অরূপ বসু: তখন কলকাতায় টিভি আসেনি। রেডিওর নাটকের দারুণ কদর। একটা নাটক বাঙালির চিত্ত ও চেতনাকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছিল। নাম ‘‌নেফা, সুন্দরী নেফা’‌। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অজিতেশ। অজিতেশ এখন প্রয়াত। নেফার নাম বদলে হয়েছে অরুণাচল। ১৯৬২ সালে ভরত–চীন সীমান্ত সংঘর্ষের পর এখন ভয়ঙ্কর সুন্দর অরুণাচল বাঙালির পর্যটন মানচিত্রে এসেছে। বহু উপজাতির বাস। কিন্তু কোনও উপজাতিরই নিজস্ব লিপি নেই। এই অরুণাচলে অনেককাল হল নানা ধরণের গবেষণার কাজে ব্যস্ত বেশ কয়েকজন বাঙালি। এখানকার আনজাও জেলার একটি গ্রামের নাম ডং। ভারতের মাটিতে দিনের প্রথম সূর্যকিরণ এসে পরে এখানে। এক সরকারি বাঙালি গবেষক রমেন্দ্রনাথ কোলে সেই নবারুণের আলোয় গোটা রাজ্যকে দেখার চেষ্টা করেছেন। অরুণাচল সরকার তাঁর এই চেষ্টা বাংলায় প্রকাশ করেছে নাম ‘‌উদিত সূর্যের দেশে’‌ । এবারের বইমেলায় অরুণাচলের সেই বইটি প্রকাশ করতে এসেছিলেন সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত অসমীয়া লেখক য়েশে দরজে থংচি। বাংলা পড়তে পারেন, তাই বাংলা বইয়েরও খোঁজ করলেন নানা স্টলে। এমনকী লিটিল ম্যাগাজিন প্যাভেলিয়ানে বেশ কয়েকটি লিটিল ম্যাগাজিন কিনলেন। তার মধ্যে অনীক ও বারণরেখার আদিবাসী সংখ্যাটিও আছে। আদিবাসী সংখ্যা হাতে নিয়ে বললেন, ‘‌এটা আমার গবেষণার কাজেও লাগবে।’‌ আরও বললেন, ‘‌কলকাতা বইমেলা আমার কাছে আকর্ষণীয় একটি বিশেষ কারণে। লন্ডন ও ফ্রাঙ্কফুট বইমেলায় গেছি। সেখানে ভিড় লেখক ও প্রকাশকের তাঁদের মধ্যেই সরাসরি কথা হয়। লেখক ও পাঠকের এরকম সমাবেশ কলকাতার মত আর কোথাও হয় না।’‌ লন্ডন শহরে সানডে মার্কেট বলে একটা ব্যাপার আছে। সেখানে প্রচুর বই পাওয়া যায় কম দামে। লোকে বলে বার্গেন প্রাইস। আর ওখানে দিল’‌অন সহ সব বইয়ের দোকানে নিজে হাতে বই ঘাঁটা যায়। খুশি মত না কিনলেও বই পড়া যায়। ৪২তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা পাঠকদের লন্ডনের মত সেই সুযোগ করে দিয়েছে। তাই এবারের থিম সং–এ দুটি বিষয়ের উল্লেখ আছে। ১)‌কলকাতা বইমেলা সারা বিশ্বের কাছে বইয়ের পাতা খুলে দিয়েছে, ২)‌ ছোট ছোট পায়ে স্বপ্ন দেখা লিটিল ম্যাগাজিন। মাইকে ঘোষণা হচ্চে ৬০০ বুকস্টল ও ২০০ লিটিল ম্যাগাজিনের টেবিল। ভারতের ইতিহাসের অভিমুখ ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে একদল ধর্মান্ধ মানুষ। সব কিছুই তাঁরা দেখেন তথাকথিত হিন্দুত্বের চশমা পড়ে। তাঁদের বক্তব্য আর্যরাই নাকি ভারতের প্রাচীন জনজাতি। রাজস্থানের সরস্বতী নদীর তীরে তাদের নাকি সভ্যতা ছিল। বেশ কয়েকবছর আগে কলকাতা ইতিহাস কংগ্রেসে ইরফান হাবিব বলেছিলেন, সভ্যতার জন্ম হয় হিমবাহ বিধৌত নদীর অববাহিকায়।

সরস্বতী নদী দেখতে বিধৌত নদী। ১২ মাস কখনওই সেখানে জল থাকে না। বারণরেখার এবারের সংখ্যা অভিযান পর্ব। তাতে বিখ্যাত বিজ্ঞানী ডঃ পার্থপ্রতিম মজুমদার জিনতত্ত্বের আলোকে আর্য বিতর্ক ব্যাখ্যা করেছে। জিন বিজ্ঞানী বিশ্বনাথ সরকার জিন তত্ত্বের আলোয় বাঙালি কীভাবে ছোটনাগপুরের সাঁওতাল কোলদের থেকে এসেছে, তা ব্যাখ্যা করেছেন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় অবশ্য ভাষাতত্ত্বের ভিত্তিতে অনেককাল আগে একথা বলে গেছেন। ভারতের অরণ্য ধ্বংস কৃষি সভ্যতার প্রয়োজনে কীভাবে আর্যদের হাতে হয় তা বারণরেখার বল পর্বে প্রাচীন ভারতের সমাজ ও সাহিত্য বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন। শুক্রবার সাত সকালেই আজকালের প্যাভেলিয়েনে হাজির অভিনেতা রজতাভ দত্ত। কিছু পাঠক তাঁকে যেন হঠাৎ আবিষ্কার করলেন। তাঁর সঙ্গে আজকাল প্যাভেলিয়ন ঘুরে দেখলেন। আবার সেপথে না হেঁটে এক পাঠক তালিকা ধরে আজকালের নতুন ও পুরনো প্রকাশনার বিভিন্ন বই কিনতে শুরু করলেন। এবার বইমেলায় অন্যতম দিক আজকালের হিং টিং ছট সমগ্র। বেশ কয়েকজন পাঠক তো বলেই ফেললেন ছোট বেলায় বাবুরাম সাপুড়ের খেলার বিষয়ে হিং টিং ছটের ভক্ত ছিলাম। বড় হয়ে রাজনীতি ও সমাজবিষয়ে। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাজার সফর একচলমান জীবনের ছবি। সেটারও দারুণ চাহিদা। এছাড়া আজকালের বিরাটইজম, পথের পাঠশালায়, মুহুর্তর মিছিল, ছেঁড়া ক্যাম্বিসের ব্যাগ, মস্কো বনাম পণ্ডিচেরীর চাহিদা তো আছেই। এখন বিসংবাদ একটি ছোট অন্য ধরনের সংবাদের কাগজ। ২০ বছর ধরে বেরোয়। এবার তারা সেরা বিসংবাদ প্রকাশ করছে। চৈতন্য মৃত্যুর রহস্য উন্মোচন নিয়ে একটি দারুণ লেখা বেরিয়েছে। নবীন লেখকদের উৎসাহ দিচ্ছে। সুমিতা দাসের অন্য একটা রেনেসাঁ আরবিক–ইসলামিয় সভ্যতার স্বর্ণযুগে আলো ফেলেছেন। ১৯৯৩ সালে ২৭ অক্টোবর অক্সফোর্ডে প্রিন্স চার্লসের প্রদত্ত বক্তৃতার অংশ বিশেষ দিয়ে বইটি শুরু.‌.‌ ইসলামের প্রকৃতি সম্পর্কে পাশ্চাত্যে ভূল বোঝাবুঝি আছে। আমরা একমাত্রিক ইতিহাসের উত্তরাধিকার পেয়েছি।‌ জর্জ সার্টেন বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে আকর গ্রন্থ লেখেন। তাতে দেখান ৭৫০ থেকে ১১০০ খ্রীষ্টাব্দ, ৩৫০ বছর ধরে ইতিহাস আলো করে আছেন ইসলামিয় বিজ্ঞানীরা। টেকনো ইন্ডিয়ার স্টলে এদিন সন্ধ্যায় সুবোধ সরকার বলছিলেন, বই বিক্রি বাড়া মানেই পাঠক বাড়া নয়। মূদ্রিত বইয়ের পাশাপাশি ইবুক এসে গেছে। দুটোর মধ্যে সেতু বন্ধন এখন জরুরি। এবার মেলায় লক্ষ্যনীয় জাগো বাংলা ও পশ্চিমবঙ্গ মণ্ডপে বাউল গান শোনার ভিড়। আর বিশ্বভারতী মণ্ডপে রবীন্দ্র সাহিত্যের টানে তরুণদের ভিড়। 

বইমেলায় আড্ডা। ডান‌ দিকে, টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ–‌এর স্টলে লেখক–‌পাঠক মুখোমুখি অনুষ্ঠানে বীথি চট্টোপাধ্যায়, বাংলাদেশের কবি আনুসুর রহমান ও কবি সুবোধ সরকার।শুক্রবার। ছবি:‌ ছবি:‌ অমিত ধর ও কৌশিক সরকার

জনপ্রিয়

Back To Top