মিল্টন সেন, হুগলি, ৫ আগস্ট

কোথায় ১৯০৬ আর কোথায় ১৯৪৭!‌ স্বাধীনতার ৪১ বছর আগেই যে জাতীয় পতাকা উড়েছিল কলকাতার মানিকতলায়, ১৪ নম্বর পার্শিবাগান স্কোয়্যারে (‌এখন পার্শিবাগান লেন)‌ সে খবর জানেন ক’‌জন?‌ সেই পতাকা দেখতেও ছিল অন্যরকম। লেখা ছিল ‘বন্দেমাতরম’। ইংরেজদের তুমুল শাসনকালেই এমন ঘটনা গল্প হলেও যে সত্যি তা এভাবেই জানালেন বসু পরিবারের প্রপৌত্র সৌম্যশঙ্কর বসু। পার্শিবাগানের ওই বাড়িতে তখন থাকতেন এলাকার প্রভাব প্রতিপত্তিশালী বাঙালি চন্দ্রশেখর বসু। তাঁর চার ছেলেই ছিলেন কীর্তিমান। শশীশেখর বসু, রাজশেখর বসু, কৃষ্ণশেখর বসু এবং গিরীন্দ্রশেখর বসু। দ্বারভাঙায় শৈশব কাটানোর পর মানিকতলার ওই বাড়িই হয়ে উঠেছিল তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা। কলকাতায় থেকেই গিরীন্দ্র প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনার পর ডাক্তারি পড়েন। গ্রামের বাড়ি ছিল নদিয়ার বীরনগরে। দাদা কৃষ্ণশেখর সেখানকার পুরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। শশীশেখর ছিলেন সাংবাদিক ও লেখক। আর রাজশেখর ছিলেন একাধারে রসায়নবিদ, অন্যদিকে অভিধানকার, লেখক–‌সাহিত্যিক। সাধারণের কাছে যিনি ‘পরশুরাম’ নামেই পরিচিত।স্বাধীনতা সংগ্রাম, বিপ্লবীদের সঙ্গে বসু পরিবারের নিবিড়ভাবে জড়িত থাকার কাহিনী শোনাচ্ছিলেন সৌম্যশঙ্কর বসু। পার্শিবাগানের বসু বাড়ির লাগোয়া পাঁচিলের গা ঘেঁষে তৈরি হওয়া ‘‌অনুশীলন সমিতি’‌তে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হত বিপ্লবীদের। ফলে বিপ্লবীদের লড়াইয়ের আঁচেই দিন কাটত বসু পরিবারের। গোপনে সমিতির অধিকাংশ খরচ জোগাতেন রাজশেখর এবং গিরীন্দ্রশেখর। অর্থ সাহায্য বা চাঁদার পাশাপাশি বিপ্লবীদের বোমা তৈরির ফর্মুলা কেমিক্যাল–‌সহ যাবতীয় সাহায্য করতেন রাজশেখর। গিরীন্দ্র ছিলেন সহযোগী। এমনকি বিপ্লবী ঋষি অরবিন্দ ঘোষ এবং তাঁর ভাই বারীন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে ১৯০৮ সালে মানিকতলা বোমা মামলার যাবতীয় সরঞ্জাম দিয়েছিলেন রাজশেখর। পাঁচিলের এপারে বাড়ির ভিতরে ছিল চার ভাইয়ের তৈরি ‘উৎকেন্দ্র সমিতি’। এখানে স্বাধীনতা আন্দোলন, বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা হত। সেখানে নিয়মিত আসা–‌যাওয়া ছিল জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, যতীন্দ্রনাথ সেন, সতীশ দাশগুপ্ত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিধানচন্দ্র রায়, পুলিনবিহারী দাস, কাজী নজরুল ইসলামের মতো স্বনামধন্যদের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নাকি দু–‌একবার এসেছিলেন পার্শিবাগান স্কোয়্যারের ওই ১৪ নম্বর বাড়িতে।  সৌম্যবাবু বলেন, ৭ আগস্ট অবশ্য এখন আর জাতীয় পতাকা তোলা হয় না। কিন্তু তিনি চান ওই নির্দিষ্ট দিনটির গুরুত্ব এবার সামনে আসুক। ‌‌মানুষ জানুক পার্শিবাগানের ঐতিহ্য।‌‌

ঐতিহ্যের সেই বাড়ি। মানিকতলায়। ছবি আজকাল।

জনপ্রিয়

Back To Top