অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: গগনচুম্বী সাতটি বহুতলের আবাসন ‘‌আরবানা’ প্রবল ঘূর্ণিঝড় আমফানে লন্ডভন্ড হলেও, মানসিকভাবে পরিস্থিতি অনেকটাই সামলে নিয়েছেন আবাসিকেরা। এখনও আবাসনের চত্বর জুড়ে বহু জায়গায় ছড়িয়ে আছে ভেঙে–যাওয়া জানলার কাচের টুকরো। ঝড়ে উপড়ে গেছে অসংখ্য গাছ। বুধবার সন্ধেয় প্রবল ঝড় বয়েছে আবাসিকদের মনেও। সেই অভিঘাত সামলাতে অনেকে রাত জেগেছেন। শুক্রবার কয়েকজন আবাসিকের সঙ্গে কথা বলে মনে হল, ভয়–ভীতির আলোড়ন অনেকটাই সামলে উঠেছেন তাঁরা।
বাইপাস–সংলগ্ন রুবি হাসপাতাল ছাড়িয়ে আরও অনেকটা পূর্ব দিকে গেলে একদা যে অঞ্চল মাদুরদহ বলেই পরিচিত ছিল, এখন সেটা ‘‌আরবানা কমপ্লেক্স’ বলেই বিখ্যাত। শুধু কলকাতার সর্বোচ্চ সাতটি বহুতলের সমাবেশ বলেই নয়, টালিগঞ্জের বহু তারকা নতুন বাসস্থান হিসেবে নাম কিনেছে ‘‌আরবানা’। এখানে থাকেন পরিচালক অরিন্দম শীল থেকে পরিচালক রাজ চক্রবর্তী। রাজের সঙ্গে থাকেন তাঁর স্ত্রী, বাংলা ছবির জনপ্রিয় নায়িকা শুভশ্রী। থাকেন ছোটপর্দার ‘‌দিদি নাম্বার ওয়ান’‌ রচনা ব্যানার্জি। নায়িকা পায়েল, নায়ক হিরণ— অনেক নাম, অনেক তারকা। তাই ‘‌আরবানা’যে তারকাখচিত আবাসন, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
মোট সাতটা টাওয়ারের পাঁচটি ৪৫ তলা করে। বাকি দুটো তুলনায় একটু নিচু। ৪৫ তলার একটি টাওয়ারের ৪৪ তলায় থাকেন অরিন্দম শীল। বুধবার সন্ধেয় প্রায় তিন ঘণ্টার অভিজ্ঞতা যে ভয়ঙ্কর, তা নিয়ে কোনও দ্বিধা নেই খ্যাতিমান পরিচালকের। অরিন্দম বললেন, সে এক তুলকালাম কাণ্ড। পৃথিবী যেন ভেঙে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড়ের এত তীব্র গতি, দরজা–জানলায় এমন ভয়ঙ্কর শব্দ যে মাথা ঠিক রাখাই কঠিন। তিন ঘণ্টার একটা দক্ষযজ্ঞ ঘটে গেল চোখের সামনে।
শুধু তা–‌ই নয়, অভিজ্ঞতা আরও ভয়ঙ্কর। অরিন্দম বললেন, ‘‌পুরো বাড়িটা তখন ঘূর্ণিঝড়ে দুলছে। আমি দাঁড়িয়ে পড়ে দেখছি, এগোতে পারছি না। আমিও দুলছি। তাকিয়ে দেখি একটু দূরে শুক্লাও (‌অরিন্দমের স্ত্রী)‌ টলছে। আমরা জানি, আমাদের আবাসন সুইং টেকনোলজিতে তৈরি, যাতে ভূমিকম্পে ভেঙে না পড়ে। কিন্তু ‘‌আমফান’‌ যখন কাঁপিয়ে দিচ্ছে ৪৫ তলার এই বাড়ি, তখন ৪৪ তলায় দাঁড়িয়ে বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির কথা তো মনে পড়ছিল না!‌ সত্যি, এক ভয়ঙ্করতম আতঙ্কের অভিজ্ঞতা হল আমাদের।’‌ বললেন অরিন্দম।
প্রচুর ফ্ল্যাটের কাচের জানলা ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে ভেঙে চুরমার হয়ে মাটিতে পড়েছে। বহু ফ্ল্যাটের ফলস সিলিং ভেঙে পড়েছে।  ‘‌আরবানা’‌র পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম বরাবর যে অজস্র গাছ ছিল, সবই প্রায় উপড়ে পড়েছে আমফানে। অরিন্দম বললেন, ‘‌সিঙ্গাপুর থেকে ল্যান্ডস্কেপ প্ল্যান এনে এইসব গাছ বসানো হয়েছিল। সবই প্রায় উপড়ে পড়েছে।’‌
আমফানের সন্ধেয় রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন আরবানায় এক বন্ধুর ৪২ তলার ফ্ল্যাটে। পরে নিজের ৮ তলার ফ্ল্যাটে আসেন। তাঁর ফ্ল্যাটের জানলার অধিকাংশ কাচ ভেঙে গেছে। খুলে গেছে ফলস সিলিং।
ইতিমধ্যেই যতখানি সম্ভব মেরামতির কাজ শুরু হয়েছে আরবানায়। অরিন্দম বললেন, ‌এখন লকডাউনের সময় সব কিছু মনের মতো করে মেরামত করা যাবে না। যে সব ফ্ল্যাটের জানলার কাচ ভেঙে গেছে, সেখানে আপাতত প্লাইউড লাগিয়ে দেওয়া হবে। বোঝা গেল, সৌন্দর্যায়নের কাজ হবে লকডাউন–পরবর্তী সময়ে।
তবে আরবানার এই পরিস্থিতিকে অত্যধিক গুরুত্ব দিতে চান না অরিন্দম শীল। বললেন, ‘‌কলকাতার সর্বত্র যে পরিস্থিতি, সেটা তো আরও ভয়ঙ্কর, আরও যন্ত্রণাদায়ক। এখনও বহু রাস্তায় গাছ পড়ে আছে। অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ নেই, জল নেই। আরবানার আবাসিকেরা তো তেমন সঙ্কটে নেই। এখানে বিদ্যুৎ আছে, জল আছে। আমরা তো ভাল আছি!‌’‌ অরিন্দম বললেন, ‘‌ঝড় তো থেমে গেছে। তাই, চিন্তা কিসের?‌‌’‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top