বিভাস ভট্টাচার্য
চোখ বন্ধ করলে দুজনেই এখনও দেখতে পান কার্গিল যুদ্ধের সেই দিনগুলি। বৃষ্টির মতো পাকিস্তানের দিক থেকে উড়ে আসছে একের পর এক কামানের গোলা। জবাব দিচ্ছে ভারতীয় সেনা। পাকিস্তানের হাত থেকে ভারতীয় এলাকাগুলি পুনরুদ্ধারের জন্য ১৯৯৯ সালে মে থেকে জুলাই কার্গিলে যে লড়াই চলে তার নাম ‘‌অপারেশন বিজয়’‌। সেই যুদ্ধে সেনার সঙ্গী হয়েছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দুই বাঙালি চিত্রগ্রাহক। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল বাসুদেব মৈত্র এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল দীপক দাস। ক্যামেরাবন্দি করেন যুদ্ধের বিভিন্ন মুহূর্ত। বাটালিক শৃঙ্গ জয়ের পর সেনাদের সঙ্গে  তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ভিপি মালিকের বৈঠক থেকে শুরু করে গানহিল পর্বত ফের দখলের পর জাতীয় পতাকা ওড়ানোর দৃশ্য। 
রবিবার ২৬ জুলাই ছিল ‘‌কার্গিল দিবস’‌। সেই অভিজ্ঞতা জানিয়ে কর্নেল বাসুদেব মৈত্র ‌বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজের সঙ্গে লেফটেন্যান্ট কর্নেল দীপক দাস এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ডিরেক্টরেট অফ পাবলিক রিলেশনের অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল স্বাগত ঘোষের সঙ্গে জম্মুতে যান তিনি। সেখানে সেনা হাসপাতালে আহতদের দেখতে গেছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। দীপক দাস থেকে যান।  সেনাপ্রধান ভিপি মালিকের সঙ্গে বাসুদেব মৈত্র আবার কার্গিল যান। তাঁর কথায়, ‘‌কার্গিলে পৌঁছে দেখি পাকিস্তানের দিক থেকে লাগাতার গোলাবর্ষণ হচ্ছে। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে, তার আশেপাশের জমি ছিল নরম। ফলে গোলা পড়েও ফাটছিল না। সেনাপ্রধান সেখান থেকে বাটালিক চলে যান। আমাকে বাটালিক পৌঁছে দেওয়া হয়। আমি সেনাপ্রধানের সঙ্গেই বিভিন্ন জায়গায় যেতাম। যুদ্ধের বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি তুলতাম। কার্গিলে শত্রুপক্ষ ছিল পাহাড়ের ওপর। নীচ থেকে সেই পাহাড় পুনরুদ্ধার করেছিল আমাদের বাহিনী। কাজটা অত্যন্ত কঠিন। জুন মাসেই কব্জা করা হয় বাটালিক। বিজয়ী সেনাদের সঙ্গে সেনাপ্রধানের বৈঠকে তাঁদের হাতে উপহার তুলে দেওয়ার মুহূর্তটা ক্যামেরায় ধরেছিলাম।’‌ 
আরেক বাঙালি চিত্রগ্রাহক দীপক দাস ছিলেন ঘুংড়িতে। তাঁর কথায়, ‘‌তাঁবুতে শোয়া। দেখি ‘‌দেওয়ালি’‌ কাকে বলে!  দু’‌দিক থেকেই গোলাবর্ষণ। সারারাত কান ফাটানো আওয়াজ। গোলার টুকরো উড়ে এসে পড়ছে। ঘুমোতে পারিনি। অথচ সেনারা নির্বিকার। ভোরে দেখলাম আশেপাশের অনেক তাঁবু ক্ষতিগ্রস্ত। ওখান থেকে মাতাইন হয়ে দ্রাস । বাঙ্কারে থাকতাম। জুন মাসেই শুনি তোলোলিং চূড়ায় যেতে হবে। বিকেলে বেরিয়ে ওই খাড়া পাহাড় বেয়ে রাত দশটায় একটা বোল্ডারের পেছনে আমি, এক সেনা অফিসার ও কয়েকজন সেনা। সারারাত গোলাগুলি। ভোর সাড়ে চারটেয় বেরিয়ে তোলোলিং পৌঁছই সকাল সাড়ে দশটায়। দেখা হল ক্যাপ্টেন বিক্রম বাটরার সঙ্গে। তাঁর নেতৃত্বেই এই শৃঙ্গটা দখল হয়। সেই ছবিটা তুললাম। বিকেলে পায়ে হেঁটে ফের নীচে নামা। সারাদিন খাওয়া বলতে শুধু বিস্কুট। তখনও ফিল্মেই ছবি তোলা হত। নেগেটিভটা বিমানে দিল্লির অফিসে পাঠানো হত।’‌  সেইসময় প্রচণ্ড যুদ্ধের জন্য দীপক কার্গিল যেতে পারেননি। ক’‌দিন বাদে দিল্লি ফিরে যান তিনি। জুলাইয়ের প্রথম দিকে ফের যান যুদ্ধক্ষেত্রে। দ্রাসে পৌঁছে জানতে পারেন শহিদ হয়েছেন ক্যাপ্টেন বিক্রম বাটরা। দীপক যান গানহিল পর্বতে। পাকিস্তানের হাত থেকে যেটা পুনরুদ্ধার করে ভারতীয় সেনা। দীপকের কথায়, দেখলাম যে সব সেনাকে পাকিস্তান নিজের বলে স্বীকার করেনি তাঁদের সসম্মানে শেষকৃত্য করছেন ভারতীয় সেনারা। শৃঙ্গ জয়ের পর সেখানে দেশের পতাকা তোলার ছবিটা ক্যামেরাবন্দি করলাম। 
যুদ্ধ শেষে অন্যদের সঙ্গে বাসুদেব মৈত্র এবং দীপক দাস আমন্ত্রিত হন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে। অটলবিহারী জানতে চান তাঁদের অভিজ্ঞতা। প্রশংসা করেন। অবসরের পর ২০১৬–‌তে দুজনকেই কার্গিলে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল দলবীর সিং।
যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে একবারও কি প্রাণের ভয় হয়নি? দু’‌জনেরই জবাব, না। ব্যাপারটা একেবারেই স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছিল।
‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top