আজকালের প্রতিবেদন- শোভন চ্যাটার্জি ও বৈশাখী ব্যানার্জি বিজেপি ছাড়ছেন। সোমবার বৈশাখীকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘‌বিজেপিতে থাকা আর সম্ভব নয়। ঘোষণা শুধু সময়ের অপেক্ষা।’‌ বিজেপি নেতা জয় ব্যানার্জি রবিবার বৈশাখীকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করায় ক্ষুব্ধ ওঁরা। জয় বর্ধমানে দলের সভায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘বৈশাখী রাজনৈতিকভাবে অনভিজ্ঞ। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বলছি, দয়া করে দেবশ্রী রায়কে দলে নিন। বাংলা প্রেমের জায়গা, পরকীয়ার জায়গা নয়। পরের স্বামীকে নিয়ে সব জায়গায় উনি ঘুরবেন, এটা বাংলার মানুষ মেনে নেবে না। তাই আমরা দেবশ্রী রায়কে স্বাগত জানাচ্ছি।’ এর জবাবে এদিন শোভন বলে দিলেন, ‘এক কথায় এটা অত্যন্ত নিম্নরুচির পরিচয়। এর তীব্র নিন্দা করি। ধিক্কার জানাই। বৈশাখী আমার বন্ধু এবং বন্ধু হিসেবেই সে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে, এটা আমি অস্বীকার করি না। কিন্তু সেটাকে বিকৃত মানসিকতায় ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। বানরের হাতে তলোয়ার পড়ে গেলে যা হয়!‌’‌
শোভন বলেন, ‌‘‌দেবশ্রী রায় দলে যোগদান করবেন, কী করবেন না সেটা দলের যিনি প্রধান আছেন তিনিই সিদ্ধান্ত নেবেন। দেবশ্রী রায়ের সম্পর্কে আমাদের আপত্তির কথা আগেই জানিয়েছি।’‌
বৈশাখী বলেন,‌ ‘আমরা খুব স্পষ্টভাবে ২ সপ্তাহ আগে নিষ্কৃতি চেয়েছিলাম। ওঁরা এখনও কিছু সিদ্ধান্ত জানাননি। শুধু বলেছেন একটু সময় দিতে, সব ঠিক করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমার মনে হয় এই সময়টা ওয়ার্নিং বেল, যেটা শেষ হয়ে গেছে। এখন ফাইনাল বেলটা পড়ার অপেক্ষায়। ক’‌দিনের মধ্যেই নিশ্চয় বুঝতে পারবেন আমরা কোনদিকে যাচ্ছি।’‌
শোভন বলেন,‌ ‘‌বিজেপিতে যোগ দিয়ে আমরা কাজের পরিবেশ আশা করেছিলাম। পাইনি। লক্ষ্য করেছি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে আমরা যখনই দলের নেতাদের জানিয়েছি, তখন ওনারা সেই মন্তব্যকে সমর্থন করে কথা বলেননি।’‌
বৈশাখীও শোভনের পাশে বসে ধিক্কার জানান আর অকুণ্ঠে তৃণমূলের প্রশংসা করেন। বলেন, ‘আমার খুব মনে পড়ছে, একটা ইয়ুথ পার্লামেন্টের একটা প্রতিযোগিতায় আমার কলেজ সবচেয়ে বেশি পুরস্কার পেয়েছিল। তখন যিনি মন্ত্রী ছিলেন এবং বিরোধী নেতা পার্থ চ্যাটার্জি পুরস্কার দেওয়ার সময়ে আমাকে বলেছিলেন, আপনাদের মতো মানুষেরা রাজনীতিতে এলে রাজনীতি সমৃদ্ধ হবে। আমি তো একটা রাজনৈতিক জায়গায় ছিলাম। সেখানে দীর্ঘ সময় কাজ করেছি। সেখানেও বিরোধী মতামতও ছিল। এই ধরনের ব্যক্তিগত কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি ছিল না। কেউ এই ধরনের কাজ করার চেষ্টা করলে যিনি মাথায় ছিলেন সহমর্মিতার সঙ্গে এসে আমায় রক্ষা করেছেন। আমি অন্যায় করলে বকেছেন, কিন্তু প্রাইভেটলি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি যখন আমার নাম করতেন, সেই সময় আমার গর্ব হত।’‌
জয় সম্পর্কে বৈশাখী এদিন ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। বৈশাখী বলেন,‘‌একটা মানুষের জীবনে কতটা হতাশা থাকলে এটা হতে পারে!‌ আমরা পড়াশোনা নিয়ে থাকি। ওঁর জীবনে প্রেম, পরকীয়া, পরিণয় এবং প্রন্যান্সিয়েশন এই চারটে ‘‌প’‌ ই খুব প্যাথেটিক। আমার ধারণা ছিল দেবশ্রী খুব বড় তারকা। উনি এরকম হিরোর সঙ্গেও কাজ করলেন!‌ জীবনে একটা দুটো সিনেমা করে, ২৫–৩০ বছর সিনেমা জগৎ থেকে দূরে থাকার পর, সুরমা–‌লিপগ্লস পরে হঠাৎ করে হাতে মাইক পেয়ে গেলে অনেকের অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে হতে পারে। আবর্জনা শুধু আঁস্তাকুড়ে পাওয়া যায় না। মানুষের মনটা সবচেয়ে বড় আঁস্তাকুড়। তিনি বলেন, ‘‌আমি তো দেখেছি উনি নিজের স্ত্রী সম্পর্কেও খুব নিম্নরুচির কথা বলেন। এঁরা কোনও মহিলাকেই সম্মান দিতে পারেন না। ওঁর কথাবার্তা বিকৃত মনের প্রতিফলন। আমি খুশি যে উনি একজন মহিলা প্রার্থীর কাছে হেরেছেন।’‌
শোভন এদিন বলেন, ‘‌ভারতীয় জনতা পার্টির একজন সদস্য এই ধরনের কথা বলেছে, কুরুচিকর মন্তব্য করেছে বলেই উপযুক্ত জায়গায় বিষয়টি জানিয়েছি।’‌ দিলীপ ঘোষ সম্পর্কে বৈশাখী এদিন জানান, ‘‌দিলীপদাকে জিজ্ঞাসা করেছি, আমাকে নিয়ে যে প্রচণ্ড কুরুচিকর মন্তব্য করা হয়েছে এটা কি দলের কথা?‌ তাই যদি হয়, তাহলে আমাকে আগেই জানানো উচিত ছিল?‌ আমাকে দলে নিয়ে আমার গায়ে কাদা লেপে দেওয়ার কোনও মানে হয় না। আর যদি দলের বক্তব্য না হয় তা হলে এই বিষয়ে দলের অবস্থান কী?‌ দল কি জয় ব্যানার্জিকে তিরস্কার করছে?‌ তাঁর বক্তব্য নাকচ করছে?‌ এটা জানা আমার কাছে জরুরি। আমি মেননজিকেও একই কথা বলেছি। আমাকে মেননজি সবসময় বলেন, আমি ওঁর বোনের মতো। আমি বললাম, একজন বোন বিপন্ন। এটা তো বিরোধী দলের থেকে আশা করেছিলাম। কিন্তু নিজের দলের সদস্যরাই তো এরকম কথা বলছে। এরপর আমি কি বিরোধী দলকে কিছু বলার মতো জায়গায় থাকব?‌ আমি তো দিলীপদার আন্তরিকতা, বড় মানসিকতা দেখে জয়েন করেছিলাম। আজ যদি সেই মানুষটা বলেন, আমার এব্যাপারে কিছু বলার নেই, কোনও ইন্টারেস্ট নেই তাহলে আমি বুঝব উনি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কাজ করতে এসে এই এক মাসের কম সময়েই আমি এই চেহারা দেখছি। আমার মনে হচ্ছে আমার মতো মানুষরা এলে রাজনীতি কি সত্যিই সমৃদ্ধ হবে?‌ নাকি কেউ কেউ শঙ্কিত হয়ে, এই ধরনের অপপ্রচার করে ব্যক্তিজীবনকে ভূলুণ্ঠিত করবেন। সৌভাগ্যবশত আমি এতদিন পর্যন্ত যে সমস্ত পুরুষদের আমার জীবনে দেখেছি, যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছি, তাঁদের মধ্যে এত অশিষ্ট লোকজনদের দেখিনি, যেটা একইসঙ্গে একটি দলের মধ্যে এত কম সময়ে দেখতে পাচ্ছি।’‌ বৈশাখীর মনে হয়েছে, আমাদের বিজেপিতে রেখে বিভিন্ন নেতাদের দিয়ে আমাদের সম্পর্কে কুৎসা রটানো হচ্ছে। এর পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে। 
বৈশাখী জানালেন,‌ ‘‌আমরা অনেকটা সহ্য করেছি ধৈর্যের সঙ্গে। কিন্তু ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে। আমরা কৃতজ্ঞ যে বিরোধীরা এই সুযোগটা নেয়নি। সুযোগ নিয়ে মুখ খোলেনি। আমি বলব এটা তাদের শিষ্টাচার। যারা এখানে অশিষ্ট মন্তব্য করছেন তাঁদের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।’‌
এদিন শোভন বলেন, ‘‌তৃণমূলে ফেরা নিয়ে ভাবনা চিন্তার, আলোচনার কোনও সুযোগ নেই। আবার বলছি, কিছু কিছু ব্যক্তি দলের মধ্যে থেকে দলের প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে যে মন্তব্য করছে তা দলের ওপরেই এসে পড়ছে। দলের নেতৃত্বকে আমরা জানাচ্ছি। গোপনে তাঁরা আমাদের কাছে মখ খুলছেন। কিন্তু সেখানে একটা তেল মারা জায়গা রয়েছে। সেটা পরিষ্কার হয়ে গেলে দলের সিদ্ধান্ত হলেও জানতে পারবেন, আমাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও জানতে পারবেন।’‌
বিজেপি–‌সভাপতি দিলীপ ঘোষ সোমবার খড়্গপুরে বলেন, ‘‌সমস্যা হলে দেখার লোক আছে। সবার সব ব্যাপারে বলা ঠিক নয়। শোভনদা আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি বলেছেন, যে যা ইচ্ছা বলছেন। এটা খুব অসম্মানজনক। এটা ঠিক নয়। আমি জানাই, ওর (‌জয় ব্যানার্জির)‌ সঙ্গে কথা বলা হবে। সবার সব ব্যাপারে কথা বলা ঠিক নয়। দলের মতে এটা উনি ঠিক বলেননি। এটা রাজনৈতিক বিষয়ই নয়। এসব বলার দরকারই নেই। কারও ব্যক্তিগত বিষয় থাকলে তা রাজনীতির বাইরেই থাকবে।’‌ পরকীয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন,‘‌ এটা বলা উচিত নয়। রাজনীতির অঙ্গই নয়। কেউ কারও মত দিতেই পারেন। এটা পার্টির মত নয়। ‌দল যা সিদ্ধান্ত নেবে সেই সিদ্ধান্ত সকলকে মেনে চলতে হবে। দলে শৃঙ্খলা আছে। সবাইকে সবকিছু বলার অধিকার দেওয়া হয়নি।’‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top