আজকাল ওয়েবডেস্ক:‌ ‘‌আমরা বাপু ঘটি লোক–মোহনবাগানের জয় হোক!’‌ 
জানেন কে লিখেছিলেন?‌
নবনীতা দেবসেন। যিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন বৃহস্পতিবার সন্ধেয়। তার কয়েক ঘণ্টা পরেই চলে গেলেন মোহনবাগানের প্রাক্তন সচিব অঞ্জন কুমার মিত্র। কী আশ্চর্য সমাপতন!‌
ঘটি পরিবারের মেয়ে ছিলেন তিনি। লিখেছিলেন, ‘‌ইলিশমাছ–চিংড়িমাছের লড়াইটায় অবশ্য আমার একটা সমস্যা ছিল। এখনও আছে। আমার চিংড়িমাছে প্রবল অ্যালার্জি। আর ইলিশটা দারুণ প্রিয় (‌অ্যালার্জিও নেই)‌। তবু, যেদিন মোহনবাগান হারবে, সেদিন ইলিশ কেনার প্রশ্নই ওঠে না, দশ টাকা কিলোতে বিকোলেও না। ঘটির গরব আছে না?‌ মোহনবাগান হেরেছে তবু হাঁড়ি চড়েছে এই না কত!‌’‌ 
ইস্টবেঙ্গল–মোহনবাগান নিয়ে ঝগড়ার মাঝেই বড় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। থাকতেন দক্ষিণ কলকাতায় ইস্টবেঙ্গলের পাড়ায়। আদি নিবাস ঠন্‌ঠনে কালীতলায়, মোহনবাগানের খাস তালুকে। যদিও নিজে কোনদিনই ফুটবল খেলা দেখতে যাননি। পাড়ার মাঠেও কোনদিন খেলার চেষ্টা করেননি। তবে গলি ক্রিকেট খেলেছেন। আর মোহনবাগানের হয়ে লড়াই করে যেতেন। 
নবনীতা দেবসেনের সময়ে মেয়েরা ফুটবল মাঠে যেতেন না। ক্রিকেটের মাঠে অবশ্য যেতেন। নবনীতা বলতেন, ‘‌উল বুনতে যেত মহিলারা। ৯০ মিনিটে উল বোনার সুবিধে নেই।’‌ নবনীতার বাবা দেখতেন ফুটবল। আর মামা ফুটবল মাঠে যেতেন নিয়মিত। প্রচণ্ড উৎসাহ ছিল। নবনীতা বলতেন, ‘‌সেই উৎসাহ আমার দাদাভাই শ্রী অশোক কুমার ঘোষ পেয়েছিলেন। মোহনবাগান, এআইএফএফ, ফিফা, অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন সবাই চিনতেন ওনাকে।’‌ 
ফুটবলের প্রতি ভালবাসা জন্মেছিল মামাবাড়ি থেকেই। দাদাভাইয়ের থেকেই শুনেছিলেন গল্প। নবনীতার গর্বে বুক দশহাত হয়ে যেত–বুটপরা ইস্টইয়র্কের মিলিটারি টিমের রাঙামুখো গোরা সাহেবদের কেমন করে হারিয়ে দিয়েছিল স্রেফ খালিপায়ে খেলে একদল কালো বাঙালি ছেলে। গর্ব করে বলে বেড়াতেন ১৯১১ সালে মোহনবাগানের আইএফএ শিল্ড জয়ের গল্প। দুই ভাই শিবদাস ভাদুড়ি, বিজয়দাস ভাদুড়ির কথাও জানতেন। নবনীতা প্রায়ই বলতেন, ‘‌বাঙালির ছেলেও যে ইচ্ছে করলে সাহেব–বাচ্চাদের হারিয়ে দেবার শক্তি রাখে–তার প্রমাণ পেয়ে কেমন করে আমাদের মনের জোড় বেড়ে গিয়েছিল, স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য আত্মবিশ্বাস এসেছিল। কী করে একটা খেলার জিৎ জিতে নিয়ে মোহনবাগান স্বদেশি যুবকদের শক্তির প্রতীক স্বরূপ হয়ে উঠেছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের পায়ের জোর বাড়িয়েছিল। সেজন্য আজ মোহনবাগান ক্লাবকে এআফএফএফ থেকে ভারতের ‘‌জাতীয় ক্লাবের’‌ সম্মান দেওয়া হয়েছে।’‌ 
জাতীয় ক্লাব মোহনবাগান। অনেকেই তা শুনে কটাক্ষ করেন। অতীতেও করতেন। নবনীতার কানে গেলে বলে দিতেন, ‘‌জাতীয় ক্লাবের সম্মান পাবে নাই বা কেন?‌ কারা ছিলেন মোহনবাগানে?‌ ‘‌মাঠের ম্যাজেশিয়ান’‌ সামাদ থেকে শুরু করে ‘‌চীনের প্রাচীর’‌ গোষ্ঠ পাল, উমাপতি কুমার থেকে শৈলেন মান্না হয়ে চুনী গোস্বামী–কে গুনবে কতজন বিশিষ্ট গুণীজন খেলে গেছেন মোহনবাগানে?‌ আরও তো কতজন খেলবেন ভবিষ্যতে। মোহনবাগান যুগ যুগ জীও।’‌ 

 

 

(‌‌নবনীতা দেবসেনের ‘‌প্রিয় মোহনবাগান এবং আমরা’‌ ‌থেকে সংগৃহীত‌)‌‌  ‌  ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top