Bangladesh: বাংলাদেশের বিজয় দিবস: শান্তি এবং প্রগতির নতুন সকাল

মহ.‌ সাইয়াকুল সেখ:‌ একাত্তরের বিজয় দিবস শুধুমাত্র বাংলাদেশের নয়, ক্রমেই হয়ে উঠেছে সমগ্র বাঙালি জাতির বিজয় দিবস। ৩০ লক্ষ শহিদের তাজা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা এ বছর পঞ্চাশে পা দিল। 
১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট ভারত ভেঙে পাকিস্তানের জন্ম, আর ১৯৪৮ সালের ফ্রেব্রুয়ারি মাসে পশ্চিম পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জিন্নার জনসভায় বাঙালি তারুণ্যের উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষিত বিদ্রোহ–এই বিদ্রোহের বহিঃপ্রকাশ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এরপর ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জয়, ১৯৬১ সালে সরকারের আপত্তি সত্ত্বেও রবীন্দ্র শতবার্ষিকী উদ্‌যাপন ও বাংলা ভাষার আন্দোলনে শিলচরে ১১ জন শহিদ, ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ছয়দফা দাবি উত্থাপন, ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান– প্রত্যেকটি পর্যায় হল তৎকালীন পূর্ববাংলার বাঙালির মুক্তিপথের এক একটি পর্যায়। এরপর ১৯৭০–র সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুর শোষণের বিরুদ্ধে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সুস্পষ্ট রায়। অতঃপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন। 
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে যখন সেদিনের কথা স্মরণ করা হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে ভারতবর্ষের কথা, ভারতবাসীর কথা। যুদ্ধের সময়কালে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী চারটি ভারতীয় রাজ্যে (পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়) প্রায় এক কোটি শরণার্থীর আগমন ঘটেছিল। তার মধ্যে পশ্চিমবাংলার ক্ষেত্রে সংখ্যাটি ছিল প্রায় ৭৫ লক্ষ। শরণার্থী আগমনের পূর্বেই এই সমস্ত অঞ্চলে খাদ্যশস্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রবের ঘাটতি বর্তমান ছিল। কিন্তু এক কোটি শরণার্থীর সমাগমে সেই ঘাটতি আরও ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। ফলে ওই সমস্ত রাজ্যগুলোতে মাথাপিছু খাদ্যশস্য জোগানের পরিমাণ কমতে থাকে, বাড়তে থাকে জিনিসপত্রের দাম ও কালোবাজারি। 
যুদ্ধের কারণে ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত কলকাতা এবং শিল্পাঞ্চলগুলোতে ব্ল্যাক–আউট কার্যকর ছিল। এই সময় কলকাতা শহরে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষদের (বিশেষত রিক্সাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, ট্যাক্সি ড্রাইভার) নানাবিধ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। রাত্রিবেলা গাড়ির হেডলাইটের ওপরের অংশ দুই–তৃতীয়াংশ কালো করে ঢেকে রাখা বা কাগজের মোড়ক দিয়ে মুড়ে রাখা হত এবং ঠেলার নিচে ঢাকা দেওয়া বাতি ব্যবহার করা হত। রিক্সা–ঠেলাগাড়ি ও ট্যাক্সির সামনে–পিছনে বিশেষ ধরনের সাদা চিহ্ন ব্যবহার করা হত দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য। 
প্রতিবেশি রাষ্ট্রের আসন্ন স্বাধীনতার জন্য সামান্য এই ত্যাগ হাসিমুখেই বরণ করে নিয়েছিল এ পারের মানুষজন। ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধ শেষ হলে নিষ্প্রদীপ অবস্থা ত্যাগ করে কলকাতার আলোর রোশনাই অভিনন্দন জানিয়েছিল ঢাকাকে। মুক্তির দিনটিকে স্বাগত জানিয়েছিল আন্তরিকভাবে। আলোর উৎসব সূচিত করে নবজীবনের জয়যাত্রা। ব্ল্যাক–আউটে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন কলকাতায় চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি বেড়ে যাবে। কিন্তু সেসব কিছুই হয়নি, বরং নিষ্প্রদীপের কলকাতা দেখিয়ে দিয়েছিল জাতির সঙ্কটের দিনে কিভাবে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হয়।
 ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়জির (১৯১৫–২০০৪) আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কলকাতার সাংবাদিকদের নিয়ে যাওয়া হয়নি। দুটি বিশেষ বিমানে আমেরিকান টেলিভিশন কোম্পানি ও পশ্চিমি সংবাদপত্রের রিপোর্টারদের ঢাকায় নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে জানতে পেরে কলকাতার সাংবাদিকেরা সামরিক বাহিনীর চিফ পাবলিক রিলেশনস অফিসার ব্রিগেডিয়ার শেঠনার (১৯৪৪–২০০৬) কাছে অভিযোগ করলেও কোনো সুরাহা মেলেনি। যে কয়েকজন সাংবাদিক ঢাকায় ওই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী ছিলেন তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন একেবারে নিজস্ব উদ্যোগে। বিদেশি সাংবাদিকদের বেশি করে যানবাহনের ব্যবস্থা করা, লড়াইয়ের ময়দানে গিয়ে ছবি তোলা ও খবর সংগ্রহ করার অনুমতি দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে সেনাবাহিনীর দাক্ষিণ্য যতটা অকৃপণ ছিল, দেশি সাংবাদিকদের প্রতি ততটা ছিল না। ভারতীয় সাংবাদিকদের তুলনায় বিদেশি সাংবাদিকদের প্রতি অতিরিক্ত সুযোগ–সুবিধা প্রদানের এই বৈষম্যমূলক নীতি ভারত তথা কলকাতার সাংবাদিকদের বিস্মিত করে। দেশীয় সাংবাদিকদের প্রতি বিরূপতার কোনো সুস্পষ্ট কারণ অনুসন্ধান করা যায়নি, সামরিক বাহিনীর তরফে এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়নি। বিদেশি সাংবাদিকদের প্রতি সদয় হওয়াটা অন্যায়ের নয়, কিন্তু দেশীয় সাংবাদিকদের প্রতি অনীহা ও বিরূপ মনোভাব দুঃখজনক ও আপত্তিকর। 
মুক্তিসংগ্রামে জয়লাভের পর থেকেই বাংলাদেশে অসামরিক জোগানের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। শুধু তাই নয় ঔপনিবেশিক সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে বাংলাদেশ সরকার সিভিল সার্ভিসের কোনো ‘স্টিল ফ্রেম’ পায়নি। সেজন্য অসামরিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবার জন্য তাদের দুঁদে অফিসারের প্রয়োজন দেখা দেয়।

জরুরি অবস্থার কথা চিন্তা করে ভারত সরকার প্রায় অভিজ্ঞ ৩০ জন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মচারী ‘ধার দিয়েছিল’ নতুন প্রশাসন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য। অবশ্য এটা সম্পন্ন হয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের একান্ত অনুরোধে, ভারতের কাছে তারা চেয়েছিলেন–আটজন আই.এ.এস. পদমর্যাদায় অ্যাডিশনাল ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট, একজন ডিরেক্টর অফ হেলথ সার্ভিসেস, চারজন ডেপুটি ডিরেক্টর এবং পোর্ট পরিচালনার জন্য কয়েকজন অভিজ্ঞ অফিসার। নতুন একটি রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যত সম্প্রীতির যে বুনিয়াদ সেদিন সুদৃঢ় হয়ে উঠেছিল সেটি আজও বর্তমান। 
মুক্তিযুদ্ধের প্রবাহ ছিল দুটি–একটি অভ্যন্তরীণ, অপরটি ছিল দেশের বাইরে। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম একমাস যুদ্ধটা চলেছিল বাংলাদেশের ভিতর থেকেই। তবে সেই যুদ্ধে পাকিস্তানের অত্যাচারী খান সেনাদের বিমান, কামান, ট্যাঙ্কারের সঙ্গে ৩০৩ নং রাইফেল, সামান্য কিছু মর্টার, আর মেশিনগান নিয়ে পেরে ওঠেনি মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা। তখন তারা গেরিলা পদ্ধতিতে অভ্যন্তরীণ এলাকায় জনগণের সহযোগিতায় পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনীর উপর অতর্কিত আঘাত হেনে তাদের অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। 
যুদ্ধের কারণে মুক্তিবাহিনীর চলাচল ও গতিপ্রকৃতিকে গোপন রাখতে হয়েছিল। আর এই সুযোগেই পাকবাহিনীর অনুচর রাজাকার ও আল–বদর বাহিনী গণহত্যা, লুঠ, নারী নির্যাতন চালিয়ে ত্রাসের রাজত্ব শুরু করেছিল। এই ঘটনা অভ্যন্তরীণ প্রবাহের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। কেননা ভিতরে ও বাইরের দুটি প্রবাহ তখন মুক্তিবাহিনীর কাছেও স্পষ্ট ছিল না। আবার বাইরের ও ভিতরের এই সংযোগ দেশে অবস্থানকারী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছেও পরিষ্কার ছিল না। এদের মনে হয়েছিল যুদ্ধের দুটি স্রোত– একটা ভিতরের প্রতিরোধের, আরেকটা বাইরের মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ প্রচেষ্টা। এই সূত্রেই তখন ‘আমরা–ওরা’ ভাগ করে দেখার ব্যাপার ঘটেছিল। ফলস্বরূপ, ভিতরের ও বাইরের যোগসাধনের চিত্র চোখের সামনে স্পষ্ট না থাকায় ‘শরণার্থী ও মরণার্থী’ হিসাবে দেশবাসীকে ভাগ করবার কথাও উঠেছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অবিভাজ্য রূপটি সকলের সামনে উন্মোচিত হয়েছিল পাকিস্তান ঘাতক বাহিনীর উপর শেষ আঘাত হানার পরে। 
ইউএনআই এর রিপোর্ট অনুযায়ী ভারত–পাকিস্তানের সংঘর্ষের (১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত) ফলে–পাকিস্তানের ৯৪ টি বিমান, ২৪৪ টি ট্যাঙ্ক, ৪ টি রণতরী, ২ টি সাবমেরিন, ১৪ টি গানবোট ও অন্যান্য ১২ টি যান ধ্বংস হয়েছিল। অপরদিকে ভারতের ৪৫ টি বিমান (নৌবাহিনীর একটি বিমানসহ), ৭৩ টি ট্যাঙ্ক, ১ টি রণতরী ধ্বংস হয়েছিল। যুদ্ধে শুধুমাত্র ভারতীয় সৈন্যের নিহত, আহত ও নিখোঁজের সংখ্যাটা ছিল প্রায় ১০,৬৩৩ জন। এর মধ্যে নিহত ২৩০৭ জন, আহত ৬১৬৩ জন ও নিখোঁজ ছিলেন অন্তত ২১৬৩ জন। 
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিংস্র নাৎসি বাহিনী ব্যাপকহারে লেখক, অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসকদের ধরে ধরে হত্যা করত। অনুরূপভাবেই ইয়াহিয়ার জল্লাদ বাহিনী বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে জাতির মেরুদণ্ডকে পঙ্গু করে দিতে চেয়েছিল। প্রশ্ন ওঠে বুদ্ধিজীবীরা তাদের মূল টার্গেট কেন হয়ে উঠেছিল? আসলে ইয়াহিয়া জানত স্বাধীন বাংলার মনস্তত্ত্ব তৈরির পাশাপাশি বুদ্ধিজীবীরা আপন প্রত্যয়ে অবিচল থাকেন, শত প্রতিকূলতা ও বৈরিতার মধ্যে থেকেও খানিকটা সুযোগ পেলেই তাঁরা নিজের মূর্তি ধারণ করেন। কাজেই নববিধান প্রবর্তন করবার জন্য এঁদের হত্যা না করে উপায় ছিল না। বলা ভাল, সন্ত্রাসের রাস্তা খুব দ্রুত প্রশস্ত করতেই তাদের এই অভিযানের সূত্রপাত। 
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে যখন তাদের সবকিছু থাকবার পরেও যেন কিছুই ছিল না– ভাষা ছিল না, গান ছিল না, ফসল ছিল না, দেশ ছিল না, অধিকার ছিল না। আজ তাদের সব আছে– বাংলা ভাষা আছে, গান আছে, জমি আছে, ফসল আছে, মানচিত্র আছে, সর্বোপরি তাদের আছে প্রিয় দেশ– বাংলাদেশ। কিন্তু, দুঃখের বিষয় মুক্তিযুদ্ধের পঞ্চাশ বছরে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক যে চর্চার সূত্রপাত হয়েছে সেই প্রচার থেকে অনেকটা দূরে রয়ে গেছেন বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক তাজউদ্দিন আহমেদ (১৯২৫–১৯৭৫), শেরে বাংলা ফজলুল হক (১৮৭৩–১৯৬২) বা মৌলানা ভাসানী (১৮৮০–১৯৭৬)–র মতো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বরা। তাঁরা কি চিরকালই অগোচরে থাকবেন? ইতিহাস কি তাদের দূরে ঠেলে দেবে?–এ প্রশ্ন থেকেই যায়। 
চব্বিশ বছরের লজ্জাহীন লাঞ্ছনা ও সীমাহীন শোষণের বিরুদ্ধে অগণিত প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশের মানুষ ছিনিয়ে নেয় তাদের নিজের দেশ–বাংলাদেশকে। সূচনা হয় শান্তি এবং প্রগতির নতুন এক সকাল। স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষজন স্বাধীনতার জন্য একবার নয়, দুইবার লড়াই করেছে–প্রথমবার সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আর দ্বিতীয়বার স্বৈরাচারী পাকিস্তানি খান সেনাদের বিরুদ্ধে। প্রথমটি ছিল ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই, আর দ্বিতীয়টি জাতিসত্ত্বার লড়াই। 

আকর্ষণীয় খবর