দীপঙ্কর নন্দী: নাগরিকপঞ্জির বিরুদ্ধে গোটা বাংলা জুড়ে ব্যাপক প্রচার হবে। এই কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষকে শামিল করতে হবে। শুক্রবার দলের বিধায়ক ও সাংসদদের এই নির্দেশ দিলেন তৃণমূলের চেয়ারপার্সন, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। বৈঠকের পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘‌বাংলায় নাগরিকপঞ্জি চলবে না। দু’‌বার নাগরিকত্ব প্রমাণ করা যাবে না। জন্মের 
শংসাপত্র সকলে দিতে পারবে না। উদ্বাস্তু এলাকাগুলিতে যঁারা থাকেন, তঁারা শংসাপত্র কোথা থেকে দেবেন?‌’‌ 
এদিন বৈঠকে ‌মমতা প্রশ্ন তুলেছেন, জয়েন্ট পরীক্ষা কেন বাংলা ভাষায় দেওয়া যাবে না?‌ শুধু ইংরেজি, হিন্দির সঙ্গে গুজরাটি ভাষাকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন করতে হবে। তিনি বলেন, ‘‌বাংলা ছাড়া আরও তো অনেক ভাষা রয়েছে!‌ সে ভাষাগুলিতে পরীক্ষা দেওয়া যাবে না কেন?‌‌ কেন মহারাষ্ট্রে মারাঠি ভাষায় প্রশ্নপত্র হবে না?‌ তামিল, তেলুগু ভাষায় পরীক্ষা দেওয়া যাবে না কেন?‌ আমাদের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি দু’‌মাস আগে এ ব্যাপারে কেন্দ্রকে চিঠি দিয়েছেন। কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। আমাদের দেশ ভারত, যেখানে বহু ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা, জাতি এবং সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। আসলে আঞ্চলিক ভাষাকে হেয় করতেই এ সব করা হচ্ছে। গোটা ভারতবর্ষে প্রায় ৪০টি ভাষা আছে। প্রত্যেকেই প্রত্যেককে সম্মান দেয়। আমরা চাই ঐক্যবদ্ধ ভারত।’‌ এদিন দলের বৈঠকে তিনি ঘোষণা করেন, ‘‌জয়েন্ট পরীক্ষা বাংলা ভাষায় দেওয়ার দাবিতে ১১ নভেম্বর রাজ্যের প্রতিটি ব্লকে বিক্ষোভ হবে, মিছিল হবে।’‌ 
অযোধ্যায় রামমন্দির
দলের বৈঠকে অযোধ্যায় রামমন্দির নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সাংবাদিকদের মমতা বলেন, ‘‌কী রায় বেরবে, আমরা জানি না। মিডিয়া থেকে অনেক কিছু জানতে পারছি। আমরা অপেক্ষা করছি।’‌ বৈঠকে তিনি বলেছেন, ‘‌এ নিয়ে দলের বাইরে কেউ কোনও কথা বলবেন না। আমরা জানি না কী হবে। সকলকে শান্তিপূর্ণভাবে থাকার জন্য আবেদন করেছি। কোথাও যেন কোনও বিশৃঙ্খলা না হয়। যা বলার আমি বলব।’‌

 

তফসিলিদের নিয়ে বৈঠক
এদিন মমতা দুটি বৈঠক করেন। বিধায়ক, সাংসদদের সঙ্গে সামগ্রিক ভাবে যেমন করেন, তেমন তফসিলি জাতি–‌উপজাতি এলাকার বিধায়ক ও সাংসদদের সঙ্গে আলাদা করে বসেছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, দুটি বৈঠকেই উপস্থিত ছিলেন অভিষেক ব্যানার্জি এবং প্রশান্ত কিশোর। বৈঠকে জানতে চাওয়া হয়, তফসিলি জাতি–‌উপজাতি এলাকায় লোকসভা নির্বাচনের ফল আশানুরূপ হল না কেন?‌ অনেকেই কারণ বলেছেন। কেউ বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীরা তৃণমূলকে ভোট দেননি, বিজেপি এঁদের ভুল বুঝিয়েছে। কেউ বলেছেন, অনেকেই বার্ধক্য ভাতা পাচ্ছেন না। সরকারি বাড়ি না পাওয়া নিয়ে কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন। ডিজিটাল রেশন কার্ড বিপিএল–‌এর জায়গায় চলে এসেছে এপিএল–‌এ। খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে এ ব্যাপারে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী এদিন ইঙ্গিত দিয়েছেন, এবার তফসিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায় থেকে একজনকে এই দপ্তরে মন্ত্রী করা হবে। তিনি নিজে আগে এই দপ্তরটি দেখতেন। তারপর দেখছিলেন রাজীব ব্যানার্জি। রাজীবের গুরুত্ব এদিন বাড়িয়ে দেওয়া হল। রাজীব দক্ষিণ দিনাজপুরে পর্যবেক্ষক হলেন। অর্পিতা ঘোষ ও অন্যদের নিয়ে তঁাকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজীব নদিয়ার পর্যবেক্ষকও আছেন। কালিয়াগঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রাজীবকে। শোনা যাচ্ছে, রাজীবকে একটি বিশেষ দপ্তর দেওয়া হবে। তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বঁাকুড়ায় কল্যাণ ব্যানার্জি ও মলয় ঘটকও পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকবেন। পুরুলিয়াতেও পর্যবেক্ষক হয়েছেন কল্যাণ। তাঁকে হুগলি জেলা সংগঠনের কাজও দেখতে বলা হয়েছে। এই জেলার সভাপতি এখন দিলীপ যাদব। খড়্গপুরে বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছেন শুভেন্দু। ২৫ নভেম্বর অন্য দুই কেন্দ্রের সঙ্গে এই কেন্দ্রেরও বিধানসভা উপনির্বাচন।

‌দিদিকে বলো কর্মসূচি
‘দিদিকে বলো’‌ জনসংযোগ কর্মসূচিতে কয়েকজন বিধায়ক ঠিকভাবে শামিল না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এঁরা হলেন গুলশন মল্লিক, শীতল সর্দার, নুরুজ্জামান। শ্যামল সঁাতরা নিজেই একটি ওয়েবসাইট খুলেছেন। তঁাকে বলা হয়েছে, এই ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দিতে। বিধায়ক নীলিমা নাগ বৈঠকে বলেন, ‘‌দিদিকে বলো’‌ কর্মসূচিতে ৫ জনের সঙ্গে দেখা করার জন্য নাম পাঠানো হয়েছে। আমি দেখছি, এই ৫ জনের মধ্যে ৩ জন সিপিএম, ২ জন বিজেপি। আমি তঁাদের কাছে গিয়ে কী বলব?‌‌ ৩০ জুলাই থেকে ‘দিদিকে বলো’ জনসংযোগ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ১০০ দিনে ১০ হাজার গ্রাম ঘুরবেন নেতারা। ইতিমধ্যে তৃণমূল যুব কংগ্রেসের কর্মীরাও এই কর্মসূচিতে সামিল হয়েছেন।
ভোটার তালিকা
ভোটার তালিকা নিয়ে সকলকে কাজে নামার নির্দেশ দিয়েছেন মমতা। তিনি বলেছেন, ‘‌মন দিয়ে এই কাজ করতে হবে। এলাকার বিধায়ককে প্রশাসনের সঙ্গে বসতে হবে। বিধায়ক যেন কোনও প্রতিনিধি না পাঠায়।’‌

অন্যান্য বিষয় 
বৈঠকে এদিন মমতা বলেছেন, ‘‌প্রচুর টাকা খরচ করে বিজেপি এনজিও বানিয়েছে। ভোটের প্রস্তুতি তারা শুরু করে দিয়েছে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। ওরা বিভ্রান্তি ছড়াবে। ছাত্র–‌যুবকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে হবে।’‌
মমতা এদিন নিজের কর্মসূচি ঘোষণা করে বলেন, ‌‘‌১২ নভেম্বর গুরু নানকের জন্মদিন। ওই দিন আমি বাগডোগরায় 
নেমে শিলিগুড়িতে গুরুদোয়ারায় যাব। 
১৩ নভেম্বর কোচবিহারের রাসমেলায় 
উপস্থিত থাকব। ১৪ নভেম্বর কোচবিহারে সভা করব। এরপর মালদা, মুর্শিদাবাদেও আমার কর্মসূচি রয়েছে। ২২ নভেম্বর ইডেনে ভারত–‌বাংলাদেশ টেস্ট ম্যাচ দেখার জন্য সৌরভ আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।’‌ প্রসঙ্গত, ইডেনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা 
উপস্থিত থাকবেন।‌‌

তৃণমূল ভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি মুখ্যমন্ত্রী। ছবি: কৌশিক সরকার

জনপ্রিয়

Back To Top