চে। তাঁদের মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট ঠিক হওয়ার পর লতা দেখে নিলেন ঠিকঠাক আছে কিনা সবকিছু।  তারপর ঘোষণা মাত্রই সেই বিখ্যাত সুরধ্বনি বেজে উঠল। গোটা আগস্ট ক্রান্তি ময়দানের উচ্ছ্বাসের ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে গেল ভারতের ধর্মাধর্ম উচ্চনীচ নির্বিশেষে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী আর কচ্ছ থেকে কোহিমা প্রতিটি মানুষকে। ভারত সরকার আরও পরে জাতীয় সংহতির যে ঐকতান তৈরি করেছিল, মিলে সুর মেরা তুম্হারা, সেই সুরসাগরের সম্মোহনি সুরটি অনেক মণিমুক্তোর মধ্যেও হারিয়ে যায়নি। লতা কখনও গঙ্গা কখনও যমুনা কখনও নর্মদা সবরমতী অথবা কৃষ্ণা গোদাবরী। এই অসামান্য আইডেনটিটিতে মানবী সরস্বতীর কণ্ঠে "দরদ সে মেরা দামন ভর দে ইয়া আল্লাহ্"  শুনে ভক্তকূলের কালাপাহাড়দের  লতাকে ট্রোল করার হিম্মত হয়নি কখনও। লতার গলায় ধর্মনিরপেক্ষ ভারত এতটাই স্বতস্ফূর্ত স্বরলিপিতে উঠে আসত যে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি  নিয়ে যারা সেকুলারিজমের কুৎসা করে সংবিধানের প্রস্তাবনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাঁরাও লতাজির গান নিয়ে জ্ঞান দিতে ভয় পান।
ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে মনে পড়ছে, ভারতের সীমান্ত রক্ষায় অতন্দ্র সেনানীদের আত্মবলিদানের কথা মনে রাখতে বলা সেই গান শুনে মুগ্ধতার বর্ষণে আপ্লুত সেদিনের প্রধানমন্ত্রীর দু’‌ চারটি কথার পর "জরা ইয়াদ করো কুরবানি"র সুর গুঞ্জরিত গোটা ময়দানে। সেই বিরানব্বই সালের শেষ থেকে তিরানব্বই সালে কিন্তু সেই কুরবানির রেশ কাটিয়ে দিয়ে দেখা  গেল বাবরি মসজিদের ধংসস্তুপ আর মুম্বই বিস্কোরণের দগদগে ঘা ভারতের রাজনীতির শরীরে গভীর অসুখ রেখে গেছে। 
সাতানব্বই সালে এল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী।  দিল্লির সংসদ ভবনের সেন্ট্রাল হলে বসল নেহরুর ঐতিহাসিক ট্রিস্ট উইথ ডেস্টিনি বক্তৃতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৪ আর ১৫ অগস্টের মধ্যের  রাত বারোটার অধিবেশন।  তখন কংগ্রেস আর বাম ও অন্যান্য ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর সমর্থিত যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমল। প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রকুমার গুজরাল ছিলেন সংস্কৃতিমান মানুষ।  নেহরুর রাজনীতি অর্থনীতির চিন্তাধারার বাহক। কংগ্রেস ছেড়ে জনতাদলে এসেছিলেন স্বৈরতান্ত্রিকতার ইস্যুতে। এহেন গুজরাল ও তাঁর তথ্য সম্প্রচারমন্ত্রী জয়পাল রেড্ডির পরিকল্পনায় ঐতিহাসিক নৈশ অধিবেশনে লতা মঙ্গেশকরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি সেন্ট্রাল হল মাতিয়েছিলেন বন্দে মাতরমে। যতদূর মনে পড়ছে এ আর রহমানের পরিবর্ধিত সুরে।তাঁর সঙ্গে বোন ঊষাকেও নিয়ে  এসেছিলেন। 
ভারতই  তাঁর ভূষণ ছিল আজীবন।  গানই তার কাছে নেশন। এটা বক্তৃতা না করেও বলেছেন  গানে গানে। তবে দেশের মানুষের তরফেও তো কৃতজ্ঞতার অর্ঘ্য জমেছে তাঁর প্রায় পঁচাত্তর বছরের সুর তপস্যার আলোর উন্মেষে। সেই কাজে ভূমিকা ছিল এনডিএর প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর। ভারতের রত্ন তিনি, সেকথাই উচ্চরবে ঘোষণা করে সে রত্নহার তাঁকেই পরিয়ে দিতে। সেও এক উৎসব সংসদের। পাশাপাশি তাঁকে রাষ্ট্রপতির মনোনীত সম্মানীয় সাংসদ হিসেবেও পাওয়ার গৌরব ভারতের। যে গৌরবের অর্জন ছিল পণ্ডিত রবিশঙ্করের মতো এক অনন্য সুরনায়কের ক্ষেত্রেও।
বাংলার গানের ভুবন আলো করেছেন লতা মঙ্গেশকর অন্তত ছয় দশক। একমাত্র লতাজির পূর্বসূরি গীতা দত্ত আর সমকালের সুমন কল্যাণপুর ছাড়া সমান্তরাল প্রতিভা বলতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আর আশা ভোঁসলে। বাংলা গানের শিল্পী ও সুরকারদের কথা পঞ্চমুখে বলতেন লতা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর সলিল চৌধুরীকে মেন্টরের মর্যাদায় দেখতেন। সলিলের সম্পর্কে হেমন্তর সম্পর্কে বলতে গিয়ে উচ্ছ্বাস চাপতেন না লতা।  সলিলের বিরুদ্ধে তো অভিযোগই ছিল, তিনি সব ভাল গান করেন লতাকে  গাওয়ানোর কথা ভেবে। একথা উড়িয়ে দিয়ে সলিল বলতেন যা, তার মানে একটাই। কোথায় পাব তারে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠস্বর লতার কথায়, গুহায় বসে যেন কোন ঋষি গাইছেন কোন সে মহাকালের ওপার থেকে।  নিজেই বলেছিলেন, প্রতি ভাইফোঁটায় হেমন্তদাকে ফোঁটা দেওয়ার জন্য বসে থাকতেন। সল্টলেক স্টেডিয়ামে সুভাষ চক্রবর্তীর উৎসবে এক ঘূর্ণির মঞ্চে দুরন্ত ঘূর্ণির গায়ককে প্রণাম করে ডুয়েট গাওয়ার স্মৃতি ভোলার নয়। আরতি মুখোপাধ্যায়ের মতো বিখ্যাতরাও সেদিন ঐ দৃশ্যে উদ্বেলিত।  সেই হেমন্তর সুরে গাওয়া লতার গান কী করে ভুলবে বাঙালি: চলে যেতে যেতে দিন বলে যায়, আঁধারের শেষে ভোর হবে ...।
মান্নাবাবুর প্রশংসাতেও মুখর লতার বাংলা ডুয়েট গান বাংলার প্রেমদিনের নস্টালজিয়া।সুধীন দাশগুপ্তর মতো বিরল বাঙালি আর বিরল সুরকারের সুরে। কে প্রথম কাছে এসেছি কে প্রথম চেয়ে দেখেছি কিছুতেই পাইনা ভেবে  কে প্রথম ভালবেসেছি .....।
সেই প্রেমদিনের রেশটুকু শোকের আগুনে পুড়ে ছাই হল কি? না পুড়ে ক্রিস্টাল হল? চোখের জলের কথা শুনবে না কেউ/ ভোরের আলোর কথা ভেবে .....।
সরস্বতীর বিসর্জনের দিন বাংলার  স্মৃতিতে এটাই তাঁর পুনর্জীবনের গান।

আকর্ষণীয় খবর