‌সঙ্ঘমিত্রা মুখোপাধ্যায়
প্রায় তিন মাস পর কুমোরটুলি আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে। 
দুর্গাপূজার বাকি আর মাত্র মাস চারেক। পুজোর বায়না শুরু হয়েছে আনলক পর্বে। কাঠামো পুজোও সারা হল রথের দিনে। কাঁচামাল সংগ্রহের কাজ চলছে। ভিন রাজ্যের কারিগররা কুমোরপাড়ায় ফিরে আসছেন কাজের টানে।
অতিমারী ও আমফান— এই জোড়া বিপর্যয়ে উত্তর কলকাতার ওই কুমোরপাড়ার জনজীবন একেবারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। না ছিল কাজ, না ছিল আয়। লকডাউনের শুরুতেই ভিন রাজ্যের কারিগরদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের নিজেদের বাড়িতে। ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মৃৎশিল্পীরা নিজেদের পুঁজি ভেঙে খাই–‌খরচ চালাচ্ছিলেন। বিভিন্ন ক্লাব ও পুজো উদ্যোক্তারাও সাহায্য করেছেন এই তিন মাস শিল্পীদের। কিন্তু পুজোর বায়না প্রায় কিছুই হয়নি। বিদেশের পুজোর বরাতও জানুয়ারি মাসের পর আর আসেনি। বচ্ছরকার পুজোর কাজ কি এবার তবে বন্ধই থাকবে? এই উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার দোলাচলে দিন কাটছিল কুমোরটুলির শিল্পীদের।
আনলক পর্বে দোকানপাট খুললে শুরু হল পুজো উদ্যোক্তাদের আনাগোনা। প্রতিমার বরাত দিয়ে যেতে লাগলেন একে একে। বাজেট অবশ্য সবারই এবার কম। তাই সাধ ও সাধ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে শিল্পীরাও নেমে পড়লেন কাজে। রথের দিন নিয়ম মেনেই সারা হল কাঠামো পুজো। মহিলা শিল্পী চায়না পাল জানালেন, ‘‌গত দিন দশেকের মধ্যেই বেশ কয়েকটি সাবেকি পুজো ও বারোয়ারি পুজোর বায়না হল। হাওড়া রামকৃষ্ণ মিশনের পুজোর বায়নাও হল। ঝামাপুকুর লেন, এন্টালি সঙ্ঘের অর্ডারও এসে গেছে। দু–‌একজন কারিগর নিয়ে প্রাথমিক কাজ শুরুও করে দিয়েছেন চায়না। অপেক্ষা শুধু সব কারিগর ফেরার। কৃষ্ণনগর, নবদ্বীপ, বেথুয়াডহরি থেকে কারিগররা ফিরবেন। স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশমতো ওয়ার্ড অফিসে এদের শারীরিক পরীক্ষার পর কাজে নেওয়া হবে। চায়নাদেবীর কথায়, প্রায় ৩০–‌৩৫টা অন্নপূর্ণার মূর্তি এবার বিক্রি হয়নি। শীতলা মূর্তিও অবিক্রিত থেকে গেছে। তার ওপর আমফান ঝড়ের তাণ্ডবে কাঁচামালও নষ্ট হয়েছে অনেক। এই ক্ষয়ক্ষতি সামলানোর জন্য কুমোরটুলির শিল্পীরা সরকারের সাহায্য প্রত্যাশী। কারণ বাইরে থেকে ঋণ নিয়ে খরচ সামলানোর অবস্থা এদের নেই। তিন মাস বসে খেয়ে পুঁজিও শেষ। দুর্গাপুজোর কাজ ঠিকঠাক তুলে দিতে পারলে দুর্দিন কাটবে বলেই শিল্পীদের বিশ্বাস। কিন্তু অতিমারীর প্রকোপ যে হারে বাড়ছে তাতে নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না মৃৎশিল্পীরা। স্বনামধন্য শিল্পী মিন্টু পালের বক্তব্য, বড় বড় সব পুজো উদ্যোক্তাও এবার বাজেট কমিয়ে পুজোর ভাবনা ভাবছেন। সন্তোষ মিত্র স্কোয়‌্যারের ১২ ফুটের ঠাকুর (চালি নিয়ে ১৬ ফুট) এবার ১০ ফুটে নামিয়ে আনা হবে। লকডাউনের মধ্যেই অবশ্য এঁরা বায়না সেরেছেন। ছোট সিমলা বারোয়ারির মূর্তিও হবে এবার আট ফুটের (এগারো ফুটের জায়গায়)। প্রতিমার দামে অবশ্য কোনও আপস করছেন না মিন্টু পাল। ওঁর মতে, সঠিক গুণমানের জিনিস দিয়ে তৈরি করতে হলে দাম কমানো সম্ভব নয়। কাঁচামাল থেকে শুরু করে প্রতিমার রং, অলঙ্কার সব কিছুরই দাম চড়া। ডিজেল, পেট্রোলের দাম বাড়ায় মাল পরিবহণ খরচও বেড়েছে। শিল্পী কাঞ্চী পালের কথায়, সাত দিনে দড়ির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। উলুবেড়িয়া থেকে মাটির নৌকা এসেছে, তার দামও প্রচুর বেড়েছে। কাঁচামাল এমন অগ্নিমূল্য হলে প্রতিমার দর কমানো তো একেবারেই সম্ভব নয়। কাঞ্চী পালের ১৭ জন কারিগর এখনও কুমোরটুলিতে এসে পৌঁছোতে পারেননি। আগস্টের আগেই এদের ফেরানোর ব্যবস্থাও করতে হবে শিল্পীদেরই।
কুমোরটুলি থেকে প্রায় ২০০টি দুর্গা প্রতিমা প্রতি বছর বিদেশ পাড়ি দেয়। এপ্রিলের মধ্যেই বাইরের প্রতিমার বায়না শেষ হয়। জুন থেকেই জাহাজে বা প্লেনে রওনা করিয়ে দেওয়া হয়। এ বছর মাত্র ২৫–‌৩০টার মতো বিদেশের পুজোর বায়না এসেছে কুমোরটুলিতে। অতিমারী যে ভয়াল রূপ ধারণ করেছে বিদেশে, তাতে আর কোনও পুজোর বায়না আসার সম্ভাবনা আছে বলে মনে করেন না মৃৎশিল্পীরা। মিন্টু পালের ৩টে প্রতিমা এবার বিদেশে পাড়ি দেবে। ফাইবার গ্লাসের ওই প্রতিমাগুলো যাবে ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে। প্রস্তুতি চলছে জোর কদমে। জুলাইয়েই ফ্রান্সের প্রতিমাটি শিপিং হবে। তার আগে বাক্স বন্দি হয়ে ফিউমিগেশনের কাজ সারা হবে।

জনপ্রিয়

Back To Top