তারিক হাসান: নিয়মের গেরোয় আঙুলের ছাপ না মেলায় বহু মানুষ বেঁচে থাকার প্রমাণ ‘‌লাইফ সার্টিফিকেট’ জমা দিতে পারলেন না। এই প্রমাণ দিতে তাঁদের এখন যেতে হবে পেনশন দপ্তরে। তাঁরা আতঙ্কিত, এটা না করতে পারলে ডিসেম্বর মাস থেকে তাঁদের পেনশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর পেনশন বন্ধ হয়ে গেলে সংসার খরচ চলবে কী করে?‌ ওষুধই বা কিনবেন কেমনভাবে?‌ আর পেনশন অফিসেই বা কে নিয়ে যাবে?‌
প্রতি বছর নভেম্বরে সরকারি পেনশনভোগীদের ‘‌লাইফ সার্টিফিকেট’‌ জমা দিতে হয়। ডিজিটাল মাধ্যমে আধার সংযুক্তিকরণের কারণে এবার প্রত্যেককেই কমবেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। আঙুলের ছাপ না মেলায় সমস্যা হয়েছে বেশি। কারও আবার সই মেলেনি। এ সব কারণে বিকল্প হিসেবে যে উপায় বলা হয়েছিল, অনেকেই তা করতে পারেননি। অশক্ততার কারণেও অনেকে ব্যাঙ্কে বা পোস্ট অফিসে যেতে পারেননি। এক্ষেত্রে তাঁদের বিচারপতি, সাংসদ, থানা আধিকারিক পদমর্যাদা–সহ ১১টি উচ্চ পদস্থদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফর্মে শংসাপত্র এনে জমা দিতে বলা হয়েছিল। অনেক মানুষের পক্ষেই তা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। ফলে দেওয়া যায়নি ‘‌লাইফ সার্টিফিকেট’‌। এরকম নানা বিড়ম্বনায় বহু সরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর জীবন নির্বাহ করা দুষ্কর হয়ে উঠেছে। বছর পনেরো আগে অবসর নিয়েছেন আরতি মান্না। আগে নিজেই ব্যাঙ্কে গিয়ে লাইফ সার্টিফিকেট জমা দিয়ে আসতেন। অসুস্থতার কারণে এখন আর পারেন না। বছর দুয়েক ধরে তাঁর ছেলে ব্যাঙ্কে গিয়ে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট জমা দিতেন। তাতেই কাজ হয়ে যেত। এবার কিন্তু হয়নি। বিকল্প যে প্রমাণপত্র দিতে বলা হয়েছিল, তা সময়ের অভাবে জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। আর করবেনই বা কী করে?‌ একজন বিচারপতি বা সাব–ইনস্পেক্টর পদমর্যাদার পুলিশ অফিসার হঠাৎ তাঁকে চেনেন বলে শংসাপত্র দেবেন কেন?‌ তাঁর শঙ্কা, তবে কী সামনের মাস থেকে আমাকে আর পেনশন দেবে না?‌ খাব কী করে?‌ চিকিৎসার খরচই বা আসবে কোথা থেকে? পেনশন বিভাগ কী ‘‌লাইফ সার্টিফিকেট’‌ দেওয়ার সময় বাড়াবে?‌
পারকিনসন্সের কারণে হাত কাঁপে ৮২ বছরের অবনী হাজরার। চায়ের কাপ ঠোঁট পর্যন্ত পৌঁছনোর আগেই বেশিরভাগ সময় চলকে পড়ে যায়। খাবার খান বেশ কসরত করে। কেউ খাইয়ে দিলে ভাল হয়। লিখতেও হয় বেশ কষ্ট করে। সই এলোমেলো হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই লাইফ সার্টিফিকেটে যে সই তিনি করেছেন, সেটি ব্যাঙ্কের খাতায় থাকা সইয়ের সঙ্গে মেলেনি। ফলে তাঁর আর বেঁচে থাকার প্রমাণ দেওয়া হয়ে ওঠেনি। তাঁকে বলা হয়েছে, পেনশন অফিসে গিয়ে প্রমাণ দিয়ে আসতে। কিন্তু কার সঙ্গে যাবেন তিনি?‌ ছেলে ভিন রাজ্যে চাকরি করে। স্ত্রীও অসুস্থ। গৃহসহায়িকা কলকাতার পথঘাট চেনেন না। তাই আত্মীয়–স্বজনদের তিনি বারবার অনুরোধ করছেন, কেউ যদি তাঁকে পেনশন অফিসে নিয়ে যায়। না হলে তাঁরও পেনশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।‌ এরকম বহু অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীই ‘‌লাইফ সার্টিফিকেট’‌ জমা দিতে না পারায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top