অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: খুব ছোটবেলায় আমরা সকলেই প্রায় একটা রচনা লেখেছি, ‘‌বিজ্ঞান অভিশাপ, না, আশীর্বাদ’।‌ আজকের আন্তর্জাল বিস্ফোরণের যুগে প্রতিনিয়ত আমরা একটা প্রশ্নের মুখোমুখি— সোশ্যাল মিডিয়া অভিশাপ, না, আশীর্বাদ? ক’‌দিন ধরে এই প্রশ্ন ক্ষত–‌বিক্ষত করে দিচ্ছে প্রতিটি সচেতন মানুষকে। প্রশ্নটা উঠছে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের দুটো ছবি ব্যাপক হারে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ায়।
প্রথম ছবিতে দেখা গেল হাসপাতালের বেডে অক্সিজেন মাক্স–‌সহ শুয়ে আছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ইন্ট্রাভেনাস ইঞ্জেকশনের নল–‌সহ নানাবিধ চিকিৎসার টিউব, যন্ত্রপাতির মাঝখানে বিছানায় শুয়ে অসুস্থ এই কিংবদন্তি অভিনেতা। এমন অসহায় অবস্থায় কে তাঁর ছবি তোলার ‘‌সাহস’‌ দেখাল?‌ এমন একটা নামী–‌দামি হাসপাতালে সেই সুরক্ষা নেই, যাতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো ভারত–‌শ্রেষ্ঠ এক অভিনেতার সম্মান রক্ষা হয়?‌ সেই ছবি ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে। আমরা যাঁরা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে সম্মান করি, তাঁরা আঁতকে উঠেছি এমন একটা নির্মম কাণ্ড দেখে। শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়াকে আনসোশ্যাল মিডিয়ার জঞ্জালে পরিণত করার খেলায় অনেকেই ব্যস্ত। তারই শেষতম ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত অসুস্থ, চিকিৎসাধীন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ভাবে ছড়িয়ে দেওয়া।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কেমন আছেন, এটা জানার জন্য প্রতিদিন হাসপাতালের সূত্র থেকে যেমন খবর নিতে হয়, তেমনি আমরা ফোন করি তাঁর মেয়ে অভিনেত্রী ও নাট্যপরিচালক পৌলমী চট্টোপাধ্যায়কেও। অমন সঙ্কটময় অবস্থায় যখন সৌমিত্রবাবু, তখন পৌলমীকে রোজ ফোন করতে কুণ্ঠিত হই। তবুও পৌলমীর সঙ্গে কথা বলে আরও যথার্থভাবে খবরটা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে চাই আমরা। কখনও ফোন না করে হোয়াটসঅ্যাপ করি। সেদিন, যেদিন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ওই ছবিটা ছড়িয়ে পড়ল সোশ্যাল মিডিয়ায়, সেদিন পৌলমীর কণ্ঠরুদ্ধ। কথা বলতে পারছেন না। এমন একটা নির্মম কাণ্ড যে ঘটতে পারে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে, এটা ভাবনার অতীত ছিল তাঁর।
সোশ্যাল মিডিয়াতেই, ফেসবুকে একটা পোস্ট দিলেন পৌলমী। সেখানে লিখলেন ‘‌উই আর অ্যাংরি, স্যাড অ্যান্ড হরিফায়েড’‌। দীর্ঘ পোস্ট। ক্ষুব্ধ, ব্যথিত, আতঙ্কিত পৌলমী। কীভাবে একজন কিংবদন্তি অভিনেতা ও নির্ভেজাল ভদ্রলোকের হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকার এই ছবি তোলা হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা হয়, তাতে বিস্মিত তিনি। এই ছবি শেয়ার হতে হতে ভাইরাল হয়ে যায়। এতটা অসম্মান কি পাওনা ছিল এই কিংবদন্তির?‌
দীর্ঘ পোস্টের শেষে পৌলমী আনসোশ্যাল মিডিয়ায় জঞ্জাল জড়ো করার আসক্তদের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন, স্মার্ট ফোনে স্মার্ট আঙুল টিপে ছবি তোলার আগে, এই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার আগে একটু ভেবে দেখবেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কারও স্বামী, কারও বাবা।
পৌলমীর এই পোস্ট যেন তীক্ষ্ণ স্বরে সেই সত্য–‌প্রশ্নটা করেছে, আপনাদেরও তো বাবা আছে। তাঁর এমন একটা ছবি কি পারবেন লোকজনের কাছে যেচে যেচে পাঠিয়ে দিতে?‌
দু–‌একদিন পরে হাসপাতাল থেকেই কয়েকজন সাংবাদিকের কাছে একটা ছবি পাঠানো হল। সেই ছবিতে আচ্ছন্ন, অসুস্থ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে হাসপাতালের বেডে ধরে ধরে বসানো হয়েছে। এক চিকিৎসক সামনে দাঁড়িয়ে, ধরে আছেন তাঁকে। একজন নার্সও ধরেছেন তাঁকে। পেছনে হাসপাতালেরই এক কর্মী সম্ভবত। সৌমিত্রবাবুর নাকে নল। কী অসহায় লাগছে তাঁকে। এমন একটা ‘‌গ্রুপ ফটো’‌ (‌!‌)‌ তোলার দরকার ছিল কি আদৌ?‌ ছবিটা কয়েকজন সাংবাদিককে পাঠিয়ে পরে অবশ্য বলা হয়, ‘‌ছবিটা শুধু আপনার জন্য। ছাপবেন না।’‌
কিন্তু ঝড়ের গতিতে এই ছবিও ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। কার কাছ থেকে, কীভাবে এই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পৌঁছে গেল এবং ভাইরাল হল, তার মীমাংসা কে করবে?‌ কে তুললেন এই ছবি?‌ কেন তুললেন?‌ এভাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে অসম্মানিত করার অধিকার কে দিল আপনাদের?‌ আমাদের প্রশ্ন, কী উত্তর দেবেন আপনারা পৌলমীকে, যিনি তাঁর বাবার সম্মান রক্ষার জন্য আগেই আবেদন করেছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়?‌
৬ অক্টোবর করোনা আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালে ভর্তি হন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। হাসপাতালের চিকিৎসক দল অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন তাঁকে সুস্থ করে তোলার জন্যে। এখনও তিনি সঙ্কটমুক্ত নন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে খবর নিয়েই আমরা পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি তাঁর শারীরিক পরিস্থিতির কথা।
এই দুটো ছবি–‌কাণ্ডের পরে হাসপাতাল থেকে খবর নেওয়ার পর পৌলমীকে ফোন না করে ‌‘‌মুখোমুখি’‌ নাট্যদলের কর্ণধার বিলু দত্তকে ফোন করি। গত দু’‌দশক এই নাট্যদলের প্রয়োজন মতোই একের পর এক নাটক করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ফোন করতেই সেদিন বিলু ব্যথিত, ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘‌আপনারা তো সৌমিত্রদাকে মেরেই ফেলেছেন‌।’‌ মনে হল বিলুর গলা বুজে এসেছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘‌কেন?‌ কী হল?’‌‌ বিলু জানালেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবি দিয়ে তাঁর ‘‌প্রয়াণে’‌ শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ‌অনভ্যস্ত আমাকে কয়েকটা এমন ছবি ও লেখা ‘‌স্ক্রিন শট’‌ দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন বিলু। দেখে স্তম্ভিত, ব্যথিত এবং হতচকিত না হয়ে উপায় ছিল না। আনসোশ্যাল মিডিয়ার জঞ্জাল থেকে আমাদের কি মুক্তি নেই?‌
এই মিডিয়ার ঢেউ আহত করল অনেককেই। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অর্থোপেডিক সমস্যার বহুদিন ধরেই চিকিৎসা করেন বিশিষ্ট অর্থোপেডিক রামেন্দু হোমচৌধুরি। সোশ্যাল মিডিয়ার এই মিথ্যা রটনায় শঙ্কিত রামেন্দুবাবু ফোন করে জানতে চাইলেন, কেমন আছেন সৌমিত্রবাবু?‌ ওইদিন দুপুরে উনি নিজে ফোন করেছিলেন পৌলমীকে। কিন্তু জঞ্জাল মিডিয়ায় দ্রুত ভাইরাল হওয়া দেখে, শঙ্কিত রামেন্দুবাবু এই প্রতিবেদককে ফোন করে আশ্বস্ত হলেন।
লড়ছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ঠিক যেভাবে তিনি ক্ষিদ্দা হয়ে বলেছিলেন ‘‌ফাইট কোনি, ফাইট’, সেভাবে নিশ্চয়ই নিজেকেও তিনি বলে যাচ্ছেন। এই সংলাপটা বড্ড প্রিয় তাঁর, উনি নিজেই একাধিকবার এ কথা বলেছেন।
আনসোশ্যাল মিডিয়ার জঞ্জাল আপনাকে ছুঁতে পারবে না, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আপনি তো ধারও ধারেন না সোশ্যাল মিডিয়ার। আপনার জন্যে গোটা সমাজ আছে। গোটা অভিনয় সমাজ। গোটা দর্শক সমাজ। যতদিন বাংলা সিনেমা থাকবে, বাংলা মঞ্চ থাকবে, ততদিন আমাদের সঙ্গে থাকবেন আপনি।
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ একজন অভিনেতাকে দেখার তৃষ্ণা কি এত সহজে মেটে?‌ সাম্প্রতিকের ‘‌ময়ূরাক্ষী’‌–‌তে অদৃশ্য ভায়োলিন বাজানোর দৃশ্য যেমন, তেমনি ৬১ বছর আগে আপনার প্রথম ছবি ‘‌অপুর সংসার’‌–‌এ ছেলে কাজলকে কাঁধে বসিয়ে হেঁটে আসার দৃশ্যও অমরত্ব পেয়ে গেছে। এমন অমরত্বের ছোঁয়া আমরা আরও পেতে চাই। স্বচক্ষে। আপনি সেরে উঠুন, সৌমিত্রদা। আমরা অপেক্ষা করছি।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top