চাকরি সূত্রে সুইডেনে আসাটা একেবারেই কাকতালীয়। কিন্তু প্রথম দিন সুইডেনে পা দিয়েই মনে হয়েছিল, ইয়োরোপটা এবার হাতের মুঠোয়। নিয়ম অনুযায়ী ইয়োরোপের যে কোনও একটি দেশের কাজের ছাড়পত্র আসলে বাকি দেশগুলোতে যাওয়ারও চাবিকাঠি। এই সুন্দর বসুন্ধরায় যতগুলো দেশে আপনি চরম নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন, তাদের মধ্যে অধিকাংশই ইয়োরোপে।
এবার আসল কথায় আসা যাক। একটি সপ্তাহে পর পর তিনদিন ছুটি আর তার সঙ্গে শনি–‌রবি যোগ করে পাঁচ দিন— ব্যস, হাতির পাঁচ পা। কেটে ফেললাম টিকিট। গন্তব্য নরওয়ে— নিশীথ সূর্যের দেশ। সেই সঙ্গে লুকিয়ে আছে রহস্যময় প্রকৃতি। টিকিট কাটার আগে অবশ্য এক প্রস্থ ঝগড়া হয়ে গেল স্ত্রীর সঙ্গে। তার ইচ্ছে সুইৎজারল্যান্ড। কিন্তু বরাবরই আমার পছন্দের তালিকার ওপরের দিকে ছিল নরওয়ে আর আইসল্যান্ড। এখানকার সবচেয়ে সুন্দর জেলা রমসডাল। ঠিক করলাম রমসডালেরই কোনও একটি জায়গায় আমরা যাব।
আমরা ছিলাম দক্ষিণ সুইডেনে। সেখান থেকে ওসলো হয়ে যেতে হবে। গোটা পৃথিবী থেকে পর্যটকরা নরওয়েতে আসেন ফিয়র্ড দেখতে। যার বাংলা অর্থ হল সমুদ্রের খাঁড়ি। নরওয়েতে প্রায় প্রতিটি জেলা বা প্রদেশে বিস্তীর্ণভাবে ছড়িয়ে আছে এই ফিয়র্ড। দু’‌দিকে উঠে গেছে খাড়াই পাহাড় আর মাঝে চওড়া হ্রদের মতো এক টুকরো নীল জলরাশি। রমসডালের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা হল অন্দাল্সনেস‌‌। কিন্তু মজার বিষয় হল, এর কাছাকাছি কোনও বিমানবন্দর নেই। ঠিক করলাম যাব ট্রেনে চড়ে। যাঁরা হয়ত মনে মনে ভাবছেন যে ট্রেন মানে খরচ হয়ত একটু কম হবে, তাঁদের জন্য বলি, ইয়োরোপে ট্রেনে চড়া মানে বিলাসিতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ট্রেনের ভাড়া বিমানের ভাড়ার দ্বিগুণ। নরওয়েতে যে ট্রেন কোম্পানি রেলযাত্রা পর্যবেক্ষণ করে, তার নাম এন এস বি। অন্দাল্সনেস‌‌ উত্তর–‌‌পশ্চিম দিকে। অর্থাৎ ওসলো থেকে গেলে নরওয়ের মূল ভূমিকে আড়াআড়িভাবে অতিক্রম করে যেতে হবে। ওসলো থেকে প্রথমে যেতে হবে ডম্বাস। ডম্বাস থেকে অন্দাল্সনেস‌‌‌। এখানে বলে রাখি, ডম্বাস থেকে অন্দাল্সনেস‌‌ ‌যাত্রাপথটি হল এন এস বি-‌র সবথেকে সুন্দর রুট— যেটি নিয়ে বি বি সি–‌‌ও একটি তথ্যচিত্র বানিয়েছে। নির্ধারিত তারিখে আমরা প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়লাম নরওয়ের উদ্দেশে।
সঙ্গে নিলাম অনেক কিছু। কিছুটা শুকনো করে কষা মুরগির মাংস, পরোটা, পাউরুটি, ছাতা, অল-ওয়েদার জ্যাকেট, ট্রেকিং সু, ট্রেকিং স্টিক, টর্চ, ছুরি, ক্যামেরা লেন্স–‌সহ ডি এস এল আর এবং কিছু শুকনো খাবার। যদিও ইয়োরোপের বৃষ্টির জন্য ছাতা একবারেই আদর্শ নয়। এখানে চাই হুডওলা লম্বা জ্যাকেট। কারণ হল বেয়াড়া হাওয়া।
রাত বারোটায় বাস ছাড়ল হেলসিনবার্গ বাস টার্মিনাল থেকে। দোতলা বাসে চেপে আমরা চললাম ওসলো। হেলসিনবার্গ থেকে বাসটি গেল গোথেনবার্গ। এর পর সুইডেনের প্রান্তিক সীমানার কাছাকাছি চলে এলাম আমরা। তখন প্রায় রাত সাড়ে তিনটে। অদ্ভুতভাবে লক্ষ্য করলাম বাইরে একটা উজ্জ্বল আলো। সূর্য অস্ত যাওয়ার প্রাক্‌–‌মুহূর্তের আলো। বাসে সবাই প্রায় ঘুমিয়ে কাদা। একটা অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ। যার বুক চিরে বেরিয়ে যাচ্ছে অবাধ্য গতি। দু’‌দিকে পাহাড় আর তার মধ্যে দিয়ে আলো–‌আঁধারির পথ। ক্যামেরাটা বার করলাম। সকাল ৬টায় আমরা পৌঁছে গেলাম ওসলো। সেখান থেকে আমাদের ট্রেন দুপুর আড়াইটের সময় ছাড়বে। ব্রেকফাস্টের শেষ পাউরুটিটা চিবিয়েই সোজা হাঁটা দিলাম ওসলো স্টেশনের বাইরে। স্টেশনেই ব্যাগ রেখে দিলাম একটি স্বয়ংক্রিয় লকারে। এগুলো খোলে কোড দিয়ে। কোড মনে রাখার জন্য মোবাইলে ফটো তুলে নিলাম। ওসলো স্টেশনের বাইরে বেশ কিছুটা রাস্তা হেঁটে আপনি পাবেন অর্কেসুস ক্যাসেল, যেটা তৈরি করেছিলেন রাজা পঞ্চম হক্কন। উদ্দেশ্য ছিল দুটো— একটি সুরক্ষিত দুর্গ এবং এক দুর্ভেদ্য জেল। যেখানে আটকে রাখা হত যুদ্ধবন্দীদের। এখানে হঠাৎ ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনলেও আপনি অবাক হবেন না। কারণ ইয়োরোপের ফোর্টগুলোতে এরকম রেকর্ড করে রাখা শব্দ প্রায়ই শোনা যায়। এই ফোর্ট থেকে দেখতে পেলাম একটি জাহাজ। আসছে ডেনমার্ক থেকে। এটিও একটি বিকল্প রুট। ক্রুইজে চেপে ঘোরা যায় উত্তর ইয়োরোপের তিনটি প্রধান রাষ্ট্র— সুইডেন, নরওয়ে আর ডেনমার্ক।
ফোর্টের বেশ কিছু ফটো তুলে চললাম ভাইকিং মিউজিয়াম। এখানে দেখা যাবে বিভিন্ন ধরনের ছোট–‌বড় জাহাজ। যদিও ভাইকিংদের পুরো ব্যাপারটাই কল্পনার আলপনা, তাও আপনাকে টেনে নিয়ে যাবে মাঝসমুদ্রে— যেখানে শুনতে পাবেন জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর সঙ্গে ভাইকিংদের হো হো হো করে গান। পুরো মিউজিয়ামটা ঘুরে আবার ফিরে এলাম ওসলো স্টেশনে। তখন ঘড়িতে প্রায় দুপুর দেড়টা। লাঞ্চে সেই কষা মুরগির মাংস আর হাতে করা পরোটা।
তখন কাঁটায় কাঁটায় আড়াইটে, তেরো নম্বর প্লাটফর্ম ছেড়ে গেল ডম্বাস যাওয়ার ট্রেন। এই সমস্ত টিকিট কাটতে হয় এন এস বি-‌র ওয়েবসাইট থেকে। টিকিট কাটতে হবে অন্তত দেড় মাস আগে। এই পুরো ট্রেনযাত্রাটাই অসাধারণ। যেহেতু এই ট্রেনগুলো সিনিক ট্রেন, সেহেতু ট্রেনের দু’‌দিকের কাচ অনেক চওড়া। যেখান থেকে দৃষ্টি সজোরে আছড়ে পড়বে বাইরের মনোরম প্রকৃতিতে। ট্রেন চলছে প্রায় ১৪০ কিমি গতিতে। বাইরে মাঝে মাঝেই দেখতে পাচ্ছি ঝর্না, খরস্রোতা নাম না জানা নদী আর দুরন্ত পাহাড়। বেশ বুঝতে পারছি, একটা পাহাড় থেকে আর একটা পাহাড়ে যাচ্ছে আমাদের ট্রেন। চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। শুধু সবুজ। খোলা মাঠের মতো ঢাল আর সেখানে ইয়োরোপীয় কায়দায় বানানো ছোট্ট ছোট্ট ঘর। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টার পর এল ডম্বাস। এবার যাব রওউমা লাইন ধরে। নরওয়ে তথা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রেলপথ। এই ট্রেন একটু ধীরগতিতে যায়। অপেক্ষাকৃত ছোট ট্রেন। এখানে ইংলিশে বিবরণ দেওয়া হয় পুরো যাত্রাপথের। ট্রেন চলা শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে দেখা দিলেন তিনি। ট্রলভ্যাগেন পাহাড়। ইয়োরোপের সবচেয়ে উঁচু উল্লম্ব পাহাড়। এই পাহাড়ে চড়তে গিয়ে প্রায়ই মৃত্যুমুখী হন পর্বতারোহীরা। প্রথম সফল আরোহণ হয় ১৯৬৫ সালে। এর পরে ধীরে ধীরে জমেছে অনেক ঘটনা। বেশ অনেকক্ষণ বাদে আড়াল হল সেই বিশাল পাহাড়। বত্রিশটি রেল ব্রিজ ক্রস করতে হবে এ পথে। এর মধ্যে বিখ্যাত হল কাইলিং ব্রিজ। যে ব্রিজটি বানাতে সময় লেগেছিল প্রায় ১০ বছর। সন্ধে সাড়ে সাতটার সময় পৌঁছলাম অন্দাল্সনেস‌‌‌। তখন স্টেশনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে ফ্রাম কোম্পানির বাস। বাসে চেপে আমাদের গন্তব্য জিজার্সেট হোটেল। হোটেলের চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। সঙ্গে করে এনেছিলাম দিন কয়েকের মতো কাঁচা বাজার। এখানে প্রায় সব হোটেলেই রান্নার ব্যবস্থা থাকে। রাতের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। রাত কিছুতেই হচ্ছে না। 
সব সময়েই সূর্যের আলো। কফি নিয়ে বসলাম বারান্দায়। চারদিকে পাহাড় আর সামনে একটা নীল হ্রদ। সেখানে আবার কিছু ছোট নৌকো বাঁধা রয়েছে। পাশে একটা ভেড়ার ফার্মও রয়েছে। পুরো ব্যাপারটাই ছবির মতো। পরের দিন ঘুম থেকে উঠে একটা শব্দ শুনতে শুনতে বেরোলাম বাইরে। দেখলাম একটা ছোট্ট ঝর্না। হোটেল থেকে বিশ পা হেঁটেই। ঠিক ‌৯টায় আবার তৈরি হয়ে গেলাম। ফার্ম বাসে চেপে যাব রাম্পস্ট্রেকেন। সেখানে ট্রেকিং করে উঠব রাম্পস্ট্রেকেন ভিউ পয়েন্টে। এই ভিউ পয়েন্টটিতে যেতে গেলে পরতে হবে ট্রেকিং শু, আর সঙ্গে নিতে হবে ২ লিটার মতো জল। প্রায় ৫৮০ মিটার চড়াই উঠতে সময় লাগল আড়াই ঘণ্টা। এর পরেও আর একটি পয়েন্ট ছিল, যেটা হল নেসাক্সলা। এটি ৭৮৫ মিটার উঁচুতে। রাস্তা দুর্গম হলেও ওপর থেকে চারদিকের সেই দৃশ্য অসাধারণ। রমস্ডালের নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে যেন যত্ন করে সাজিয়েছে প্রকৃতি। 
এখানে একটি ছোট ঝুলন্ত ওয়াকিং ব্রিজ আছে। সেখান থেকেই দেখতে পাবেন পুরো অন্দাল্সনেস‌‌‌ আর পারিপার্শ্বিক ফিয়র্ডকে।
সাবধানে নিচে নেমে এসে একটা লোকাল শপিং মলে ঢুকলাম। কী কিনলাম জানেন? আতলান্তিক সালমন মাছ। যেটা এখানে সবচেয়ে বিখ্যাত। পরের দিন সকাল সাতটায় আবার ফ্রাম বাস যাবে গেরিঙ্গার ফিয়র্ড। এটি নরওয়ের সবচেয়ে সুন্দর ফিয়র্ড। বাস নম্বর ২২০ আমাদের নিয়ে গেল গেরিঙ্গার ফিয়র্ডে। মাঝপথে থামলাম ট্রল্সট্রিগনে। 
বেশ কয়েকটা ছবি তুলে আবার বাস চলল গেরিঙ্গার দিকে। গেরিঙ্গার ফিয়র্ডয়ের ভিউ পয়েন্টটি হল দাল্‌স্নিব্বা। চারদিকের ঝর্না আর উঁচু পাহাড় তৈরি করছে এক অসাধারণ প্রাকৃতিক ভাস্কর্য আর মধ্যিখানে নীল জল। উপত্যকার সৌন্দর্য কতটা গভীর হতে পারে— এখানে না এলে সেটা বুঝতেই পারতাম না। গেরিঙ্গার ফিয়র্ডে ক্রুইজের ব্যবস্থাও আছে, চাইলে পুরো ফিয়র্ডটা এক চক্কর দিয়ে আসতে পারেন ক্রুইজে চেপে। ২৬০ মিটার গভীর এই ফিয়র্ডটি ১৫ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত।
যাঁদের পাহাড়ি রাস্তায় বাসে যেতে অসুবিধে, তাঁরা ভাড়া করতে পারেন এভিস রেন্টাল কার। একদিনের জন্য খরচ হবে ১০,‌০০০ টাকার মতো সব নিয়ে।
একই পথে আবার ফিরে এলাম আমাদের হোটেলে। এর পরের দিনের ঘোরাটা একটু অন্য। একটু অ্যাডভেঞ্চার টাইপের। একটা লোকাল ট্যাক্সি ভাড়া করে আমরা রওনা দিলাম আতলান্টিক ওশান রোডের উদ্দেশে। এটিকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক রোড। অন্দাল্সনেস‌‌‌ থেকে দূরত্ব ৯৯ কিমি। এই রাস্তার চারদিকে সমুদ্র। আর সেই সমুদ্রের উত্তাল জলরাশি ভিজিয়ে দিতে পারে আপনার গাড়িও। যদিও আমাদের সেই সৌভাগ্য হয়নি। এবার ফেরার পালা। দুপুর আড়াইটেতে ট্রেন ধরে চললাম ডম্বাস। সেখান থেকে একইভাবে ফিরে এলাম দক্ষিণ সুইডেনে। এখন মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পারি, নরওয়ের ফিয়র্ড।

ব্যা ক প্যা ক 
যাওয়া–‌‌থাকা: কলকাতা থেকে ওসলো যেতে হবে বিমানে। জেট এয়ারওয়েস, এয়ার ফ্রান্স, এমিরেটস, এয়ার ইন্ডিয়া ইত্যাদি সংস্থার বিমান রয়েছে। ওসলো থেকে ট্রেনে ডম্বাস, সেখান থেকে ট্রেনে অন্দাল্সনেস‌‌‌। 

ট্রেন বুকিং:‌ www.nsb.no/‌e‌n‌;‌ ফ্রাম বাসের সমস্ত রুট দেখুন:‌ frammr.no/Ruter/Resultat;‌ এভিস কার 
বুকিং:‌ www.avis.se‌‌‌‌‌‌
আরও জানতে ‘‌আজকাল সফর’‌ বিজ্ঞাপনে নজর রাখুন।‌‌‌‌


ছবি:‌ শীর্ষেন্দু সেন‌

জনপ্রিয়

Back To Top