মঞ্জুশ্রী রায়চৌধুরি

 

ইচ্ছে খুব, অথচ লেখা আসছে না। ঠিক তখনই একটি পালক পড়ল কোলে, কোত্থেকে যেন উড়তি হাওয়ায় দুলতি–‌দুলতি এল। একদম চাঁচাছোলা কলম–‌কাটিং পালক, ডগায় লাল কালি। আহা, সত্যি এমন হলে কেমন হত জানি না, তবে ভিতরপুরে ধুন্ধুমার ঘটে যেত— তা স্পষ্ট। এ সব আলসি মনের চালসি কথা জানি। কত ইচ্ছেকুঁড়ি পড়ে পড়ে মরেই যাচ্ছে মনে.‌.‌.‌ এই ‘‌কলম–‌কলম’‌ কল্পনাতে তবু সাক্ষাৎ ঘটল লেখার। মোটে এক রাত শান্তিনিকেতনে থাকার উল্লাসেই যদি উজাগর হওয়া, তবে দুদিন পেলে.‌.‌.‌
চাওয়া আমার বেশি ছিল না। শুধু রবীন্দ্র–‌স্পর্শধন্য ধূলিকণাটুকু ছুঁয়ে ম্যাজিক আলো হতে চেয়েছিলাম, পেয়েছিলামও.‌.‌. জানাই ছিল পাব।
অন্য একশো বেড়ানোর সঙ্গে শান্তিনিকেতনের মিল নেই, অথচ স্টেশনে পা রাখতেই তোলপাড় বুক। তবু শপথ নিয়েছি— এই বৃত্তান্তে ‘‌রবীন্দ্রনাথ’‌ উদ্দীপনায় থাকলেও উচ্চারণে থাকবেন না। ‘‌তিনি’‌ বড় কঠিন নাম। যে নক্ষত্র দূরত্বে বাসা বেঁধে আছেন, তা‌তে প্রান্তবাসী আমি শুধু আলগোছের ছোঁয়াটুকু রাখতে পারলেই ধন্য। আপাতত বোলপুর নামি।
বেলা বেশি না। রোদ ফুটফুটে স্টেশন, ট্রেন আর ঝাঁ–‌চকচকে পারিপার্শ্বিক মুগ্ধতায় মুখ আমার বন্ধ, ওদিকে স্টেশন পুলিসে ছয়লাপ। আন্দাজ ছিল এমনই কিছু হবে, কেননা রাজ্যপাল এসেছেন প্রোগ্রাম ইনঅগুরেট করতে। এসেছেন আমারই ট্রেনে। গন্তব্যও এক— ‌সৃজনী শিল্পগ্রাম। ১৫ একর জায়গা জুড়ে অপরূপ সৌকর্যের সাজ পড়েছে এলাকায়,‌ লোকসংস্কৃতি উৎসব। প্রোগ্রাম আছে আমাদেরও। কিন্তু উত্তর-‌পূর্ব ছাড়াও আছে গুজরাট, রাজস্থানের কুশীলব। সন্ধে হতেই অনুষ্ঠান শুরু। আমি থ!‌ কা‌র চেয়ে কার ড্রেস ভাল, কার প্রেজেন্টেশন, কার চোখ ধাঁধানো অ্যাপ্রোচ!‌ সেট, লাইট, মিউজিক নিয়ে প্রাপ্তির বাইরে প্রাপ্তি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো কেটে গেল ঘণ্টা। ছবি নিলাম, শিল্পীদের সঙ্গে পরিচিত হলাম, সব একসে বড়কর এক। দু‌দিনের অনুষ্ঠানের জন্য সাত দিন ধরে শ’‌খানেক শিল্পী নিয়ে রাজসূয় যজ্ঞ। সবার আসা–‌যাওয়া, থাকা–‌খাওয়ার ব্যবস্থা এতটাই অর্গানাইজড যে ক্ষোভ তৈরির জায়গাই নেই।
এত সফর কাহিনী দেখি। কিন্তু অন্তরের ঝুলকালি ঝাড়ে আমাদের যে বৈভবি ভারত— সে সফরকথা কই?‌ এ ধন চাইলেও জোটে না। দেশজ রূপের ছবিতে যা দেশজ চোখে চাইতে বলে। সারা দেশ জুড়ে চলে এ সব প্রায়শই। খালি ইচ্ছুক মন মুখিয়ে রাখলেই হল।
শীত জম্পেশ, প্রাণ সঁপে গেছে অনুষ্ঠানে। ঢোল বাজিয়ে ও শরীরকে শূন্যে ছুঁড়ে ঘুরে ঘুরে মণিপুরি ঢোলচোলম, গুজরাটি ফোক ডান্সে ছিটকে আসা নারকেল খালি মাথায় ফাটানো বা আট/‌দশটি ঘড়া নিয়ে রাজপুত রমণীর গুনে গুনে তেত্রিশটি ঘুমর.‌.‌.‌ দেখতে দেখতে শীত জাপ্টে নিচ্ছিল গা। বাহুল্য নেই, বরং সমগ্র পরিবেশনায় জড়িদার কসরতটুকু জড়িয়ে আছে নিপুণভাবে। নিজেদের না জানা দেশজ–‌অপরিচয়কে ধিক্কার দিলাম মনে ‌মনে।
প্রোগ্রাম শেষ, আমরা বাদ্যিকাঁসি গুটিয়ে নিয়েছি। পরদিন ট্রেন, তার আগেই ছাতিমতলা–‌আম্রকুঞ্জ, শ্যামলী–‌দেহলী.‌.‌.‌ নাঃ, এক ইঞ্চিও ছাড়া যাবে না।
কুপকুপে আঁধার। সূর্য চোখ মেলবার আগেই তার সঙ্গে চোখ মেলাবার প্রত্যাশায় বাইরে এসেছি, কিন্তু অসময়ে অচেনা মানুষ দেখে নেড়ি কুকুরের সমাজ চেতনার ভৌ ভৌ এমন ছিটকে উঠল যে পালিয়ে বাঁচি। ধীরে রঙ লাগল আকাশে.‌.‌.‌ বেরোলাম। দেখি বীরপুঙ্গব কুণ্ডলি পাকিয়ে কাদা।
কিন্তু নেড়ির ক্ষমতা কদ্দুর?‌ পাগলামির বার্তা রাখা থাকে ভোরের কাছে— প্যাশনেটদের পাইয়ে দেয় ঢের। শ্রীনিকেতনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে পড়ল মাঠ। বিশাল পাঁচিলে ঘেরা। শুধু পথ আর পাঁচিল— বহুক্ষণ। হঠাৎই এক জায়গার পাঁচিল দেখি ভাঙা। মধ্যে ধু ধু মাঠ, মাঠে প্রজাপতি, ফুলঝাড়ু ফুলের ঢেউ, বড় বড় গাছ। পাতার ফাঁকে, মাঠের জমা জলে, মোষের পিঠে, সাদা বকের ডানায় ‘‌ভোর’‌ হলুদ মেখে স্বর্গীয়তায় ভাসছে.‌.‌.‌ উপভোক্তা শুধু আমি।
এক সমুদ্দুর সূর্য.‌.‌.‌ একটি সূর্যোদয় হলই না হয় মিস।
বেলা বাড়ল, চলেছি বিশ্বভারতীর দিকে। সময়টা শীতের শেষ। ফুলের কথা জানাই ছিল। তা বলে এত!‌ তার উদয়ন–‌শ্যামলী–‌দেহলী গৃহগুলি, আম্রকুঞ্জ বা উপাসনাগৃহ ছেড়েই দিলাম, অধিকাংশ বাড়িগুলিও ফুলোচ্ছ্বাসের যে তারে বাঁধা, তাতে দিব্যি পাশ দিয়ে যেতে যেতে গান শোনা যায়। শুধু এ কারণে শীতকালের শান্তিনিকেতন প্রিয় তালিকায় জায়গা নিয়ে নেবে। এ ছাড়া আবাসিকদের হাতে সেজে ওঠা আবাসনের শিল্পছবি তো আছেই। কলাভবনের ছাত্রছাত্রীদের ক্রিয়েটিভ সত্তাও কী ভীষণভাবে মুখর!‌ শিল্প মনস্কতার সাক্ষর তাদের হস্টেলগুলির প্রতি ইঞ্চিতে। একটি শুধু সাদা–‌কালোর ওপর, এক্সপেরিমেন্টাল। হনুমান–‌ময়ূর–‌হরিণ–‌পাখি–‌তালগাছ, এমনকি গরুড় পাখি অবধি দিয়ে বাড়ির বহিরঙ্গটি আঁকা। এটি এতই মৌলিক যে ব্যাখ্যা দিয়ে ছুঁতে পারব না। চর্মচক্ষে দেখতে হবে আর বিস্ময়কে নিতে হবে থম ধরা বক্ষ পেতে। এরকম অন্তত গোটা পাঁচেক আছে, যার একের সঙ্গে অন্যের মিল নেই। কোনওটি খড়ের চাল ছাওয়া মাটির দাওয়া‌অলা নকশি কাঁথার মাঠ, কোনওটি ভাস্কর্যের অফুরান উচ্ছ্বাসে কেড়ে নিচ্ছে মনোযোগ।
সাফসুতরো এই বেড়ানোয় পুষ্টি পেল বোধ, শুশ্রূষা নিয়ে ফিরলাম, মুছে নিত্যদিনের গ্লানি। ‌‌

ব্যা ক প্যা ক
যাওয়া:‌ হাওড়া ও শিয়ালদা থেকে বোলপুর যাওয়ার একাধিক ট্রেন রয়েছে। হাওড়া থেকে ১৩০১৭ গণদেবতা এক্সপ্রেস ধরে সপ্তাহে যে কোনও দিন বোলপুর যেতে পারেন। ভাড়া:‌ সি সি–‌‌ ২৯০ এবং ২এস–‌‌‌ ৮০ টাকা। এ ছাড়াও হাওড়া থেকে ‌১২৩৩৭‌ শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস, ‌১২৩৪৭‌ রামপুরহাট এক্সপ্রেস, ১২০৪১‌ শতাব্দী এক্সপ্রেস, ৫৩০৪৭‌ বিশ্বভারতী প্যাসেঞ্জার, ১৩০২৭‌ কবিগুরু এক্সপ্রেস ইত্যাদি। শিয়ালদা থেকে রয়েছে ‌১৫৬৫৯‌ কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস, ১৩১৪৭‌ উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস, ১২৩৪৩‌ দার্জিলিং মেল, ১২৩৭৭‌ পদাতিক এক্সপ্রেস ইত্যাদি। স্টেশন থেকে রিকশা চেপে শান্তিনিকেতন পৌঁছে যেতে পারেন। কলকাতা থেকে সরাসরি বাস বা গাড়িতেও শান্তিনিকেতন যাওয়া যায়।
থাকা:‌ রাজ্য পর্যটন দপ্তর পরিচালিত ট্যুরিস্ট লজ সেখানে আছে। যোগাযোগের জন্য ফোন করুন‌‌ (‌০৩৪৫৩) ‌২৫২-‌৩৯৮/‌৬৯৯। এ ছাড়াও অনেক বেসরকারি থাকার জায়গা পাবেন।
আরও জানতে ‘‌আজকাল সফর’‌ বিজ্ঞাপনে নজর রাখুন।‌‌‌‌‌


ছবি: দীপক গুপ্ত, মঞ্জুশ্রী রায়চৌধুরি

জনপ্রিয়

Back To Top