সঙ্ঘমিত্রা মুখোপাধ্যায়
শারদীয় দুর্গোৎসবের বাকি মাত্র আড়াই মাস। কিন্তু অতিমারীর প্রকোপে শহরের বনেদি বাড়ির পুজো আয়োজনেও তেমন কোনও উৎসাহ, উদ্দীপনা নেই। রথযাত্রা ও উল্টোরথের দিন কাঠামো পুজোর কাজ সারা হয়েছে বটে, একমেটে কাজও প্রায় শেষ। কিন্তু পুজোর বাজার এখনও শুরু হয়নি কোনও বাড়িতেই। সব বাড়ির পুজোই এবার পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বাইরের কোনও দর্শককে ঢুকতে দেওয়া হবে না। শোভাবাজার রাজবাড়ির ছোট তরফের বংশধর দেবাশিস দেব জানালেন, বড়, ছোট দু’‌বাড়িতেই পুজো হবে নিয়ম মেনেই। প্রতিমার উচ্চতা ১৪ ফুট রেখে ওজন কমানো হবে। কাঠামো অনেক হালকা করা হয়েছে বিসর্জনের সময় কাঁধে নিয়ে যাওয়ার সুবিধার জন্য। প্রতিমা বাহক প্রায় ২০ জন লাগে প্রতিবার। বাহক সংখ্যা কমিয়ে দূরত্ববিধি বজায় রাখার জন্য প্রতিমার ওজন হ্রাস। তবে প্রতিমার মুখাবয়বের কোনও হেরফের হবে না। ১১ সেপ্টেম্বর কৃষ্ণা নবমীর দিন থেকেই দেবীর বোধন শুরু হবে, চলবে ৪৫ দিন। তারপর ষষ্ঠী সেই ২২ অক্টোবর। কলাবৌ স্নানে কোনও শোভাযাত্রা হবে না। বাগবাজার ঘাটে নৌকা করে বিসর্জন হয়, নৌকার ব্যবস্থা এখনও করা হয়নি। পুজোর নৈবেদ্য ও ভাজা ভোগের জন্য ১৫–‌১৬ জন কারিগর আসতেন, এবার আনা হবে চারজনকে।  পুজোর ক’‌দিন একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া, হইচই, ও আড্ডা কিছুই হবে না এবার। বাইরের কোনও দর্শককে এবার রাজবাড়ির পুজো দেখার অনুমতি দেওয়া যাবে না বলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন দেবাশিস দেব।
বিডন স্ট্রিটের দত্ত বাড়ির পুজোও হবে দূরত্ববিধি মেনে। বংশের সদস্যরা সবাই মাস্ক পরে পুজো আয়োজনে যোগ দেবেন, এমনই জানালেন ওই পরিবারের সদস্য অজয় দত্ত। প্রতিমার উচ্চতা ১১ ফুট থেকে ৬ ফুটে নামিয়ে আনা হয়েছে। ওজনে হালকা করার জন্য পুরনো শাল কাঠামো বাদ দেওয়া হয়েছে। এবারে আর বাড়িতে তৈরি হচ্ছে না মূর্তি। কুমোরটুলিতে শিল্পী সুরেন্দ্রনাথ পাল মূর্তি গড়ছেন।  চণ্ডীপাঠ, সন্ধিপুজো হলেও কুমারী পুজো ও ধুনো পোড়ানো অনুষ্ঠান এবার বাদ দেওয়া হবে। ঠাকুর দালানে পুজোর ক’‌দিন যে জলসা হত, তাও হবে না। বাড়ির মহিলারাই পুজোর নৈবেদ্য, শীতল ভোগের আয়োজন করবেন। বাইরে থেকে লোক আনা হবে না।
বড়িশা সাবর্ণ রায়চৌধুরি বাড়ির পুজোও হবে নিয়ম মেনে, তবে সবরকম জাঁকজমক এড়িয়ে। জন্মাষ্টমীতে হয় কাঠামো পুজো। সাবর্ণদের ৬টি পরিবার— সবাই মিলে ঠিক করেছেন শুধু পরিবারের সদস্যরাই এই পুজোয় থাকবেন, কোনও বন্ধু বা পরিচিতকে এবার আমন্ত্রণ করা হবে না। হাতিবাগান কুণ্ডু বাড়ির মূর্তি এবারেও পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়েই তৈরি হচ্ছে। শোলা, প্রাকৃতিক রং ও অন্যান্য বায়োডিগ্রেডেব্‌ল উপকরণই ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এই পুজো দেখার অনুমতি পাবেন না বাইরের কোনও দর্শক। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই, মাস্ক পরে একমাত্র পরিবারের সদস্যরাই এই পুজো বাড়িতে ঢুকতে পারবেন। ভবানীপুর গিরিশভবনে এবার ঘট পুজো হবে। ১৮৯ বছরে এই প্রথমবার ঘট পুজো হবে, জানালেন সদস্য কৌশিক মুখার্জি। মূর্তিপুজো করলে বাইরের লোক গিরিশ ভবনে ঢূকে ঠাকুর দেখার ফাঁক খুঁজবে। তাছাড়া প্রতিমা বিসর্জনের সময় দূরত্ববিধি মানাও সম্ভব নয়, তাই এবার ঘট পুজোর সিদ্ধান্ত।
জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়ির পুজোও হবে অনাড়ম্বর ভাবেই। কলাবৌ স্নান এবার বাড়ির উঠোনে সারা হবে। শোভাযাত্রা করে গঙ্গার ঘাটে যাওয়ার প্রথাটা বাদ দেওয়া হল এই অতিমারীর পরিস্থিতিতে। পুষ্পাঞ্জলিতে ফুলের ব্যবহার হবে না। হাতজোড় করে শুধু মন্ত্রোচ্চারণেই সারা হবে অঞ্জলি। সন্ধিপূজাতে বাইরের, দর্শক, বন্ধু এমনকী মিডিয়ার লোকদেরও ঢোকার অনুমতি দেওয়া হবে না। জানালেন দাঁ পরিবারের এই প্রজন্মের সদস্য অতনু দাঁ।  এখন সবার একটাই প্রার্থনা, অতিমারীর প্রকোপ যেন পুজোর সময় কমে যায়। নীরোগ শরীরে সবাই যেন পুজোর আনন্দে শামিল হতে পারে।

জনপ্রিয়

Back To Top