দীপঙ্কর নন্দী
‘‌যে সব বহিরাগত এ রাজ্যে তাণ্ডব শুরু করেছেন, তাঁরা বাংলার কী বোঝেন?‌ আজ দলিত, নমশূদ্রদের নিয়ে রাজনীতি করছেন, অথচ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় মতুয়াদের কোনও স্থান নেই।’‌ শুক্রবার তৃণমূল ভবনে মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিক বৈঠক করে রাজ্যের মন্ত্রী ব্রাত্য বসু এই মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘‌২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি মতুয়া সঙ্ঘ থেকে একজনকে পূর্ণমন্ত্রী করেছিলেন। যে সব বহিরাগত বাংলায় এসে ঘোরাফেরা করছেন তাঁরা রবীন্দ্রনাথ, বীরসা মুন্ডাকে চেনেন না। তাণ্ডব করেই বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছিল। এটাই ওঁদের সংস্কৃতি।’‌
ব্রাত্য বলেন, ‘‌রামমন্দিরে ১৭টা মন্দির আছে। কিন্তু সেখানে একটাও হরিচাঁদ, গুরুচাঁদের মন্দির নেই। বাংলায় আছে। এমনকী বাংলায় কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ও করা হয়েছে। বহিরাগতরা এসে বলছেন, বাংলায় মন্দির করবেন। অথচ যেখানে প্রয়োজন সেখানে মন্দির বানাচ্ছেন না। ২০১১ সালে রচপাল সিং মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, অথচ অন্য কোনও রাজ্যে বাঙালিকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়েছে তা দেখতে পাবেন না। আমরা এই উদারতায় বিশ্বাস করি, সকলকে নিজের লোক মনে করি। ‌অর্জুন সিং মমতা ব্যানার্জির দয়ায় সাংসদ হয়েছিলেন। তাহলে উত্তরপ্রদেশ থেকে কেন অর্জুন রায় বা গুজরাটে কেন একজন অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায় সাংসদ হবেন না?‌ বিজেপি চায় বহিরাগতদের দিয়ে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে। আর আমাদের মাথা নত করে থাকতে হবে?‌ আমাদের বাঙালি জাতির কি এই দুর্দশা এসেছে?‌ আমাদের এখানে ধর্মের ভিত্তিতে লোককে ভাগ করা হয় না। আমাদের কাজই হল মানুষের সুখ–স্বাচ্ছন্দ্য, সুযোগ–সুবিধে দেখা। এটা রাজ্য সরকারের কর্তব্য। স্বাধীনতা আন্দোলনও বাঙালিদের নেতৃত্বেই হয়েছিল।’‌
ব্রাত্য বলেন, ‘যেভাবে অবাঙালিদের দিয়ে সুভাষচন্দ্র বসুকে কোণঠাসা করা হয়েছিল সেই একইভাবে উত্তর পশ্চিম ভারত থেকে মমতা ব্যানার্জিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য লোক পাঠানো হচ্ছে।’‌ তিনি উল্লেখ করেন, ‘‌আমি সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে মমতা ব্যানার্জির তুলনা করছি না। অবাঙালিদের দিয়ে সুভাষচন্দ্র বসুকে চেপে দেওয়ায়, তাঁকে আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠন করতে হয়েছিল। সে রকমই প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য মমতা ব্যানার্জিও তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেছেন। আমি এই তুলনা দিয়েছি। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে পরিস্থিতি ছিল অন্যরকম। ওটা ছিল ঔপনিবেশিক লড়াই।’‌
ব্রাত্য বলেন, ‘‌আমাদের মাথার ওপর অন্য রাজ্যের নেতারা এসে বসবেন, শাসন করবেন— আর তাঁরাই বলবেন রবীন্দ্রনাথের জন্ম বোলপুরে, আদিবাসীর গলায় মালা দিয়ে বলবেন বীরসা মুন্ডার গলায় মালা দিয়েছি। খোঁজ নিয়ে দেখুন বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার দিন ভাটপাড়ায় উল্লাস হয়েছিল। যখন আমরা বাংলাকে আন্তর্জাতিক সূত্রে বাঁধতে চাইছি, তখন বাধা দেওয়া হচ্ছে। কেউ যদি এসে আমাদের বাঙালি মনীষীদের অপমান করেন বাঙালিরা তাঁদের ছেড়ে দেবে না। যে সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তা ভয়ঙ্কর।’‌
‌আইপ্যাকের কর্তা প্রশান্ত কিশোর সম্পর্কে ব্রাত্য বলেন, ‘‌কোথাও কি দেখেছেন, পিকে তৃণমূলের পদাধিকারী?‌ সভাপতি, সম্পাদক বা জেলা কমিটিতে কি আছেন?‌ আপনাদের কাছে কোনও তথ্য থাকলে জানাবেন। বাংলাকে টার্গেট করতেই পারে। বাংলার ওপর অবাঙালিয়ানা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এত বাঙালি ব্রাহ্মণ আরএসএস করেন, তাঁদের কাউকে প্রধান করা হল না কেন?‌’‌
মালদায় বিস্ফোরণ প্রসঙ্গে ব্রাত্য বলেন, ‘‌গুজরাটে ভারুচে একটা বিস্ফোরণ হয়েছিল। মৃত্যু হয়েছিল ৪ জনের। আহত হন ২৩০ জন। ওই সময়ে আমরা কোনও নাশকতা খুঁজতে যাইনি। কারণ দুর্ঘটনা হতেই পারে। অথচ বাংলায় বিস্ফোরণ হলেই তার পেছনে জঙ্গিবাদ দেখতে পাওয়ার খেলো রাজনীতি করা হচ্ছে। কারণ ওঁরা এখানে সাম্প্রদায়িক পোলারাইজেশন চাইছেন। তাই বার বার এক কথা বলছেন।’‌
 রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় প্রসঙ্গে ব্রাত্য বলেন, ‘‌টুইট করছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা দেখার জন্য মুখ্যমন্ত্রী আছেন, স্বরাষ্ট্র দপ্তর আছে।’‌ ৩৫৬ ধারা জারি নিয়ে দিলীপ ঘোষের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রাত্য বলেন, ‘‌সাহস থাকলে এখানে ৩৫৬ ধারা জারি করে দেখান দিলীপবাবু।’‌ লাভ জিহাদ প্রসঙ্গে ব্রাত্যর মত, ‘‌লাভ ও জিহাদ সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। আমরা কারও মধ্যে ভাগাভাগি করি না। এই দুটো শব্দকে আমরা মিলিয়ে ফেলি না। বিজেপি ওটাই করছে। লাভ জিহাদ শব্দের অস্তিত্ব আমার কাছে নেই।’‌ শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে ব্রাত্যর জবাব, ‘‌শুভেন্দু দলেই আছেন। তাঁকে নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠছে?‌ তিনি বৃহস্পতিবারই সব বলেছেন। তা–‌ও কেন কথা উঠছে?‌ সৌগত রায় আমার নেতা। তাঁর কথার ওপর আমি কোনও কথা বলতে পারি না।’‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top