শিখর কর্মকার—২০১৫ সালে কর্পোরেটের দাপট দেখেছিল শহর কলকাতা। ‘‌‌এত বড় সত্যি’‌–‌র কর্পোরেট প্রচারে সে বছর তুঙ্গে উঠেছিল দেশপ্রিয় পার্কের বড়দুর্গার প্রতি মানুষের আকর্ষণ। জনস্রোতে পঞ্চমীতেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল দক্ষিণের রাজপথ। তার পরের কাহিনী আমাদের সকলেরই জানা।
এ বছর কর্পোরেট দাপটে থিমই বদলে গেল সন্তোষপুর লেকপল্লীর দুর্গাপুজোর। দেশের এক বড় মশলা তৈরির কোম্পানির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে থিমের সঙ্গে বদলে গেল পুজো কমিটির নামও। দুর্গাপুজো কমিটির নামের আগে যুক্ত হল গুজরাটের ওই মশলা কোম্পানির নাম। ২০১৮ সালের দুর্গাপুজোর মণ্ডপ গড়ার জন্য গত বছর ডিসেম্বর মাসে তরুণ শিল্পী–‌জুটি মলয় ও শুভময়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল সন্তোষপুর লেকপল্লী। থিম ঠিক করে শিল্পীদ্বয়ের ভাবনায় মার্চে শুরু হয়ে গিয়েছিল এবারের দুর্গামণ্ডপ গড়ার কাজ।
এরমধ্যে পুজো কমিটির কর্তাদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু হয় ওই মশলা কোম্পানির কর্তাদের। মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া হয় আগে ঠিক করা থিমে দুর্গামণ্ডপ নির্মাণের কাজ। দু’‌মাস ধরে কথা চলার পর ওই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয় দক্ষিণের এই নামী দুর্গাপুজোর কমিটির। ঠিক হয় তাদের দেওয়া হলুদে গড়া হবে নতুন থিমের মণ্ডপ। ওই কোম্পানির নামও জুড়ে যায় দুর্গাপুজো কমিটির নামের আগে। নতুন নাম হয়েছে জে কে মশালে সন্তোষপুর লেকপল্লী।
সেই মতো আগস্ট থেকে নতুন থিমে মণ্ডপ গড়ার কাজ শুরু করেন দুই শিল্পী। নতুন করে প্রতিমা গড়ার কাজে হাত লাগান প্রতিমা শিল্পী পরিমল পাল। নতুন থিমে ‘‌মায়ের হেঁশেল’‌–‌এর সন্তোষপুর লেকপল্লীর মণ্ডপটি গড়তে প্রায় ৪ টন হলুদ লাগছে। গোটা ও গুঁড়ো, দুই রকমই। এই হলুদের জোগান আসছে ওই মশলা কোম্পানি থেকে। এই মণ্ডপের ভেতরেও ম ম করবে হলুদের গন্ধ। হলুদ শুধু রান্নার মূল উপকরণ নয়, এর গুণাবলিও বহুবিধ। ভেষজ এই বস্তুটি বহু রোগ নিরাময়ে কাজে আসে। মণ্ডপে কোম্পানির প্রচারের পাশাপাশি তুলে ধরা হবে হলুদের গুণাবলি। মণ্ডপের খরচ বহন ছাড়াও এই পুজোর প্রচারে ব্যানার দেওয়া, উদ্বোধনে তারকা শিল্পীদের হাজির করা–‌সহ প্রচার সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের দায়িত্ব বর্তেছে এই কোম্পানির ওপর।
এর আগে দু’‌বছর স্পনসর নিয়ে পুজো করেছে সন্তোষপুর লেকপল্লী। তাদের কমিটির নামের আগেও যুক্ত হয়েছে স্পনসরের নাম। তবে এভাবে কোনও বিশেষ কোম্পানির জিনিসে এর আগে তৈরি হয়নি তাদের মণ্ডপ। কর্পোরেট দাপটে আগে কখনও বদলে যায়নি থিম। ২০১৪ সালে প্রথম এভাবে বিশেষ কোনও কোম্পানির তৈরি উপাদানে মণ্ডপ গড়ার কাজ শুরু করেছিল বোসপুকুর শীতলা মন্দির। কর্পোরেটের কথামতো বিভিন্ন সময়ে তৈরি হয়েছে বিস্কুট, বিবাহের উপাদান, পলিথিন পাইপের মণ্ডপ।
 গত বছরের মতো এবারেও দুর্গাপুজোয় কর্পোরেটের স্পনসর নিচ্ছে সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যার। সেনকো গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ড–‌এর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে গতবছর দুর্গামূর্তিকে পরানো হয়েছিল সোনার শাড়ি। আর এ বছর ওই কর্পোরেটের দৌলতে রুপোয় গড়া হচ্ছে রথ। এর জন্য লাগছে প্রায় ৯ টন রুপো।
কর্পোরেটের দৌলতে ২০১৫ সালে বড়দুর্গার প্রচার তুঙ্গে তুলেছিল দেশপ্রিয় পার্ক। পরের দু’‌বছরও স্পনসরের দৌলতে বড়পুজো উপস্থাপন করেছে এই দুর্গাপুজো কমিটি। এ বছর অবশ্য এখনও এগিয়ে আসেনি কোনও কর্পোরেট সংস্থা। মুম্বইয়ের গণেশ পুজো মিটলে কলকাতার দুর্গাপুজোয় কর্পোরেটে প্রবেশের ছবিটা পরিষ্কার হবে, ধারণা পুজো কর্তাদের।‌

জনপ্রিয়

Back To Top