অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: কর্কটকমলের এত মাতব্বরি কীসের? লাঠিসোঁটা একটু বেশি আছে বলে?‌
এভাবে ক্যান্সারকে নিয়ে তীব্র তামাশা করা যাঁকে সাজে, তিনি নবনীতা দেবসেন। ঠিক এক মাস আগে ৯ অক্টোবর লিখেছিলেন এই কথা। ৮ নভেম্বর শুক্রবার দুপুর বেলা তাঁর ‘‌ভালো–‌বাসা’‌ ছেড়ে বের হল তাঁর নিথর শরীর। আগের দিন সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ শেষ নিঃশ্বাসটি ফেললেন ‘‌ভালো–‌বাসা’‌র ঘরে। পাশে বসে মাকে ছুঁয়ে তখন গান শোনাচ্ছিলেন তাঁর দুই মেয়ে অন্তরা আর নন্দনা। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন চলে যাচ্ছেন তাঁদের মা। আর অক্সিজেন নিতে পারছিল না তাঁর শরীর। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান যে তখনও নিতে পারবেন নবনীতা, এ কথা ঠিকই বুঝেছিলেন তাঁর দুই কন্যা।
আগের দিন সন্ধ্যায় ৭২, হিন্দুস্তান পার্কের ‘‌ভালো–‌বাসা’ বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেন অন্তরা, নন্দনা। কারণ শেষ নিঃশ্বাস ফেললেও তাঁদের মা তো রাতটুকু এ বাড়িতেই থাকবেন। তাই মায়ের সঙ্গে একই ঘরে এই রাতটা যাপন করতে চেয়েছিলেন তাঁরা, নিভৃতে, নিজেদের মতো।
শুক্রবার সকাল থেকে দরজা খোলা। বাড়ির বাইরে দুই শ্বেতপাথরে খোদাই‌ করা আছে নরেন্দ্র দেব আর রাধারানী দেবীর নাম। তাঁদের কন্যার নাম দেওয়ালে লেখা নেই। কিন্তু নরেন্দ্র–‌রাধারানীর কন্যাকে কত মানুষ যে ভালবাসতেন, তা আর একবার টের পেল হিন্দুস্তান পার্কের এই রাস্তা— বৃহস্পতিবারের রাতে যেমন, শুক্রবার সকাল থেকেও।
ততটা সুস্থ নন, তবুও বহুদিনের সহকর্মী, সতীর্থ কবিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এলেন শঙ্খ ঘোষ। এসেছিলেন আর এক সতীর্থ পবিত্র সরকার। শ্রদ্ধা জানাতে এলেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়। রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে আগের দিন রাত থেকে এদিন সকালে, দুপুরে শ্রদ্ধা জানাতে এলেন সু্ব্রত মুখার্জি থেকে রবীন দেব, নির্বেদ রায়, মালা রায়ের পাশাপাশি সুজন চক্রবর্তী। বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে কখনও তাঁরা পরস্পরের মধ্যে আলোচনাও করলেন সাহিত্যিক, কবি ও মানুষ নবনীতাকে নিয়ে। এলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, দেবাশিস কুমার। এসেছিলেন জহর সরকার, বাণী বসু, নবনীতার তৈরি করা ‘‌সই’‌–‌এর বহু কবি, লেখিকা। কয়েকদিন আগে কলকাতায় ঝটিকা সফরে এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করে যান নোবেল জয়ী অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিন তাঁর মা নির্মলা বন্দ্যোপাধ্যায় এসে শ্রদ্ধা জানিয়ে গেলেন নবনীতাকে। এলেন অপর্ণা সেন–‌সহ বহু বিশিষ্ট মানুষ।
দুপুরে ‘‌ভালো–‌বাসা’‌ থেকে নবনীতা দেবসেনের নিথর দেহ শববাহী গাড়িতে ‌করে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর এক সময়ের কর্মস্থল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। উপাচার্য সুরঞ্জন দাস–‌সহ শ্রদ্ধা জানালেন অধ্যাপকরা। ছিলেন অমিয় দেব। ছাত্রছাত্রীরা ফুল দিলেন, গান শোনালেন তাঁকে। 
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা আকাদেমি। সেখানে তাঁকে শ্রদ্ধা জানালেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, শাওলি মিত্র, জয় গোস্বামী। এসেছিলেন পাবলিশার্স গিল্ডের দুই কর্মকর্তা শুধাংশুশেখর দে ও ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়। এলেন আবদুল মান্নান, মালা রায় প্রমুখ।
বাংলা আকাদেমি থেকে কেওড়াতলা শ্মশান। ওখানেই শেষকৃত্য সম্পন্ন হল তাঁর। লাল শাড়িতে বড় লাল টিপে তখনও ভারি সুন্দর লাগছিল তাঁকে।
চিরকাল শ্বাসকষ্টের বা হাঁপানির সমস্যাকে দূরছাই করে নিজের মতো করে দেশ–‌বিদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। লিখেছেন মন–‌কাড়া ভ্রমণ কাহিনি। কম লিখেছেন, তবে তাঁর কবি পরিচয়টা কখনও চাপা পড়েনি তাঁর বন্ধু পুরুষ–‌কবিদের পাশে। প্রথম কবিতার বই— ‘‌প্রথম প্রত্যয়’‌ থেকে শেষ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘‌তুমি মনস্থির করো’‌ পর্যন্ত সমান প্রত্যয়ী ছিলেন তিনি। প্রথম উপন্যাস ‘‌আমি অনুপম’ থেকেই প্রমাণ করেছেন, গদ্যও তাঁর অর্জন। অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘদিন, কিন্তু শুষ্কং–‌কাষ্ঠং ভাষাকে পরিত্যাগ করেছেন সব সময়। তাঁর প্রবন্ধের বই ‘‌ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী ও অন্যান্য’‌ তার বড় প্রমাণ। 
দাপটে বেঁচেছেন চিরকাল। জীবনের শেষ প্রান্তে ক্যান্সারের আক্রমণকেও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে গেলেন। শুধু তো রোগ–‌ভোগ ক্যান্সার নিয়ে নয়, নিজেকে নিয়েও তির্যক কৌতুক করার মতো মনের ও ভাষার জোর ছিল তাঁর। অমর্ত্য সেনের সঙ্গে ১৮ বছরের বৈবাহিক জীবনের পরেও একবারের জন্যও তিক্ততার কোনও লেশ মেলেনি তাঁর লেখায়। 
ক’‌দিন আগেই লিখলেন, ‘‌জীবন যে কখন ফুরাবে, তা কি আমরা জানি?‌ বেচারা ক্যান্সারকে এত দোষ দিয়ে কী হবে?‌’‌
কিছু যে হবে না, এটা আজ সবার কাছে স্পষ্ট করে দিয়ে চলে গেলেন তিনি। ‘‌ভালো–‌বাসা’‌ বাড়িটা ছাড়লেও, বাংলা ভাষার অগণিত পাঠকের ভালবাসা তাঁর সঙ্গেই থাকবে। যখন তাঁর সই–‌রা গাইছিলেন, ‘‌আরও আরও আরও দাও প্রাণ’‌, তখন মনে হল, প্রাণের সঙ্গে প্রাণকে মেলানোর মন্ত্রটাই তিনি এতদিন ধরে লিখে গেলেন। সেই মন্ত্র— ভালবাসা। ‌

নবনীতা দেবসেনকে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। আছেন দুই মেয়ে নন্দনা ও অন্তরা। বাংলা অাকাডেমিতে, শুক্রবার। ছবি: সুপ্রিয় নাগ

জনপ্রিয়

Back To Top