আজকালের প্রতিবেদন- বাবা দীপক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্লাস শুরু হলেই পেছনের বেঞ্চে চলে যেতেন। বসে থাকতেন মাথা নীচু করে। সুযোগ পেলেই প্রেসিডেন্সি কলেজের মাঝারি মানের পড়ুয়া এমন সহপাঠীদের সঙ্গে চলে যেতেন কফি হাউসে। খুব হুল্লোড় করতেন। কলেজ জীবনে এমনটাই ছিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। কলেজ জীবনের স্মৃতি উঠে এল বন্ধু অভিজিৎ পাঠকের কথায়। স্কুলের শিক্ষিকা, বন্ধুদের স্মৃতিকথায় উঠে এলেন ‘‌অন্য’ অভিজিৎ‌।
অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিজিৎ পাঠক দু’‌জনেই একই সঙ্গে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েছেন। পরে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পড়তে চলে যান অভিজিৎ পাঠক। স্মৃতিচারণায় তিনি জানালেন, ‘‌একই নাম হওয়ায় বন্ধুদের কাছে ডাকনাম ‘‌ঝিমা’‌ হিসেবেই জনপ্রিয় ছিল অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। কেউ কেউ ডাকত বিনায়ক নামে। অর্থনীতির মতোই অঙ্কেও দক্ষ ছিল। প্রেসিডেন্সিতে দুটি বিষয়েই প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিল। দু’‌জনেই প্রেসিডেন্সি কলেজে অঙ্কে সুযোগ পাওয়ায় একসময় ও বলেছিল, আমরা অঙ্ক নিয়ে পড়লেই বোধহয় ভাল হত। পাশাপাশি ইংরেজিতেও তার দক্ষতা ছিল অসাধারণ। ভাল লিখতে পারত। ইতিহাসেও ভাল ছিল। আইএসআইয়ের প্রবেশিকায়ও উত্তীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু স্ট্যাটিস্টিক্স নিয়ে ভাল না লাগায় পড়েনি। স্নাতক স্তরে প্রথম বর্ষে প্রথম বিভাগ পায়নি। তবে দ্বিতীয় বর্ষের দারুণ ভাল করে। ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিল। অঙ্কে উঁচু দরের হওয়ায় অর্থনীতিতেও ভাল করেছে।’‌
তিনি জানালেন, ‘‌সেই সময় কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের উল্টোদিকে ছিল আমেরিকান সেন্টার। ওর আগ্রহেই সেখানে গিয়ে চার্লি চ্যাপলিনের মডার্ন টাইমস আর গ্রেট ডিক্টেটর দেখিছিলাম। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সঙ্গীত নিয়েও প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। ওর কাছেই প্রথম বব ডিলানের নাম শুনি। বাবা বাঙালি, মা মারাঠি। তাই তাঁর নামের মাঝে বিনায়ক শব্দটা জুড়ে গেছে মিশ্র সংস্কৃতির অংশ হিসেবে। ওর ভাইয়ের নাম অনির্বাণ ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। মা–বাবা দু’‌জনেই লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সের পড়ুয়া ছিলেন।’‌
অভিজিৎ পাঠক নিজেও মেধাবী। ১৯৭৮ সালে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জয়েন্ট এন্ট্রান্সে প্রথম হয়েছিলেন। পরে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পড়েন। অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় তাই চেয়েছিলেন বন্ধু আমেরিকায় গবেষণা করুক। তা অবশ্য হয়নি। ছাত্রজীবনের কথা বলতে গিয়ে অভিজিৎ পাঠক জানালেন, ‘‌পোশাকে অদ্ভুত একটা ফ্যাশন ছিল। প্যান্টের ওপর লম্বা হাতা পাঞ্জাবি পরে কলেজে আসত। কলেজ জীবনে রান্না করত শুনিনি। কিন্তু এখন শুনেছি দারুণ রান্না করে।’‌ 
‌অভিজিৎবাবুর সঙ্গে সাউথ পয়েন্ট স্কুলে একসঙ্গে পড়েছেন শর্মিলা দে সরকার। তিনি এখন সাউথ পয়েন্ট স্কুলের শিক্ষিকা। জানালেন, সপ্তম থেকে দশম শ্রেণিতে একসঙ্গে পড়েছেন। একাদশে তিনি জীববিদ্যা আর অভিজিৎবাবু রাশিবিজ্ঞান নেওয়ায় আলাদা সেকশন হয়ে যায়। স্কুলে পড়ার সময় ফুটবল, ক্রিকেট, সঙ্গীতে খুব আগ্রহ ছিল। পাড়ায় ফুটবল, ক্রিকেট খেলতেন। ক্লাসের ‘‌টপার’‌ ছিলেন না, তবে মেধাবী পড়ুয়া ছিলেন। শর্মিলাদেবীর কথায়, ‘‌বারবার সেইদিনগুলোর কথা মনে পড়ছে। টিফিনের সময়ে আমরা সবাই মিলে গল্প করতাম। খুব গর্ব হচ্ছে, ছোটবেলার বন্ধু নোবেল পাচ্ছে। অভিজিতের নোবেল পাওয়াটা প্রত্যাশিতই ছিল। দু–তিন বছর ধরে ওর কাজের খ্যাতি এতটাই ছড়িয়েছে যে, এটা প্রত্যাশিত।’‌
ছোটবেলার আরেক বন্ধু বাপ্পা সেন বলেন, ‘‌কলকাতায় এলে আড্ডা হয়। অভিজিৎ উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের খুব বড় ভক্ত। আড্ডায় গানও একটা অন্যতম বিষয় হয়।’‌‌‌‌‌‌‌
‌সাউথ পয়েন্ট স্কুলে অভিজিৎবাবুর অঙ্কের শিক্ষিকা ছিলেন দীপালি সেনগুপ্ত। ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণি পড়ার সময় অঙ্ক করাতেন দীপালিদেবী। জানালেন, ‘‌ক্লাসে মেধাবী ছাত্র অনেকেই ছিল। কিন্তু অভিজিৎয়ের মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যার জন্য আমি ওকে আজও ভুলতে পারিনি। খুব শান্ত, অন্তর্মুখী স্বভাবের ছিল। দারুণ অঙ্ক করতো। কিন্তু কখনই ‘‌হয়ে গেছে’‌ বলতো না। ওর কাছে গিয়ে আমায় জানতে হত। পরে উঁচু ক্লাসে যখন উঠল তখন আর পড়ানোর সুযোগ না হলেও ওকে দেখতাম। আজ ও নোবেল পাওয়ায় আনন্দ তো হচ্ছেই। আমার মনটাও ভরে যাচ্ছে।’‌

বাড়িতে। ছোটবেলার অভিজিৎ ও বাবা দীপকের ছবি। ছবি: বিজয় সেনগুপ্ত

জনপ্রিয়

Back To Top