দীপঙ্কর নন্দী: নাম–‌না–‌করে বিজেপি–‌কেই বিঁধলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। মমতা বলেন, ‘‌কয়েকজন নেতা উদ্ভট ধর্মের কথা বলছেন। তাঁরা বলছেন, তুমি বাদ, আমরাই শুধু খাব, আমরাই শুধু থাকব। যাঁরা বলছেন, তাঁদের ব্রেন শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেছে। আমরা চাই মানব ধর্ম। যে ধর্ম সকলের বিপদে পাশে দাঁড়াবে। শুধু মুখে বড় বড় ভাষণ দেবেন না।’‌ এদিন মমতা নেতাজি ইনডোরে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ‘‌হিন্দু ধর্ম বিশ্বজনীন। এই ধর্ম কারও জন্য দরজা বন্ধ করে না, ভাগাভাগি করে না। আমি মনে করি, যে ধর্ম শুধু মুখে ভাষণ দেয় না, বিপদে পড়লে আশ্রয় দেয়, মা–‌বোনেদের সম্মান দেয়, সেটাই মানব ধর্ম। রামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজি, গান্ধীজি এঁরা সকলেই মানব ধর্মের কথা বলে গেছেন। কেউ কেউ সেখান থেকে সরে যাচ্ছে। মনীষীরা একতার কথা বলে গেছেন। সর্বধর্ম সমন্বয়ের কথা বলে গেছেন। বিবেকানন্দ ও স্বামী প্রণবানন্দ অল্প বয়সে মারা গেছেন। তাঁরা সম্প্রীতির কথা, ভালবাসার কথা, সকলকে সমান চোখে দেখার কথা বলে গেছেন। হিন্দু ধর্মের বিশেষত্ব বলে গেছেন। তাঁরা বলেছেন, আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে ভারতকে ভালবাসি। আমি মনে করি মানব ধর্মই নব প্রজন্মকে এগিয়ে দেয়। দুর্যোগ হলে এগিয়ে যায়। ভাগাভাগি নয়, দাঙ্গা নয়, রক্ত দিয়ে দেশকে রক্তাক্ত করা নয়। আমি মুসলিম তোষণ করি না, মানবতার তোষণ করি। আসুন, ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আগামী দিনে বিশ্বসেরা হবে বাংলা।’‌ শিকাগো প্রসঙ্গ এনে মমতা বলেন, ‘‌আমাকে একবার শিকাগো রামকৃষ্ণ মিশন থেকে আমন্ত্রণ জানানো হল। শেষ মুহূর্তে বলা হল, বিশেষ কারণে অনুষ্ঠান বাতিল করতে হয়েছে। আমি কিছু মনে করিনি। এটাই ভেবেছিলাম, আমি যাতে যেতে না পারি, তার জন্য নির্দিষ্ট একটি দলের চাপ ছিল ওদের ওপর‌।’‌ ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ ও রামকৃষ্ণ মিশনের প্রসঙ্গ এনে মমতা বলেন, ‘‌ভারত সেবাশ্রম মাটিতে কাজ করে। জ্ঞান দেয় না। রামকৃষ্ণ মিশন শিক্ষা নিয়ে কাজ করে।’‌ মমতা বলেন, ‘‌আমি ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘকে খুব ভালবাসি। কলেজে পড়ার সময় তিলজলা পিকনিক গার্ডেনে বর্ষার সময় গেছি। এখন যেখানে বিজন সেতু, সেখানে খুব জল জমত। তিলজলা পিকনিক গার্ডেনে গিয়ে খিচুড়ি দিতাম। দেখতাম, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের কর্মীরাও যাচ্ছেন নৌকোয় খিচুড়ি নিয়ে। গঙ্গাসাগরে তীর্থযাত্রীরা ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের জন্য অপেক্ষা করে। আমি রামকৃষ্ণ মিশন ও ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের বহু কাজে উপস্থিত থেকেছি। নিঃস্বার্থভাবে এঁরা কাজ করেন।’‌‌ 

 

বাংলায় বঞ্চনায় মমতার প্রতিবাদ

অমিতাভ সিরাজ
কেন্দ্রীয় অর্থ বরাদ্দে বঞ্চনার অভিযোগ বহুবার তুলেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এবার সেই প্রাপ্য অর্থের দাবিতে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হস্তক্ষেপ চাইলেন তিনি। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে মমতা বেশ স্পষ্টভাবেই বিভিন্ন খাতে রাজ্যের পাওনা টাকার বিষয়গুলি উল্লেখ করেছেন। যার হিসেব হল এরকম— কেন্দ্রীয় করের অংশীদার হিসেবে ১১,২১২.‌৫১ কোটি, কেন্দ্রীয় অনুদান ৩৬ হাজার কোটি, জিএসটি খাতে প্রাপ্য ১২,৪০৬.‌৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে কেন্দ্রে মোদি সরকারের কাছে রাজ্যের প্রাপ্য ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এদিনের চিঠিতে রাজ্যের পাওনা হিসেবে তিনটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছেন। এগুলি হল— জিএসটি খাতে রাজ্যের প্রাপ্য অনিয়মিত হয়ে যাওয়া, যা কেন্দ্র গত বছরের অক্টোবর–‌নভেম্বরের টাকা মিটিয়েছে চলতি মাসে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রকল্প এবং বিশেষ পিছিয়ে–পড়া অঞ্চলের জন্য অনুদানের টাকা। মমতা চিঠিতে বলেছেন, 
‘‌আমি খুব উদ্বেগের সঙ্গে আমাদের রাজ্যের প্রাপ্য অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি জানাচ্ছি। বহু সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ এর ফলে ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে আপনি দ্রুত হস্তক্ষেপ করুন।’‌
জিএসটি খাতে রাজ্যের প্রাপ্য টাকা না পাওয়ায় শুধু সমস্যা নয়, রাজকোষও ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। এবার কেন্দ্রীয় বাজেটে কমিয়ে ১১,২১২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে যা গতবারের বাজেটের চেয়ে অনেক কম। এছাড়াও এই টাকা পেতে প্রতি মাসের ২০ তারিখ পেরিয়ে যাচ্ছে। অথচ মাসের প্রথম দিনেই তা পাওয়ার কথা। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত কেন্দ্রীয় প্রকল্পখাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এছাড়া ‘‌স্পেশ্যাল ব্যাকওয়ার্ড রিজিয়নস’‌ অনুদান তহবিলে ২,৩৩০.‌০১ কোটি টাকা রাজ্য সরকার পায়নি।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, গত ৫ বছর ধরে বিভিন্ন খাতে ‘‌সেস’‌ এবং ‘‌সারচার্জ’‌ বসানো হচ্ছে। যার জেরে রাজস্ব কর ৬.‌১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮.‌৪ শতাংশে দাড়িয়েছে গত আর্থিক বছরে। মমতা বলেছেন, ‘‌কেন্দ্র এবং রাজ্য সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় জনগণের কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক। যাতে রাজ্যগুলি উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে। স্বভাবতই সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা রাজ্যের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার জনমুখী প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, বাম জমানার বোঝা কাঁধে নিয়ে ৩ লক্ষ কোটি টাকা করে সুদের খেসারত দিতে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গকে। পরিসংখ্যান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী এই চিঠিতে আরও জানিয়েছেন, সারা দেশে গত আর্থিক বছরে গড় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন যেখানে ৫ শতাংশ ছিল, সেখানে বেড়ে পশ্চিমবঙ্গে ১০.‌৪ শতাংশ হয়েছে। গত বছর এপ্রিল থেকে নভেম্বরে শিল্প উৎপাদনের হার জাতীয় স্তরে ০.‌৬ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গে তা ৩.‌১ শতাংশ। পরিষেবা ক্ষেত্রে সারা দেশে ৬.‌৯ শতাংশ, সেখানে রাজ্যের হার ১৬.‌৪ শতাংশ। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক কাজগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন মমতা ব্যানার্জি।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top