শিখর কর্মকার—আগুন ধ্বংস করে, আবার সৃষ্টিও করে। দাবানলের আগুনে ছাড়খার হয় বন। দুর্ঘটনার আগুনে দগ্ধ হয়ে যায় প্রাণ, ধ্বংস হয় সম্পত্তি, আবার আগুনে পোড়া মাটির ইটে মাথা তুলে দাঁড়ায় ইমারত, সুদৃশ্য ধাতব সামগ্রী। চুল্লির আগুনে মাটি পুড়ে হয় টেরাকোটা আর সেরামিক। তৈরি হয় ইট। টালি, শিল্প সামগ্রীগুলো। ১৩ চুল্লি আর তা থেকে তৈরি শিল্প সামগ্রীর ওপর খাঁড়া হওয়া এক মণ্ডপ এবার প্রত্যক্ষ করা যাবে ঠাকুরপুকুর এস বি পার্কে। শিল্পী পার্থ দাশগুপ্তের ভাবনায় ভাটা তৈরি করে মণ্ডপ প্রাঙ্গণে নির্মাণ করা হয়েছিল চুল্লিলগুলো। মাটি আর মাটির সঙ্গে রাসায়ণিক পদার্থ মিশিয়ে গড়া শিল্পসামগ্রীগুলো চুল্লিতে সাজিয়ে ধরানো হয়েছিল আগুন। চুল্লিগুলোকে অটুট রেখে স্থান, কাল ও স্থাপনা খোদাই করা ইট সাজিয়ে তৈরি হয়এছে মণ্ডপটি। চুল্লির আগুনে পুড়ে হয়েছে অসুর সেরামিক সামগ্রী গড়কে বিভিন্ন রফের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়ণিক যোগ করা মাটি দিয়েই তৈরি হয়েছে টেরাকোটার মূর্তির আদোলে গড়া দুর্গামূর্তিটি। আলাদা কোন রং ব্যবহার করা হয়নি এখানের প্রতিমায়। এবার প্রথম গভর্মেন্ট আর্ট কলেজের তিন ছাত্রচীত্রী ইনটার্ন হিসেবে যুক্ত হয়েছে এস বি পার্কের দুর্গাপুজোরপ সঙ্গে। হাতে কলমে কাজ শিখেছেন তাঁরা। মণ্ডপ নির্মাণে বেশ কয়েকটি পুজোয় এবারও নানা তুলে আনা হয়েছে। দেশভাগেরপ পর ওপার বাংলার সুতোরটানা পুতুল নাচের দল আশ্রয় নিয়েছিল এপার বাংলার নদীয়ার কয়েকটি অঞ্চলে। শহর, গ্রাম দুড়ে পুতুল নাচ দেখানো ছিল তাজদের পেশা। লুপ্তপ্রায় ওই শিল্প ও এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ত মানুষের জীবন কাহিনী এবার ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেলিমপুরের ঐক্যতানে। লুপ্তপ্রায় নানা সামগ্রী আর বর্তমানে পাওয়া সামগ্রীর মেলবন্ধনে এবার মণ্ডপ তৈরি হয়েছে বরানগর কর্মীসংঘের মণ্ডপ। পরিবেশের কথা মাথায় রেখে মণ্ডপ নির্মাণে পরিবেশ বান্ধব সামগ্রীগুলো বাছাই করা হয়েছে। মণ্ডপটি তৈরি হয়েছে অঞ্জন ভট্টাচার্যের পরিকল্পনায়। তিনিই গড়েছেন এই পুজোর দুর্গামূর্তিটি। পরিবেশ বান্ধব সামগ্রী দিয়ে বাংলার লোকশিল্প তুলে ধরা হয়এছে বাগুইআটির দেশবন্ঝধুনগর সার্বজমীনের মণ্ডপ। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার মতো রোদ থেকে বাঁচতে মানুষের ভরসা মশারি। জনচেতনা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে মশারি দিয়ে এবার তৈরি হয়েছে বেলাঘাটা সরকার বাজারের বিবেকানন্দ সঙ্ঘধের মণ্ডব। বাঁশ রক্ষায় এই উপস্থাপনা এই পুজো কমিটির। 
একসময় সাহিত্য–‌সংস্কৃতি–‌কৃষ্টিতে  বাংলার অন্য অঞ্চলের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে থাকার জন্য নবদ্বীপকে ‘‌অক্সফোর্ট অফ বেঙ্গল’‌ বলা হতো। বৈষ্ণব, শাক্ত ও শৈব ভক্তদের সহাবস্থানে যেখানে চালু হয়েছিল রাস উৎসব। নবদ্বীপের সেই রাস এবার উঠে এসেছে উত্তকর কলকাতার বৃন্দাবন মাতৃমন্দিরে। শিল্পী রাজু সূত্রধরের ভাবনায় তিন ম—— বিশ্বাসের নানা দেব–‌দেবীর মূর্তি, কাঠের মালা, বৈষ্ণব পুঁথি, নামাবলী প্রভৃতিতে সেজেছে মণ্ডপ। থিমের সঙ্গে মানানসই প্রতিমা গড়েছেন শিল্পী কৃষানু পাল, অন্যদিকে সুপুরি  গাছির পাতার উৎস—— খোল দিয়ে শিল্পী বিমল সামন্তের ভাবনায় মণ্ডপ তৈরি হয়েছে বকুলবাগানে। পরিত্যক্ত ওই সুপুরি গাছের খোল যে কতটা  দৃষ্টিন্দন  হতে পারে না বোঝা যাবে না এখানে। জ্যামেতিকভাবে তৈরি কাঠের ফাণকা অংশ সেজে সেজে উঠেছে সুপুরি  গাছের ছালের বিন্যাসে। কোয়োম্বটুর থেকে আনা হয়েথিল এই ছল। শিল্পী শুভেন্দু দাসের তৈরি দুর্গা মূর্তিটিও সেজেছে সুপুরি গাছেরক তৈরি গয়নায়। ১০৫ বছরের পুজো এবার বাগুর বাগান বোরেয়ারি। বাঁকুড়ার কাট পুতুলের আদোলে তৈরি পুতুলে এখানের মণ্ডপ সাজিয়েছেন শিল্পী সুকান্ত চৌধুরি। পুতুলই ধরে রেখে  মণ্ডপের চালস চণ্ডীমণ্ডপ, খড়ের তৈরি হয়এছে মণ্ডপের চাল। সেখান থেকে  স্তরে স্তরে নেমে এসেছে চাঁদোয়া। আলো ও ছায়া যেমন প্রকৃতির স্বাভাবিক দুই ঘটনা, আমাদের জীবনেও বাস্তব। এ যেন আমাদের ছকবাঁটা জীবনের নিত্যদিনের টচানাপোড়েন কোথাও চলে। আলো বেঁচে থাকার কথা বলে, আর অন্ধকার বাঁচার ইচ্ছাকেই নষ্ট করে দেয়। এদের দড়ি টানাটানিতে শেষে অবশ্য আলোরই দয় হয়। অশুভ শক্তি আন্ধকারের প্রতীক, আর আলো শুভর। আলো–‌অন্ধকার দ্বন্দ্বই এবার প্রত্যাশা করা যাবে পশ্টিম পুটিয়ারির পল্লীর উন্নয়ন সমিতির মণ্ডপে। একাজে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে এখানে, আলো যেন মানুষকে দিশা দেয়। শব্দও দেখায় পথ, পথ খুঁজে পাওয়া কিংবা পথ খুঁজে বেরোনো মানুষ তার চাহিদা প্রকাশ করে শব্দের মাধ্যমে, আলো ও শব্দের যুগলবন্দী এবার দেখা যাবে বাগুইআটি অশ্বিনীনগরের মণ্ডপে। 

জনপ্রিয়

Back To Top