দীপঙ্কর নন্দী: স্টেট ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। অফিসের কাজের পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালে ব্যাঙ্কের চাকরি নিয়ে দুর্গাপুরে গেলেন। ১৯৭৪–‌এ ফিরে আসেন কলকাতায়। যোগমায়া দেবী কলেজে তখন ছাত্র পরিষদ করছেন এখনকার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ১৯৭৭–’‌‌৭৮ সালে মমতার সঙ্গে কাজ শুরু করলেন তৃণমূল রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি। দক্ষিণ কলকাতায় সেই সময় পানু বক্সি নামে পরিচিত ছেলে। জীবনের শুরু থেকেই অসম্ভব পরিশ্রম করতে পারতেন, আজও একইভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন। ’‌৭৮–‌এ মমতা দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক হন। সেই সময় দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাজ করছেন সুব্রত বক্সি, দিলীপ মজুমদার, আশিস চক্রবর্তীরা। এঁরা সকলেই ওয়ার্ডের সম্পাদক ছিলেন। মমতাকে বক্সি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন। এভাবেই চলল বেশ কয়েক বছর। মনস্থির করলেন ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে রাজনীতি করবেন। মমতার সঙ্গে কথা হল, স্ত্রী সাহানার সঙ্গেও আলোচনা করলেন। ২০০১ সালে চাকরি ছেড়ে বিষ্ণুপুর পশ্চিম থেকে প্রথম বিধানসভায় দাঁড়িয়ে জয়ী হন।
সুব্রত বক্সি দলের অপরিহার্য নেতা। এবার লোকসভা নির্বাচনে দাঁড়াননি। নির্বাচনের কাজ পরিচালনার ভার চেয়ে অনুরোধ করতে মমতা রাজি হয়ে যান। সুব্রত বক্সি নির্বাচনে দাঁড়িয়ে কোনওবার হারেননি। ২০১১ সালে ভবানীপুর থেকে দাঁড়িয়ে মমতার মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছিলেন। হাতে ছিল পূর্ত ও পরিবহণ দপ্তর। বক্সির ওপর মমতা বিশ্বাস ও আস্থা রেখে অনেক কাজে স্বাধীনতা দিয়েছেন। মন দিয়ে কাজ করেন। তৃণমূল ভবন সামলান। জেলা থেকে যাঁরা অভাব–অভিযোগ নিয়ে আসেন, তাঁদের সঙ্গে দেখা করেন। সমস্যা থাকলে কথা বলে মিটিয়ে দেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিনি থাকেন ভবনে। পাশাপাশি নির্বাচনের প্রচারেও তাঁকে বের হতে হয়। সকলের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল। বাইরে থেকে দেখলে বক্সিকে মনে হবে তিনি সবসময় রেগে থাকেন। কথা বললে বোঝা যায়, এই মানুষটার মন কতটা সহজ সরল।
২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে মমতা মুখ্যমন্ত্রী হন। তার আগে নেত্রী ছিলেন লোকসভার সদস্য। বক্সি ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে ইস্তফা দেন। মমতা ভবানীপুর থেকে উপনির্বাচনে জয়ী হন। ২০১১ সালে দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হল। বক্সি দাঁড়ালেন, ভোটে জয়ী হন। ২০১৪–য় ফের লোকসভার সদস্য হন। বারবারই বলেছেন, ‘‌তৃণমূল শুধু রাজ্যেই নয়, বাইরের বেশ কয়েকটি রাজ্যে সংগঠন বিস্তার করেছে।’‌ কাজ বেড়েছে। বাইরের রাজ্যে নেতা–‌কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। দলের কর্মসূচি ঠিক করেন।
সুব্রত বক্সির স্ত্রী সাহানা বক্সি সরকারি চাকরি করতেন। তিনিও স্বেচ্ছায় অবসর নেন। একজন সঙ্গীতশিল্পী। আগে গান করলেও মাঝখানে কিছুদিনের জন্যে গান বন্ধ রাখতে হয়। ছেলে সপ্তর্ষি বক্সি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। চাকরি করেন। সাহানা আবার গান শুরু করেছেন। এরই মধ্যে কয়েকটি অনুষ্ঠানও তাঁর করা হয়ে গেছে। মিষ্টি গলা। তাঁর গান শুনে অনেকেই প্রশংসা করেন। ভাই সন্দীপ বক্সি চাকরি করতেন সাইতে। মমতার অনুরোধে চাকরি ছেড়ে পুরসভা নির্বাচনে দাঁড়িয়ে কাউন্সিলর হয়েছেন। বাবু বক্সি বলে পরিচিত। দুর্গাপুজো করেন।
সুব্রত বক্সি রাজনীতি করলে কী হবে, তিনি খুব ঘরোয়া। সংসারের খোঁজখবর রাখেন। প্রায় প্রতিদিন ল্যান্সডাউন মার্কেটে বাজার করতে যান। বাজার করা তাঁর নেশা। এখন বাড়িতে ফ্রিজ থাকায় রোজ বাজারে যান না। তবে, সপ্তাহে তিনদিন সকালে ল্যান্সডাউন মার্কেটে গেলে তাঁকে বাজার করতে দেখা যায়। লাউ, মোচা, মাছের দাম কত, তা বক্সির সব জানা। ইচ্ছে থাকলেও বাজারের কোনও বিক্রেতা তাঁকে ঠকাতে পারবেন না। সকলেই জানেন, তিনি রাজনীতি করেন। পরিচিত ব্যক্তি। বাজারে গিয়ে অনেকক্ষণ সময় কাটান। অনেকের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়। নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। 
বাজারে ঢুকলেই কেউ একজন বলেন, বক্সিদা আজ বাজারে খুব ভাল শোল মাছ এসেছে। কিনে নিন। আবার কেউ বলেন, বক্সিবাবু আজকে বাজারে অনেকদিন পর ভাল কই মাছ এসেছে। দেখে আসুন। পছন্দ হলে কিনে নিন। বড় সাইজ। বাজারের কোনার দিকে জ্যান্ত মাছ নিয়ে কয়েকজন বসেন। সেখানেও যান বক্সিবাবু। কখনও কাটা পোনা কেনেন। সবজি নিজের হাতে বাছেন। তারপর ওজন করান। দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে অনেকেই এই বাজারে জিনিসপত্র নিয়ে আসেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ তাঁকে দেখলেই নানা সমস্যার কথা বলেন। ছেলেমেয়ের জন্য চাকরি চান। তাঁদের অনেককেই সুযোগ করে দিয়েছেন সুব্রত বক্সি। তাঁরা বক্সির কাছে কৃতজ্ঞ। বক্সির বাড়ির লাগোয়া অফিসে অনেকেই জেলা থেকে দেখা করতে আসেন। রান্না হয়। মাছ–ভাত খেয়ে তাঁরা ফিরে যান জেলায়।
১৯৮৫ সালে মমতা ব্যানার্জির অনুরোধে ৭২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে বক্সির বাবা সুধীররঞ্জন বক্সি পুরসভা নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জয়ী হন। জ্যাঠামশাই সত্যরঞ্জন বক্সি। কংগ্রেসের বাড়ি। স্কুল থেকেই রাজনীতি দেখে এসেছেন সুব্রত বক্সি। ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে ভর্তি হন আশুতোষ কলেজে। এরপর হাজরা ল’‌ কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করেন। বয়স ৬৮। ১৯৯২ সালের ২১ নভেম্বর সাহানার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। থাকেন দক্ষিণ কলকাতার প্রিয়নাথ মল্লিক রোডে। জাপানেও গিয়েছিলেন একবার। ভাল বক্তৃতা দেন। দলের একজন শৃঙ্খলাপরায়ণ কর্মী। ছোট মোবাইল ব্যবহার করেন। অ্যানড্রয়েড নয়। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ করেন না। বললেন, ‘‌বিধানচন্দ্র রায়কে আজও বাংলার মানুষ মনে রেখেছে। সেইসময় ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ছিল না। ‌আমার অন্য কোনও নেতার সঙ্গে সম্পর্কের কোনও দরকার হয় না। আমার নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। তিনি আমাকে চেনেন। আমি তাঁকে চিনি। এটাই যথেষ্ট।’‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top