UP: বিজেপির শেষের শুরু ওয়াজির আলীর নগরে, মায়াবতীর মায়া কাটবে মমতার ছায়ায়?

চব্বিশের লোকসভা ভোটের আগে উত্তর প্রদেশের নির্বাচনেই হয়ে যাবে পরিবর্তনের লিটমাস টেস্ট।

 বিজেপির স্বপ্নের হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পোস্টার বয় মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। সন্ন্যাসীর বসন ভূষণ গোরক্ষপুরের মোহন্তের হলেও, তাঁর শাসন ও ভাষণ তীব্র তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক নেতার। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের রণনীতি মিশিয়ে অসম প্রতিযোগিতার অস্ত্র করেছে তাকে সংঘ পরিবার। মাথায় প্রভাবশালী গোরক্ষপুর মঠের মোহন্তকে রেখে উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অনগ্রসর বা ওবিসি নেতা কেশবপ্রসাদ মৌর্যকে বসিয়ে একদিকে গৈরিক রাজনীতি আর অন্যদিকে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মিশেলে ২০১৭-য় জাতপাতের মেরুকরণ করে বিজেপি। একে তার আগেই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি ২০১৪-য় দিল্লির গদি উল্টে দিয়েছিল উত্তরপ্রদেশের সমীকরণ ওলটপালট করে। ক্ষমতাসীন সমাজবাদী পার্টির ভেতরে ঢুকে বসেছিল বিজেপির ট্রোজান হর্স। মুলায়ম সিং যাদবের পরিবারে ফাটল ধরিয়ে সাম দাম দণ্ড ভেদের চাল বাজিমাৎ করেছিল। আর সেই পাশা ওল্টানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল পশ্চিম উত্তর প্রদেশের মুজঃফরনগরের সাম্প্রদায়িক হানাহানি থেকে। জাঠ আর মুসলমানদের চিরাচরিত সামাজিক ঐক্যের সম্পর্ক ভেঙে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা বাধিয়েছিল যারা তারাই ছিল উত্তর প্রদেশের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের হোতা। বিজেপি বিরোধীদের মধ্যে আঁটোসাঁটো বোঝাপড়ার অভাব এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের সম্পর্ক গড়তে সাহায্য করেছিল বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির গুরুতর মামলা। সেই সঙ্গে একদিকে মোদি ও শাহর আগ্রাসী প্রচার আর অন্যদিকে হিন্দু যুব সংগঠনের ব্যানারে যোগীর সমান্তরাল অভিযান উত্তর প্রদেশের ২০১৪র সাফল্যকে সংহত করেছিল রাজ্যে ২০১৭য় একক শক্তির বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠা করে। তৃতীয় স্থান থেকে বিপুলভাবে প্রথম স্থানে উঠে এসেছিল বিজেপি।  
তারপর থেকে লাগাতার সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের তাসকে "বিকাশের" নামে ব্যবহার করে চলেছে উত্তর প্রদেশের তথাকথিত ডবল ইঞ্জিনের সরকার। ধারাবাহিক ভাবে মন্দিরের রাজনীতিকে বুলডোজার করে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অস্তিত্বকে নস্যাৎ করতে চেয়েছে হিন্দুত্ববাদী ছাতার তলায় মাথা বাঁচানো নানা ভুঁইফোঁড় সংগঠন ও শাসকের প্রশ্রয়ে পুষ্ট সংবিধান বহির্ভূত শক্তি। শাসনের তর্জন উপেক্ষা করে জনসেবক ডাক্তার, প্রশাসক থেকে শুরু করে সাংবাদিক পর্যন্ত তাঁদের পেশায় সততার মূল্য দিয়েছেন পেশিশক্তির পীড়ন স্বীকার করে।  বিনা বিচারে কারাবাসের যন্ত্রণাও সহ্য করতে হয়েছে। উন্নাওয়ের দলিত মেয়ে যেমন পাশবিক ক্ষমতার শিকার হয়েছে, তেমনি লখিমপুরের কৃষক ও সাংবাদিক নেতার গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়েছেন। শাসকদলের নেতা, বিধায়ক, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফৌজদারী অভিযোগ ও মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। সেঙ্গারের পর নানা রাম শ্যাম হয়ে টেনি মিশ্র এখন বিক্ষোভের কেন্দ্রে। কিন্তু ক্ষমতার অমোঘ অঙ্ক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পরিষদের সদস্য টেনিকে এখনও টেনে নামাতে দেয়নি। উত্তর প্রদেশের মুজঃফরনগরের সাম্প্রদায়িক তাস হাতছাড়া হওয়ার পর এখন ব্রাহ্মণের ভোট খোয়ানোর ভয় পেয়ে বসেছে বিজেপিকে। সন্ন্যাসীর (যোগী) পূর্বাশ্রম নিয়েও হিন্দি বলয়ে ভোটের অঙ্ক কষা হয়। যোগী আদপে "বিস্ট।" ঠাকুর কুলোদ্ভব। প্রদেশে" ঠাকুর রাজ " কায়েম হয়েছে এই অভিযোগে কুলোর বাতাস দিয়ে বিজেপি উচ্ছেদের জিগির তুলেছে বামুনদের একাংশ।  এবং বামুন ভোটের আদি দাবিদার সর্বহারা কংগ্রেস।  কিন্তু কংগ্রেস যদি অন্য বর্গের ভোট কিছু টানতে পারে তাহলে উচ্চবর্ণের বিশেষ করে ব্রাহ্মণরা একাংশ ফিরে যাবেন তাদের দিকে।  পূর্ব উত্তর প্রদেশের এই ভোটে ফাটল ধরলে বিরোধীদের জয়ের পথ সুগম হবে। কারণ একেই ব্রাহ্মণের ভোট পাওয়ার পুরনো রণনীতি বহাল রেখেছেন মায়াবতী  সতীশ মিশ্রকে দিয়ে।  এবং এবার নির্দিষ্ট কারণে বহুজন সমাজ পার্টির নেত্রী তেমন আক্রমণাত্মক নন। যদিও তেড়েফুঁড়ে নেমেছেন প্রিয়াঙ্কা তাঁর হট স্লোগান " লড়কি হুঁ লড় সকতি হুঁ " নিয়ে। মেয়েদের ভোট সবসময়ই যেকোনও বিজয়ী দলের নৈবেদ্য হয়। বিজেপির ভোগেও গতবার লেগেছিল এই ভোট। সুতরাং কংগ্রেস যতটুকু টানবে ততটুকুই বিজেপির ভাঁড়ারে বাড়তি ঘাটতি হবে। কারণ যথেষ্ট শক্তিশালী পাঞ্জার লড়াইয়ে উঠে এসেছে অখিলেশের নেতৃত্বে সমাজবাদী পার্টি।  প্রাক ভোট মতামত সমীক্ষার আঁচ অখিলেশকেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সবচেয়ে ফেভারিট করে তুলেছে।  প্রিয়াঙ্কা তিন  ও মায়াবতী চার নম্বরে থেকে স্পষ্ট বলে দিচ্ছেন অনগ্রসর বা ওবিসি ভোটে যাদবসহ অন্যরা অনেকেই এবং মুসলমান ও সংখ্যালঘুদের  সিংহভাগ ভোটের হকদার এবার মুলায়মের বাবুয়া অখিলেশ। বিজেপি থেকে মৌর্য ও চৌহানকে লালটুপি পরিয়ে বিজেপির চাণক্যদের চমকে দিয়েছেন তিনি। শুধু বিজেপি নয়। অন্য বিরোধীরাও বেশ অবাক। বিজেপির বিনাশকাল আসন্ন কিনা সেটাই বলবে এবার উত্তরপ্রদেশ। তবে বিপরীতবুদ্ধির নিদর্শন তো মিলছে। লখিমপুরের ঘটনার এসআইটি রিপোর্ট যা বলছে তাতো এককথায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সরে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।  কিন্তু অচলায়তন গড়ে ওঠে শঙ্কা আর অহংকারের ভিতের ওপর। ভীতি জেগেছে শাসকদলের নেতৃত্বের মনে। তাই বাফার বা শক অ্যাবজর্ভার হিসেবে টেনিকে রেখে দেওয়া হয়েছে।  উত্তর প্রদেশের তখত উল্টে গেলে অথবা সমর্থনভূমিতে  বড়সড় ধস নামলে বলির বকরা করা হবে তেনাকে। যাতে কর্তাদের গায়ে আঁচ লাগবে না। উত্তর প্রদেশের ব্রাহ্মণকুল অবশ্য এতোটা অবোধ নয়। গেরুয়া ঠাকুরের নেতৃত্বে সরকার গড়তে ব্যালেন্স করা হয়েছিল ওবিসি উপমুখ্যমন্ত্রী দিয়ে। কিন্তু কেন্দ্রে উত্তর প্রদেশের কোনও ডাকসাইটে ব্রাহ্মণ মন্ত্রী নেই।  মুরলীমনোহর জোশী বা কলরাজ মিশ্রকে কার্যত নির্বাসন দেওয়া হয়েছে রাজনীতি থেকে। জোশী পূর্ণ ব্রাত্য।  আর কলরাজ রাজ্যপাল হয়ে রাজনীতির চৌহদ্দির বাইরে। প্রচারেও তাঁদের নো এন্ট্রি।  অথচ উত্তর প্রদেশে অটল আডবাণীরা কল্যাণের মত ওবিসি নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী রেখে জোশী, কলরাজ, রাজনাথকে দিয়ে ভারসাম্য রেখেছিলেন।  আর খোদ অটলবিহারী ছিলেন তখন দলের মুখ।  সুতরাং উত্তর প্রদেশে নেহরু ইন্দিরার পর শাস্ত্রী, কমলাপতি বা নারায়ণ দত্ত তিওয়ারির কংগ্রেসের উচ্চ বর্ণের সমর্থনভূমি অনায়াসে বিজেপির ছাতা মাথায় দিয়েছিল। সেই জাতপাতের সমীকরণকে ঘেঁটে দিয়েছেন মোদি-শাহ-যোগী। আরএসএসের আদি তত্ত্ব ধর্মীয় মেরুকরণের সঙ্গে জাতের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে।  এতে প্রথম দানে সাফল্য এলেও এখন প্রত্যাশা আর প্রতিশ্রুতি পূরণের হিসেব চায় মানুষ রাজ্যে ডবল ইঞ্জিনের সরকার পাঁচ বছর ধরে চলার পর।  তাই অযোধ্যার ভব্য মন্দিরের সূচনা, কাশীর পাঁচ তারার তীর্থের মুক্তির দেবতা শিবকেই মুক্ত করার মাহাত্ম্য এবং মথুরার মুক্তির গপ্পো যতই শোনা যাক, যোগী বুঝেছেন, এতে মোটেও ভোটের চিঁড়ে ভিজবেনা। এবং তাঁকে শুধু মুখ্যমন্ত্রীর গদি টিকিয়ে রাখাই নয়, চব্বিশে বড় মাঠের খেলায় খেল দেখাতে হবে। মোদির মতো তিনবারের মুখ্যমন্ত্রীকেও যেমন দলের ভেতরেও কেউ জমি ছেড়ে দেয়নি,তেমনি তাঁকেও মুখের কথায় দেবে না। সুতরাং অযোধ্যা বা মথুরার অচেনা মাঠের মায়ার ফাঁদে পা না দিয়ে তিনি গোরক্ষপুরের চেনা ঠিকানাই বেছে নিয়েছেন। যদিও গোরক্ষপুরে তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধী জোটের ইতিহাস মোটেই পুরনো নয়। বুয়া-বাবুয়া হাত মিলিয়ে যোগীর পাত্তা সাফ করেছিলেন। তাতেই টনক নড়ে নড়েচড়ে বসে বিজেপি।  বিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরায় বুয়া মায়াবতীকে দিয়ে। 
কিন্তু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি  সবসময় একইভাবে হয় না। এটাও ইতিহাসের শিক্ষা। যা থেকে রাজনীতি সদাই এক পরিস্থিতিতেও ভিন্ন মোড় নেয়।  যার জ্বলন্ত প্রমাণ পশ্চিমের ছোট্ট রাজ্য গোয়া। গতবারই কংগ্রেস সেখানে সরকার গড়তে পারত। কিন্তু বিজেপির তিক্রমের কাছে হার মেনে দান ছাড়তে হয়েছিল তাদের।  এবার এই ক্যাথলিক প্রভাবিত রাজ্যে জনপ্রিয়তার তলানিতে এসে ঠেকেছে মোদির দল। জনপ্রিয় নেতা পারিকরের পর বিজেপির পাড়ানির কড়ি জোগানোর মতো নেতা কেউ নেই। মহারাষ্ট্রবাদী গোমন্তক পার্টিকে তারা মুরুব্বি ঠাউড়েছে বিহারে নীতীশের দলের মতো। তবে এমজিপি ও বিজেপির সমর্থনভূমি অভিন্ন।  তাই  এই মুরুব্বির দৌলতে ভোটের মোরব্বা জুটবে না। তাছাড়া এই দলটি বিরোধী জোটে থাকলেও তাকিয়ে আছে কংগ্রেসের দিকে।  কংগ্রেসের পালে হাওয়া লাগলে সবার আগে ওই নৌকোয় ঝাঁপাবে বিজেপিকে অকূলে ভাসিয়ে।  এমতাবস্থায় সঙ্গত কারণেই মমতার তৃণমূল ফলে ফুলে পল্লবিত হওয়ার হাওয়া বইছে।  পহলে "আপ" হাজির হয়েছে পানাজিতে। জিতে এসে নিজেরা সরকার গড়বে এমন লহর কোথায় ? তবে আপাদমস্তক কংগ্রেস বিরোধী এই দুটি দল দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে বারবার বিজেপির অশ্বমেধের ঘোড়াকে রুখে জনসমর্থনের জোরে সরকার চালাচ্ছে। তারা নিজেরা খেলতে পারল কতটা তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল বড় দুই দলের মধ্যে কার খেলা পণ্ড করল বেশি।  হারানোর ভয় শাসকেরই সর্বদা বেশি। কিন্তু গোয়া তো বিজেপির পুরনো খেলার মাঠ।  তাই  তারা কংগ্রেসের চেয়ে চিন্তিত কম। যদিও গোয়া যদি খোয়া যায় তাহলে মহারাষ্ট্রের মোয়া খাওয়া হবে না। আর বম্বে টু গোয়া যদি গুলিয়ে ফেলে কেউ , তাহলে দিল্লির সিন্দুকের  চাবিও গুলিয়ে যাবে। তবে সর্বশেষ আপডেট, গোয়া ভোট উত্তর জোটের দিকে এগোচ্ছে। যেখানে ভারতের আগামী দিনের জোট গড়ে উঠতে পারে বিরোধীদের পারস্পরিক বিবমিষা কাটিয়ে। আরব সাগরের জল লোনা। 
অযাচিত আশা নয়। রাজনীতির যাচিত ভাষা। উত্তরে আর পশ্চিমে বিজেপির শেষের শুরুর লক্ষ্মণ অস্পষ্ট নয়। স্বচ্ছ হয়ে আসছে ভোরের আকাশ। যেখানে যে মূল বিরোধী শক্তি তার অভ্যুদয়টাই সম্ভব।  এখানে যদি বলি রাজনীতি অসম্ভবের বিজ্ঞান তাহলে বলতে হবে বিজ্ঞান নয় বিজ্ঞাপন। সত্যিকে গুলিয়ে ঘুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে।  
লখনউ এব্যাপারে অনেকটাই স্মার্ট।  কারণ বৃহত্তম এই রাজ্যই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রধানমন্ত্রীকে পাঠিয়েছে। তাই হেঁয়ালি খেয়ালি খামখেয়ালি রাজনীতি তেমন দৃশ্য নয় ওয়াজির আলী শাহর নগরীতে। অমিত শাহর কদর এখনও পর্যন্ত বহাল। তবে বিজেপির ধর্ম ও জাতপাতের রাজনীতির বিভাজনের পাল্টা চাল চেলেছেন অখিলেশ। কোনও বিরোধী দলকে আক্রমণ করতে দেখা যাচ্ছে না ওঁকে।  আর উত্তর প্রদেশের কোন দাবি নেই যাঁর সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিজেপি বিরোধিতার মুখ বলে আমন্ত্রণ করেছেন যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে। মমতাও চেয়েছিলেন যেতে। এতে সাধারণ বিজেপি বিরোধী ভোট তো উজ্জীবিত হবেই।  সেই সঙ্গে সংহত হবে সংখ্যালঘু ভোট , সমাজবাদী পার্টির পক্ষে।  মায়াবতীর মায়া কাটবে মমতার ছায়ায়।

আকর্ষণীয় খবর