Dilip Kumar Roy: দিলীপ কুমার রায়: একশো পঁচিশে শ্রদ্ধা

গৌতম রায়:‌ সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়।

পশ্চিমবঙ্গ তখন রাজনৈতিক শোরগোলে উত্তপ্ত। এক পড়ন্ত বিকেলে অন্নদাশঙ্করের যোধপুর পার্কের বাড়িতে এলেন গৈরিক বসনধারী, শ্মশ্রুশোভিত এক বৃদ্ধ। অনেক রাত অবধি খালি গলায় তিনি গাইলেন। অন্নদাশঙ্কর, লীলা রায় তাঁদের মন্টুদার গলায়, 'সেই বৃন্দাবনের লীলা অভিরাম' শোনার পরই প্রায় একযোগে আবদার করলেন; মন্টুদা, সেই জার্মান ঘুম পাড়ানি গানের সুরে একটা বাংলা গান বেঁধেছিলেন না, একবার শোনান না, বৃদ্ধ ধরলেন; ঘুম যাই মা, তোর কোলে আজ ঘুম যাই মা।
গান শেষ করেই বললেন; দ্বারভাঙা হলে একটা ঘরোয়া সভায় গাইছি। তখন মহাত্মা নিধনের খবরটা এল। এই গানের অনুরোধ যখন এখানেও এল, হয়তো এটাই আমার শেষ কলকাতায় আসা।
রে রে করে উঠলেন অন্নদাশঙ্কর, লীলা। কিন্তু সেটাই ছিল তাঁর শেষ কলকাতা সফর। নশ্বর শরীরে আর যৌবনের উপবন কলকাতায় আসেননি দিলীপকুমার রায়। '৮০ সালে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
অন্নদাশঙ্কর বলতেন; মন্টুদার যৌবনে তাঁর মতো এলিজেবল ব্যাচেলার বাংলায় আর মাত্র একজন ছিলেন। তিনি সুভাষ চন্দ্র বসু। বন্ধু সুভাষকে ঘিরে নানা তর্ক হত অন্নদাশঙ্কর আর তাঁর মন্টুদার ভিতরে। বন্ধু সুভাষের প্রতি গভীর স্নেহ থাকলেও রাজনীতি ঘিরে কোনও আগ্রহ দাদাজির ছিল না। আর অন্নদাশঙ্কর কখনও দলীয় রাজনীতির ধারপাশ দিয়ে না হাঁটলেও অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন মানুষ ছিলেন। প্রবল গান্ধীবাদী অন্নদাশঙ্কর সুভাষচন্দ্রকে ঘিরে বাঙালি–সুলভ আবেগ থেকে অনেক দূরে ছিলেন। আর দিলীপ কুমার রায় কোনও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অবস্থান না করলেও বন্ধু সুভাষ আবেগে টইটম্বুর ছিলেন।
সমকালে দিলীপ কুমার রায় ছিলেন বাঙালির কাছে এক পরম বিস্ময়। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সাথে যুক্ত হেন বাঙালি বিশ শতকে ছিলেন না, যাঁদের দিলীপ কুমারকে ঘিরে আবেগ ছিল না। দিলীপ কুমার এসেছেন ঢাকায়। উঠেছেন তাঁর বন্ধু বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বাড়িতে। রাণু সোম খবর পেলেন, সত্যেন বসুর বাড়িতে সেদিন দিলীপ কুমার গাইবেন। নির্বাচিত আমন্ত্রিত শ্রোতা। রাণু সোমকে আগে তাঁর গানের শিক্ষক কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন দিলীপ কুমারের কথা। যদি রাণুকে কখনও তিনি গান শেখান, রাণুর জীবন ধন্য হয়ে যাবে— সেই কথাও নজরুল বলেছেন।
তাই রাণুর বড়ো ইচ্ছে দিলীপ কুমারের গান শোনবার। কিন্তু বিনা আমন্ত্রণে যান কী করে? তাও আবার খোদ জমিদার বাড়িতে। কাউকে বলতেও পারছেন না নিজের দুঃখের কথা। সেদিন সকাল থেকেই রাণুর বাবা দেখেন মেয়ের মন খারাপ। কয়েকবার জিজ্ঞেস করেও জবাব পাননি। একটু দুশ্চিন্তাতেই পড়ে যান রাণুর বাবা। মেয়ে তো এমন করে না। তিনি ভাবতে থাকেন। দুঃখ–কষ্ট যাই হোক না কেন, মেয়ে তো সবকিছু তাঁকে বলেন। অনেক পীড়াপীড়ির পর মেয়ে বললে বাবাকে কেন তাঁর মন খারাপ। অসহায় বাবা কি আর করেন। মনের দুঃখ মনে চেপে রেখেই নিজের অফিসে গেলেন। ফিরে এসেও দেখেন, মেয়ে তখনও মন খারাপ করে বসে আছে। মেয়েকে যখন তিনি বোঝাচ্ছেন, তখনই একটা ঘোড়ার গাড়ি এসে থামল রাণু সোমদের বাড়ির সামনে। একজন এসে একটা রঙিন লেফাফা দিলেন রাণুর বাবাকে।
লেফাফা খুলে চিঠিটা পড়েই আনন্দে চকচক করে উঠল রাণুর বাবার মুখ। চিঠিটা তিনি এগিয়ে দিলেন মেয়ের দিকে। চিঠিটা লিখেছেন স্বয়ং দিলীপ কুমার রায়। নজরুলের কাছে তার আগেই তিনি রাণুর কথা শুনেছেন। রাণুর পিতাকে দিলীপ কুমারের অনুরোধ; তিনি যদি আজকের মেহফিলে অনুগ্রহ করে রাণুকে নিয়ে একটিবারের জন্য আসেন।
চিঠি পড়ে রাণু তো একেবারে হাতে চাঁদ পেলেন। বিশেষ সাজগোজের ভিতরেও গেলেন না তিনি। শীত কাল। বাড়িতে যে কার্ডিগানটা  পড়ে আছেন, সেটা পরেই পড়ি কি মরি বাবার সঙ্গে ছুটলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বাড়িতে দিলীপ কুমার রায়ের গান শুনতে।
ঢাকার গণ্যমান্য অনেকেই সেখানে আছেন। দিলীপ কুমার একটা গান গেয়ে শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে আর গাইতে চাইলেন না। উপস্থিত মানুষজনেরা তখন তাঁর কাছে গিয়ে কুশল বিনিময় করে একে একে বিদায় নিচ্ছেন। কিশোরী রাণু ভাবছেন, একবার যদি ওঁকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে পারতাম। কিন্তু অত লোকের ভিড় ঠেলে যেতে সঙ্কোচ বোধ করছেন কিশোরী রাণু। সিঁড়ির এক কোনে দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ দেখেন, একটা হাত তাঁর কাঁধে। মুখ ঘুরিয়ে দেখেন দিলীপ কুমার রায় স্বয়ং। বললেন; তোমার সঙ্গে কথা বলব বলেই তো শরীর খারাপের ছুতো করে সবাইকে ভাগালাম! 
 রাণু সোম হলেন পরবর্তী কালের যশোশ্বিনী লেখিকা প্রতিভা বসু। 
 দিলীপ কুমার ছিলেন অন্তর বৈরাগ্যে পরিপূর্ণ এক আনন্দঘন পুরুষ। প্রথাগত সন্ন্যাস তিনি কখনও নেননি। গৈরিক বসন পড়তেন। তবে সে গৈরিক বসনও ছিল খুবই পরিপাটি। সাধারণত সিল্ক ছাড়া অন্য কোনও কাপড় ব্যবহার করতেন না।
দিলীপ কুমার আধ্যাত্মিক আকর্ষণে পণ্ডিচেরি নিবাসী হয়েছিলেন, নাকি অন্য কোনও আকর্ষণ তাঁকে ওই দূর দেশে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল- এ নিয়ে পরস্পর বিরোধী চাপানউতোর আছে। দিলীপ কুমারের লেখা চিঠির ঝাঁপি যদি তাঁর মৃত্যুর পর সাহানা দেবী পুড়িয়ে না ফেলতেন, তাহলে হয়তো সেই বিতর্কের একটা নিশ্চিত সমাধান হতে পারত।
তবে অকল্পনীয় প্রতিভার অধিকারী হওয়ার জন্যই নাকি কে জানে, দিলীপ কুমার চিরদিনই জড়িয়ে পড়তেন নানা বিতর্কে। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। দিলীপের পিতা দ্বিজেন্দ্রলালের সাথে রবীন্দ্রনাথের অম্লমধুর সম্পর্ক থাকলেও, 'মন্টু' কে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন রবীন্দ্রনাথ। তাই দিলীপ কুমার ও নানা বিষয় নিয়ে কবির সঙ্গে জুড়ে দিতেন সীমাহীন তর্ক। দিলীপ কুমারের তানকর্তব ঘিরে একটু বেশিই রিজারভেশন ছিল রবীন্দ্রনাথের। সেকালে যে বিষয় নিয়ে রবীন্দ্রনাথের আপত্তি, সেই বিষয়টি নিয়ে কবির সঙ্গে বিতর্কে যাওয়ার সাহস খুব বেশি মানুষের ছিল না। দিলীপ কুমারের কিন্তু সেই সাহসটা ছিল। রবীন্দ্রনাথ যুক্তি দিয়ে খন্ডন করছেন তাঁর 'মন্টু' র কথা, আবার দিলীপ কুমারও পাল্টা যুক্তি তুলে ধরছেন কবির সামনে। শঙ্খ ঘোষ অসামান্য বিশ্লেষণ করেছেন গান ঘিরে রবীন্দ্রনাথ আর দিলীপ কুমার রায়ের বিতর্কের। দিলীপ কুমার নিজে জীবন সা‌য়াহ্নে কলকাতার মহাজাতি সদনে একটি অনুষ্ঠানে অশ্রূরুদ্ধ কণ্ঠে কবির সঙ্গে তাঁর সেই তর্ক ঘিরে অনেক কথা বলেছিলেন। শঙ্খবাবু নিজে সেই অনুষ্ঠানের শ্রোতা ছিলেন।

আকর্ষণীয় খবর