শিখর কর্মকার: অনেকটা কেরানির মতো জীবন তাঁর। সকালে কোনওরকমে মুখে দু মুঠো ভাত গুঁজে বেরিয়ে পড়েন কর্মস্থলের উদ্দেশে। অফিসপাড়ায় বড় বড় থামওয়ালা পুরনো দিনের বাড়িটার নীচে টেবিল–চেয়ারের ধুলো ঝেরে বসে যান নিজের কাজে। খটাখট শব্দে পাতার পর পাতা টাইপ করে যান তিনি। অধিকাংশই মামলার কাগজপত্র আর চিঠি। বাকি থাকা কাজ ফাইলবন্দি করে দিনের শেষে ফিরে আসেন মেসবাড়িতে, শহরে নিজের মাথা গোঁজার জায়গায়। বাতাসে পুজোর গন্ধ আসতেই মাঝে মধ্যে দেশের বাড়ির কথা মনে পড়ে যায় তাঁর। শরিকি বাড়ির দুর্গাপুজোর একজন শরিক তিনি। অফিসপাড়ায় পুজোর ছুটি শুরু হতেই ছুটে চলে যান দেশের বাড়িতে। রাত জেগে নিজের জমানো কাগজপত্র কেটে সাজান দুর্গাপুজোর অঙ্গন। নাম না জানা কল্পিত এই টাইপিস্টের ভাবনায় বেহালা ফ্রেন্ডস‌–‌এর মণ্ডপ সাজিয়েছেন শিল্পী বিশ্বনাথ দে। বিরাট এক টাইপ মেশিনের সামনে এক মানুষের অবয়ব বুঝিয়ে দিচ্ছে টাইপিস্টের কথা। কাজের চিন্তা শেকড় রূপে নেমে এসেছে তাঁর মাথার ওপর। পুরনো স্থাপত্যে তৈরি বাড়ির থামগুলোর পাশে টাইপ করে চলেছেন টাইপিস্টরা। দড়ি আর খড়ে তৈরি হয়েছে টাইপিস্টের অবয়বগুলো। টাইপ মেশিনের সামনে স্তূপাকৃতি ফাইল। গর্ভগৃহ সাজানো হয়েছে কাগজ কেটে তৈরি নানা শিল্পকর্মে। সেখানেই শিল্পী অরুণ পালের তৈরি দুর্গা। আবার বিকশিত হতে না পারায় শিশুর মধ্যে সুপ্ত প্রতিভা ধ্বংস না করার জন্য আবেদন জানিয়ে বোসপুকুর শীতলামন্দিরে মণ্ডপ তৈরি হয়েছে শিল্পী দেবাশিস গুছাইতের ভাবনায়। বীজের সঙ্গে এই অবস্থার সামঞ্জস্য খোঁজার চেষ্টা হয়েছে এখানে। বীজ যেমন সঠিক পরিবেশ না পেলে পূর্ণ বিকশিত হতে পারে না, শিশুদের ক্ষেত্রেও এটা ঘটে। শিশুর মধ্যে সুপ্ত সম্ভাবনাকে খুঁজতে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কাঠির মাধ্যমে বোঝাবার চেষ্টা হয়েছে এখানে। মণ্ডপের ভেতরের ছাদ বইয়ের পাতায় ঢেকে গেছে। শিশুর পড়াশোনার সঙ্গী সামগ্রীগুলোকে বেছে নেওয়া হয়েছে মণ্ডপসজ্জার কাজে। আড়াই লক্ষ পেন্সিল, ১ লক্ষ লেন্স, জ্যামিতি বাক্সের চাঁদা, স্কেল প্রভৃতি লেগেছে এই কাজে। জ্ঞানজ্যোতির বিপরীত দিকে বিশাল ডানাওয়ালা পাঁচ শিশুকে ছুটে যেতে দেখা যাবে। এই পুজোর দুর্গা প্রতিমাটি গড়েছেন শিল্পী পরিমল পাল। অন্যদিকে গ্রামবাংলার এক সাধারণ নারীর বিভিন্ন রূপের মধ্যে উমাকে খুঁজে সিঁথি অগ্রগামী সঙ্ঘের পুজো আঙিনা সেজে উঠেছে শিল্পী গৌরাঙ্গ বিশাইয়ের ভাবনায়। কোথাও পদ্ম ও সাপলা ভরা জলাশয়ের মাঝে এক নারীর মূর্তি স্থাপন করে রুজি রোজগারে ব্যস্ত গ্রাম্য নারীর মধ্যে উমাকে খোঁজার চেষ্টা করেছেন শিল্পী, আবার কোথাও মাটির মূর্তি ও ম্যুরালে তাঁর ভাবনার বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছেন। দুটিই এখানে এক সাধারণ নারীরূপী। অসুর তাঁর ওপরে। চারধারে উড়ছে সাদা পায়রা। খড়, বাঁশ, মাটির মণ্ডপে রয়েছে গ্রামবাংলার আলপনার ঝলক।

বেহালা ফ্রেন্ডসের মণ্ডপ। ছবি: প্রতিবেদক ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top